Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাল্যবিয়ে ঠেকাতে যা করতে হবে

বাল্যবিয়ে বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বিয়ে দেওয়া বাল্যবিয়ের অন্তর্ভুক্ত। বাল্যবিয়ে মূলত অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক বিয়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিয়ের সঙ্গে মেয়েদের নামই উঠে আসে বারবার। কারণ ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের মতো ঘটনা কমে গেছে। নেই বললেই চলে। দেশের সাংবিধানিক আইন মতে, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর। আর নির্ধারিত বয়সের আগে বয়স লুকিয়ে, গোপনে বা আনুষ্ঠানিকভাবে জোরপূর্বক, কখনো কখনো কন্যার সম্মতির তোয়াক্কা না করে চাপিয়ে দিয়ে তাকে পাত্রস্থ করা হয়। এক্ষেত্রে অভিভাবকরা কন্যার বয়সকে এফিডেভিট করে নিয়ে ছলনার মাধ্যমে বিয়ে দেন। কিন্তু বাল্যবিয়ের ফলে সন্তানের ওপর শারীরিক ও মানসিক নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। যেগুলো অনেকেই সচেতনতা, অশিক্ষা, অজ্ঞতার কারণে এড়িয়ে যান।

বাল্যবিয়ের প্রভাব মারাত্মক। বাল্যবিয়ের ফলে মেয়ে-ছেলে উভয়ের ওপরই বিরূপ প্রভাব পড়ে। তবে আমাদের দেশে মেয়েরাই বেশি বাল্যবিয় ও ক্ষতিগ্রস্তেরও শিকার হয়। বিশেষত নিম্ন আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে অনেক বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে নিজের দায় কমাতে চান। তবে এর নেপথ্য কারণ অনেক। বেশিরভাগ বাল্যবিয়েতে দুজনের মধ্যে শুধু একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে। বাল্যবিয়ের কারণগুলো উল্লেখ করলে প্রথমেই রয়েছে দারিদ্র্য, যৌতুক, সামাজিক প্রথা, ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ, অঞ্চলভিত্তিক রীতি, বয়স বেশি হলে পছন্দসই পাত্র না পাওয়ার শঙ্কা, নিরক্ষরতা ও মেয়েদের উপার্জনে অক্ষম ভাবা, নিরাপত্তাহীনতা, সংসারের বোঝা ভাবা প্রভৃতি।

বাল্যবিয়ে নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন কারণেই বাল্যবিয়ের প্রচলন অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। সচেতনতা ও আইন সৃষ্টি করে বাল্যবিয়ে বাংলাদেশে অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও করোনাকালীন সময়ে এই পরিস্থিতি দ্বিগুণ বেড়েছে। মা-বাবার অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে অনেকেই কন্যা সন্তানের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যম বারত উঠে এসেছে এসব মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। বাল্যবিয়ের কারণে অল্প বয়সে শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে ঝরে গিয়ে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক; সবদিক থেকেই ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে এসব মেয়েকে। দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোর বাইরে গিয়ে মূলত সামাজিক সচেতনতনা ও ইচ্ছাশক্তির অভাবের কারণেই নারীদের বাল্যবিয়ের শিকার হতে হচ্ছে আজও।

বাল্যবিয়ের শিকার নারীদের যৌন-সংক্রমিত রোগের আশঙ্কাও বেশি থাকে।

বাল্যবিয়ের প্রভাব মেয়েদের ওপর ব্যাপক। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে যায়। কিশোরী বয়সে বা তারও আগে বিয়েতে নারীরা কম বয়সে গর্ভধারণ করার ফলে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগে থাকে। তাদের কম বয়সে গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদান বিশেষ জটিলতা সৃষ্টি করে। এছাড়া অল্প বয়সে গর্ভধারণ শিক্ষার জন্যও প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যা তাদের অর্থনৈতিকভাবেও অসচ্ছল করে তোলে। বাল্যবিয়ের ফলে পারিবারিক সহিংসতা, বৈবাহিক ধর্ষণেরও শিকার হতে হয়। কারণ তাদের মধ্যে স্বাভাবিক বোধ গড়ে ওঠে না বেশিরভাগক্ষেত্রেই। ফলে অন্যপক্ষ নিষ্ঠুর আচরণও মেনে নিয়ে জীবন যাপন করে।

বাল্যবিয়ে মেয়েদের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য হুমকি স্বরূপ। উন্নয়নশীল বিশ্বে গর্ভধারণ ও সন্তানধারণের জটিলতা অল্প বয়সে নারী মৃত্যুর অন্যতম কারণ। ১৫-১৯ বছর বয়সী গর্ভবতী নারীদের মাতৃমৃত্যুর আশঙ্কা ২০ বছর বয়সী গর্ভবতী নারীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আর ১৫ বছরের কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে মাতৃমৃত্যুর আশঙ্কা ৫-৭ গুণ বেশি। যেসব নারী ১৫ বছর বয়সের আগে সন্তান জন্ম দেন, তাদের ফিস্টুলা বিকশিত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৮৮ শতাংশ। যা বিভিন্ন সংক্রমণের অন্যতম কারণ। বাল্যবিয়ের শিকার নারীদের যৌন-সংক্রমিত রোগের আশঙ্কাও বেশি থাকে।

বাল্যবিয়ের ফলে শুধু মায়ের স্বাস্থ্যই ঝুঁকির সম্মুখীন হয় না শিশুর স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের অপরিণত সন্তান জন্মদান বা কম ওজনের সন্তান জন্মদানের আশঙ্কা ৩৫-৫৫ শতাংশ। এছাড়াও শিশু মৃত্যুর হার ৬০ শতাংশ, যখন মায়ের বয়স ১৮ বছরের নিচে। যেসব নারী কম বয়সে শিশুর জন্ম দেন, তাদের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় ও শিশু অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কাও বেশি থাকে। এছাড়া বাল্যবিয়ের কারণে জনসংখ্যার হারও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

শিক্ষকদের স্কুল পর্যায়ে সন্তানদের বাল্যবিয়ের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। সর্বোপরি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেও বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বাল্যবিয়ের ফলে মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা থাকে প্রায় শতভাগ। পারিবারিক দায়িত্ব পালন ও সন্তান লালন-পালনের জন্য বিয়ের পর বেশিরভাগ মেয়ের শিক্ষা জীবন ব্যাহত হয়। শিক্ষা ছাড়া নারীরা অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যার ফলে সামাজিকভাবে নানারকম সংহিতার শিকার হতে হয় এসব নারীদের।

সম্পূর্ণরূপে স্বামীর ওপর নির্ভর করার কারণে পারিবারিক, যৌন-নির্যাতন, শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে মেনে নেওয়া ও মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে জীবন পার করে দেয়। অপ্রাপ্ত বয়সের বিয়ে ও নির্যাতনের শিকার হলে তারা বিষণ্ন হয়ে পড়ে, জীবনের ওপর মোহ হারিয়ে ফেলে, এমনকি আত্নহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়।

বাল্যবিয়ে মানব জাতির জন্য হুমকি স্বরূপ। উচ্চহারে বাল্যবিয়ে দেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। কারণ বাল্যবিয়ের কারণে শিক্ষা ও শ্রম বাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমে।

পারিবারের সচেতনতা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সর্বোপরি আইনের কঠোর প্রয়োগ করে বাল্যবিয়ে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে বাল্যবিয়ে কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নানারকম আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রুখতে জরুরি সেবার ভিত্তিতে ১০৯ নম্বরে ফোন দিলেই বিনামূল্যে সেবা মিলবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিকভাবে সভা, সেমিনার, এমনকি মেয়েদের সচেতন করতে গ্রাম্য বৈঠক করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের আরও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। স্কুলে স্কুলে গড়ে তুলতে হবে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ সংগঠন। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে সেজন্য শর্ট ফ্লিম, সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, ব্যানার ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষকদের স্কুল পর্যায়ে সন্তানদের বাল্যবিয়ের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। সর্বোপরি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেও বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবেই দেশ ও জাতির কল্যাণ আরও তরান্বিত হবে।