Skip to content

২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নিরাপত্তাহীনতায় নারী: প্রশাসনের কড়া নজরদারি জরুরি

জান্নাতুল-যূথী
জান্নাতুল-যূথী

বড় উদ্বেগের বিষয় হলেও এটাই সত্য যে, নারীরা দিন দিন আরও অনিরাপদ জীবনযাপন করছে। ঘরে-বাইরে কোথাও নারীর স্বস্তি নেই। শারীরিক, মানসিক নির্যাতন থেকে রক্ষা মিলছে না ঘরে কিংবা বাইরে৷ প্রতিনিয়ত গড়ে তোলা হচ্ছে নানারকম ফাঁদ। কখনো শারীরিক নির্যাতনে সীমাবদ্ধ থাকছে আবার কখনো টাকা-পয়সা হাতানোসহ নানারকম পাশবিক অত্যাচার করা হচ্ছে নারীদের ওপর। নারীরা যেন এখন এক একজন মৃত্যুকূপের বাসিন্দা। কোথাও নিরাপত্তা নামক শব্দটির সঙ্গেও তাদের পরিচয় ঘটছে না। ফলে নারীদের জীবন এখন ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন।

একা নারীর পথ চলা তো আরও কঠিন, সেইসঙ্গে আতঙ্কের। কোথাও কোনো নরপিশাচ ওঁৎ পেতে বসে থাকে কি না, তা নিয়ে সবসময় নারীকে তটস্থ থাকতে হচ্ছে। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে নারীকে ঘরবন্দি থাকলেও আজকের যুগে চলছে না। তাই তাকে বাইরে বের হতে হচ্ছেই। কিন্তু প্রতিনিয়ত নারীর সঙ্গে এরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায় পরিবার- পরিজন থেকে নারীকেও প্রতিনিয়ত মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিনই যে ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা সামনে আসছে, তাতে নারী জীবনই যেন নারীর জন্য আতঙ্কের! কিন্তু নারী নিরাপত্তাহীন কেন? নারীকে নিরাপদ করে তুলতে সমাজ, রাষ্ট্রের কী ভূমিকা চোখে পড়ছে?

মানুষ সামাজিক জীব। কিন্তু বর্তমান মানুষদের মধ্যে সামাজিকতার কতটুকু রক্ষিত আছে, সেটাই বিবেচ্য! একসময় মানুষ গুহাবাসী ছিল। পশুর হিংস্র আচরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সংঘবদ্ধ করে তুলেছিল। আদিম যুগ বহু আগেই মানুষ পার করে বর্তমানে সভ্য জাতির তকমা জুড়ে নিয়েছে নিজেদের নামের সঙ্গে। কিন্তু কোথাও তার নিদর্শনটুকুর লেশমাত্র নেই। একসময় পশুর হিংস্র আচরণকে মানুষ ভয় পেতো আর এখন মানুষই পশু হয়ে উঠেছে। ফলে সেই যুগে পশুকে দমন করা যতটা সহজ হয়েছিল, এযুগে ততটা কঠিন হয়ে উঠেছে। এর কারণ শত্রুকে চিনতে বা জানতে শিখলে তা দমন করা সহজ। কিন্তু যখন শত্রুকেই চেনা যায় না, তখন দমন করা কঠিন হয়ে পড়ে! বর্তমানে মানুষের মধ্যে পাশবিকতা এতটা বেশি বিরাজমান যে, কার মনে আসলেই মনুষ্যত্ব- বিবেক আছে, কে বিবেকবর্জিত তা বোঝা কঠিন। নারীরা হয়ে উঠেছে নানামাত্রিক জটিলতার শিকার। নিজের জীবনকে যতটা নিরাপদ করে তুলতে চাচ্ছে ঠিক যেন ততটাই পাঁকের মধ্যে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। এ যেন এক ঘূর্ণিঝড়-কিভাবে থামবে এই পাশবিকতা?

কিছুদিন আগেই রাজধানী ঢাকার শ্যামলী থেকে পুলিশ পরিচয়ে এক নারীকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। প্রশাসনের পদক্ষেপে পরে তাকে উদ্ধার করা হয়। দিনে-দুপুরে এমন ঘটনা নারীদের জন্য আতঙ্কের। নারীর নিরাপত্তা কোথায়? শুধু এই ঘটনার মধ্যেই যে সীমাবদ্ধ আছে, এমন নয়। বরং কয়দিন আগেই সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরও একটি বিষয় ভাইরাল হয়েছিল; সেটি কারওয়ান বাজার এলাকায় ইত্তেফাকের গলিতে এক নারীর ফোন ছিনতাই। গত দুদিন আগে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। সেটি কমলাপুর রেলস্টেশনে নারীর গলার চেন ছিনতাই। এমন বহু ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে। এরপর রয়েছে নিত্যদিন নারী গুম, খুন, ধর্ষণ, যৌনহয়রানির ঘটনা। একটি দিন নেই, যেদিন নারীকে এমন সমস্যার মধ্যে দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে না। তাহলে নারীর নিরাপত্তা কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘কোথাও না’ শব্দযুগলে আটকে গেছে। কোথাও নারী নিরাপদ নয়। নারী সম্পূর্ণ অনিরাপদ। প্রতিনিয়ত নারীর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। কিন্তু নারীকে নিরাপদ করতে নারীর নিজের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বিশেষভাবে পুলিশ প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। আইনের শাসন কঠোরভাবে পালন না করা গেলে তাদের রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে যাবে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে কুসংস্কার, অশিক্ষা। মানুষ যতটা সভ্য হওয়ার কথা বলছে, ঠিক ততটা ভেতর থেকে বর্বরও। নিজেদের মননের উন্নয়ন এক শতাংশও ঘটেনি। নারীর প্রতি বিদ্বেষের চরমতম কালো নিঃশ্বাস সমাজের মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যার পাঠ গিলিয়ে খাতায় উগরে দেওয়ার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। জাতিকে সভ্য করার একমাত্র উপায় মানুষ্যত্বের জন্ম দেওয়া। এরসঙ্গে বেকারত্ব দূর করতে হবে। বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের জোগান দিতে হবে। কারণ আমরা জানি ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। বিষয়টি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বাস্তবতাও তাই। বাংলাদেশে বর্তমানে যুব সমাজ চরম হতাশাগ্রস্ত। আর হতশা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে আক্রোশ। এই পাশবিকতাই রূপ নিচ্ছে গুম, খুন, ধর্ষণ, নারীকে অপহরণ করার মধ্যে। ফলে জাতিকে নিয়ে নতুন করে রাষ্ট্রকেও ভাবতে হবে।

নারীদের নিরাপদ করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে পুলিশ- প্রশাসনের। নারীকে আইনি সহোযোগিতা দিয়ে তাকে নির্বিঘ্নে জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতা অপরাধীদের আরও অপরাধ করার মানসিকতা গড়ে তুলছে। তাই কোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সর্বোপরি নারীর নিরাপত্তায় পুলিশ-প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ জরুরি।