Skip to content

১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর ছোট পোশাক যেন যৌন-হয়রানির ‘টিকিট’!

বাঙালির চিরকালই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার স্বভাব। কিন্তু একবারও কি এটা বিবেচনা করেছেন, শাক দিয়ে যতই মাছ ঢাকার চেষ্টা করুন না কেন,  মাছের গন্ধে শাকের উপস্থিতিই ম্লান হয়ে যাবে। আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবস্থাও ঠিক এমন। তারা প্রতিনিয়ই এই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার আদিম নেশায় লিপ্ত। ফলে তা করতে গিয়ে নিজের গায়ের আঁশটে গন্ধ যে অন্যের নাকে গিয়ে তাকে বিব্রত করছে, এ ব্যাপারে এ শ্রেণি নিশ্চুপ। কিন্তু তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আসার বা হওয়ার কোনোই উদ্যোগ নেই। তারা পড়ে আছে  নারীদের নিয়ে। তবে এই কাতারে সবাই পড়ে না অবশ্যই। 

একশ্রেণি আছে, যারা অতি সভ্য, নম্র, ভদ্র একদম ঠিক যেন পুতুল। কারণ তারা তো ওই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় লালন করে চলেছে আজীবন।  স্বামী অত্যাচার করলেও তাদের কাছে সেটা আদরের অন্যতম মাধ্যম বলেই গণ্য হবে। যাই হোক শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নোংরা মানসিকতাকে আরেকটু শান দিয়ে নিচ্ছে, বা জায়েজ করে নিচ্ছে, এটা কিন্তু সচেতন মানুষ মাত্রই বোঝে। ফলে ঠিক ভেতরের কদর্য রূপটার বৈধতা দিতে পুরুষতন্ত্রের অন্যকে তো হেনস্তা করতেই হবে। নতুবা তার স্বার্থ কেমন করে উদ্ধার হবে?

আপনি বাস থেকে শুরু করে রাস্তার যত্রতত্র সিগারেট, বিড়ি খেয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাঁড়তে পাশে থাকা নারী যাত্রীটির চোখ-মুখ লাল করে দেবেন, বমির উপক্রম শুরু করবেন, সে বেলায় তো বালাই ষাট। না,  না।  ছিঃ। এসব কী বলছি। এটাই তো আমাদের বাহাদুর পুরুষ। যারা নিজেদের পাশবিকতা গড়ে তুলতে অন্যের ক্ষতির কেনোই বা তোয়াক্কা করবে? সব দোষ ওই নারীর যিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যিনি অন্যের বিষয়ে নাক গলানোকে জায়েজ মনে করছেন না। তবে নিশ্চিয়ই যেখানে-সেখানে ধোঁয়া ছেড়ে অন্যের নাক-মুখ বন্ধ করার চেয়েও নারী জঘন্য অপরাধ করেন?

তারপর আসুন আমাদের পুরুষ তারা তো ভগবান সদৃশ।  রাস্তায় যেখানে-সেখানে শিশ্ন বের করে বসে যান প্রস্রাব করতে। সে বেলায়ও বলবেন, ওই সব দোষ নারীর। পরিবেশ তো নষ্ট হয়ই না। আরে বাবা তাতে কার কী ক্ষতি হয়? এ ব্যাপারে তথাকথিত ভদ্র নারীরাও বলবেন, আরে বাবা তারা তো পুরুষ।  সোনার আংটি তো তারা। সব পারে। কথা হলো পুরুষের যেখানে-সেখানে মুত্রত্যাগ সমাজের কোনো উপাকারে আসে? কিছু নারীর হয়তো আসেও। নাহলে তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়ে সত্যি কি কোনো কথা বলার আছে?

কথা হলো অশ্লীলতা,  নগ্নতা নারীর পোশাক হতে পারে না। তথাকথিত ভদ্র, সুশীল রমণীদের সঙ্গে আমিও একমত হলাম। তারপর পুরুষও একথা বলছে। অবশ্য তাদের দেখানো পথেই তো সুশীল, সুলক্ষণা,  ভদ্র মেয়েরা চলেন। কারণ তারা তো মুখে টু শব্দটিও করতে পারেন না। কিন্তু এই-পুরুষতন্ত্রের মোবাইলফোনটা ঘাটলে আমার মনে হয় পর্ন সাইটের ভিউ তাদের ফোনেই বেশি পাওয়া যাবে। কেন বলুন তো? বাইরে তারা অতি ভদ্র সন্তান যে!

আপনার জল আসছে! ফলে এই জল নিয়ন্ত্রণ যে আপনার ভেতর থেকে আসছে না, সেটার দায়ও নারীর। আর জল কেন আসছে,  তাও শুধুই স্লিভলেস টপসের কারণে! কী আশ্চার্য জাতি আমরা তাই না!

ঠিক তেমনই গণপরিবহনে উঠে দাঁড়াতেই সিট পেলে তো এক পরিস্থিতি, আর না পেলে ওই নারী তখন বাসের পাবলিক প্রোপার্টি হয়ে যায়। তাকে যেভাবে যেমন করে পারা যায় ঠেসেঠুসে একপাশে নিতে চেষ্টা করে। তবে সেখানে কিন্তু নারীটিই সাবধানতা অবলম্বন করে। আর পুরুষ যাত্রীরা জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ গণপরিবহন তো তাদের বাসার ড্রয়িং রুম! আবার যখন গণধর্ষণ হচ্ছে দোষ কার? নারীর। কারণ সে শাড়ি, সালোয়ার কামিজ বা জিন্স-টপস বা বোরখা এসবই পরে। কারণ আমাদের দেশে তো আর বিকিনি-প্যান্টি পরে কেউ রাস্তায় বের হন না। এমনকি গড় করলে হয়তো লাখে একজন স্লিভলেস ড্রেস পরে। বা করতে পারে। এই প্রসঙ্গের অবতারণা করতে বেশ একটা হাস্যকর টপিক উঠে এলো। বিভিন্ন ভিডিও, ইউটিউব কনটেন্টগুলো এতটা সস্তা হয়ে গেছে আজকাল, যে যার মতো করে একখান ইস্যু পেয়ে তার বাচ্চা ফোটাতে ব্যস্ত। সেটি বর্তমানে ‘পোশাক’। তাও আবার নারীর।

বিষয়টি হচ্ছে নগ্ন। বলুন তো নগ্ন শব্দের সঠিক অর্থ? এর ইংরেজি পারিভাষিক শব্দ Nude। আর বাংলায় সমার্থক দাঁড়ায় উলঙ্গ,  অনাবৃত, ন্যাংটা। এখন কথা হলো বাংলাদেশের কোনো নারীকে দেখেছেন এমন? আমি হলফ করে বলতে পারি ও  শতভাগ নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি, তা অসম্ভব৷ ফলে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে শুধু পবিত্রতার দিকে লক্ষ না রেখে পুরুষতন্ত্র দয়া করে একটু শব্দের ব্যবহারিক দিকের প্রতিও লক্ষ রাখুক। এবার আসুন অশ্লীল শব্দের ক্ষেত্রে। অশ্লীল বলতে আপনি কী বোঝেন? আমার মাথায় আপাতত এর অর্থ আসছে অশালীন, অশিষ্ট,  কুরুচিপূর্ণ,  জঘন্য, অসুন্দর  অর্থাৎ সুন্দর নয় এমন৷ এখন বলুন তো এই যে অশ্লীল শব্দটির ওপর এত জোর দিচ্ছেন আপনার বা আমার সামনে কয়জন নারী শুধু ব্লাউজ টাইপ ছোট পোশাক পরিহিত অবস্থানে দেখেছেন? কয়জন নারীকে দেখেছেন হাঁটুর ওপর প্যান্ট পরিহিত?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এগুলো আজও সম্ভব হয়নি। যে অবস্থা সেখানেও জাতির ধ্বংসাবশেষেও এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ আমরা তো প্রচণ্ড সভ্য, ভদ্র, সুশীল, নম্র আর দিনশেষে বউকে পেটানো জাতি। ফলে সভ্যতার ছায়া তো আমাদের আছেই। আর আছে যেখানে-সেখানে প্রস্রাব করা, ধোঁয়া ছাড়া, অন্যকে গুম করা, হত্যা করা, খুন করা, অন্যের টাকা মেরে খাওয়া, রাহাজানি আরও কত কী! এর লিস্ট শেষ হওয়ার নয়। কারণ বাহাদুরি খেতাব পেলে সেগুলো কী কমে!  একবাক্যে আপনিও বলবেন নিশ্চয়ই না। মা যখন নিজের সন্তানকে শাসন করা বাদে পাশের বাড়ির সন্তানটির ওপর চোখ রাঙাতে শুরু করেন, তখন নিজের সন্তানটি গোল্লায় যাবে, এ আর এমন কী!

যাক সবকথার ওপর এখন আরেক প্রশ্ন মনে বেশ জেঁকে বসেছে। অনেকেই বলছেন নারীর স্বাধীনতা আছে বলেই তিনি নগ্ন, অশ্লীল হয়ে বের হতে পারবেন না। বুঝলাম ঠিক বলেছেন৷ এখন বলুন তো পুরুষের হাঁটু ছেঁড়া জিন্স আর বক্ষের সঙ্গে লেপ্টে থাকা টিশার্ট নারীরা কি সিডিউস হন? না তারা তো মায়ের জাত। ফলে সবার মধ্যে সন্তানের ছায়া নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা। তাই এমন পাপের উদয় তাদের মনে হতেই পারে না। এখন পুরুষের থায়ের নিচে ছেঁড়া জিন্স আর নারীর স্লিভলেস জামা, কোনটা বেশি আকর্ষণীয়? কবজির নিচে ও হাতের বাজুতে তফাতটা কী বলুন তো?

এবার আরেকটু পেছনের ঘটনার দিকে যায়,  যেখান থেকে পোশাক নামক সস্তা ইস্যুর আমদানি। সেই মেয়েটি যিনি নরসিংদীতে হেনস্তার শিকার হলেন।  তিনি কী পরেছিলেন? যতটুকু জানা আছে তাতে তিনি স্লিভলেস টপস আর জিন্স পরেছিলেন। সেখানে আপনার সমস্যা কোথায়? পুরুষ জিভে জল এসেছিল? সঠিকভাবে ধরলে তেমনই। চোখের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ তো আপনারও দায়িত্ব।  কোথায় কী বলতে হয় যেমন মাত্রা জ্ঞান থাকা উচিত ঠিক তেমনই আপনারও উচিত আপনার চোখকে সংযত করা।  মনকে শান্ত করা। সংবাদ পোর্টালের  কমেন্টবক্সে একটি সুন্দর কমেন্টস করেছেন এক পুরুষ। তার বক্তব্য, তেঁতুল দেখলে সবার জিভে জল আসে। তাহলে এখন কথা হলো প্রথমত আপনি আপনার অভিমত দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করেছেন। দ্বিতীয়ত তেঁতুলেও লোভ সামলানো যায়, যদি টক আপনি পছন্দ না করেন। আপনার সামনে যতই এমন টক খাবার থাকুক আপনি দৃষ্টি ফেরাবেন। কারণ আপনি তো পছন্দই করেন না। কিন্তু কী হলো? আপনার জল আসছে! ফলে এই জল নিয়ন্ত্রণ যে আপনার ভেতর থেকে আসছে না, সেটার দায়ও নারীর। আর জল কেন আসছে,  তাও শুধুই স্লিভলেস টপসের কারণে! কী আশ্চার্য জাতি আমরা তাই না!

নিজের মাথা ও মনকে সংযত করুন। কোথায় কী প্রয়োগ করলে আপনাদের উন্নতি-অবনতি হবে, তার হিসাব করুন দয়া করে। 

অনেক নারীর বক্তব্য ছোট পোশাক এক নারী থেকে অন্য নারীকেও নির্যাতনের শিকার করে তোলে। কী বুঝে এরূপ মন্তব্য করছেন? বরং এটা বলুন সারারাত জেগে পর্ন সাইটের নেশা আপনাদের কাজ করে। তাই  কুকুরের স্বাভাবজাত ধর্ম আপনাদের মনেও জাগ্রত হয়। নিজের যদি কাজ থাকে, তবে হয়তো এতটা পরচর্চা করে না কেউ। এখন তো মনে হচ্ছে চালের দাম, ডালের দাম বা নিত্য পণ্যের দাম খুবই স্বাভাবিক চলছে। এদেশের মানুষ তো ধর্ষণ, খুন, যৌন- হয়রানির টিকিট পেয়েছে। নারীর পোশাক তার টিকিট। কিন্তু টিকিট তো ক্রয়ের বিষয়। আপনি কী দিয়ে ক্রয় করলেন? আপনার মানসিকতা দিয়ে?

নিজেদের মানসিকতা বদলান। সময় বদলানোর। ফলে কলমের কালি যতটা লেপ্টাতে চাইবেন, ঠিক ততটাই লেপ্টাবে। নিজের মাথা ও মনকে সংযত করুন। কোথায় কী প্রয়োগ করলে আপনাদের উন্নতি-অবনতি হবে, তার হিসাব করুন দয়া করে।  আরও একটি মজার বিষয় দেখেছেন। যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। তার পোশাকও নিশ্চয়ই  পুরুষতন্ত্রের নজর কেড়েছে। এখন আমার ভাবনা সেদেশের মানুষ আর কোনোই কাজ করতে পারবে না। কারণ তারা তো সব বেঘোরে আছে হিসাব মতো! লিজ ট্রসের সৌন্দর্য, তার সঙ্গে পোশাক নিয়েই ওই দেশের শাসন ভার হয়তো এলোমেলো হবে দ্রুতই! আমাদের দেশের এত বিজ্ঞজনের মধ্য থেকেই কেউ হয়তো ভার পেতেও পারেন।

আগে নিজে বদলান। তবে অন্যকে বদলানোর কথা বলবেন। জানেন তো ইসলাম ধর্মেও বলা আছে,  নিজে যে কাজটি করবেন না, তার উপদেশ অন্যকে দেবেন না। ফলে আগে নিজে বিশ্বাস করুন।  ভাবুন। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে টানাহেঁচড়া না করে নিজের উন্নতি নিয়ে ভাবুন। তার ফলে উপকারটা দিন শেষে আপনারই হবে।