Skip to content

১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আজও কি নারী স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে?

গ্রাফিক্স: অনন্যা

আজকের যুগে এসেও নারীরা কী স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে? সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী নারীরা বলছেন, ‘না’। নারী কখনোই স্বাধীনভাবে তার মত প্রকাশ করতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী আজও অবদমিত। জীবনযাপনে পরাধীন। অধিকার সম্পর্কে কথা বলতে গেলে নারীর কণ্ঠরোধ করা হয় সর্বত্র। প্রতিনিয়ত নারীকে ‘নারী’ শব্দটি দিয়ে একটি বেড়াজালে বন্দি করে রাখা হয়। নারী যেন পরিপূর্ণ কোনো মানুষ নয়, বরং খণ্ডিত পরনির্ভরশীল বস্তু বা প্রাণীমাত্র।

এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক ড. শামীমা নাছরিন বলেন, ‘একুশ শতকে এসে যদি প্রশ্ন থেকে যায়, নারী কি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে, তাহলে এর মানেই হলো এখনো পরাধীনতার বোধটাকে চাগাড় দেওয়া। নারীকে নারী নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিটি নারীই পরিপূর্ণ। সে কখনো পরাধীন হতে পারে না। সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস রাখে নারী। নারীদের সব ক্ষেত্রে কাজ করার সমান সুযোগ-সুবিধা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা আজ শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নেই। নারী পৌঁছে গেছে বিমানের ককপিট থেকে পর্বতশৃঙ্গে। নারী ঘরে-বাইরে নিজেকে আলোকিত করছেন নিজ মেধা আর প্রজ্ঞা দিয়ে। পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী।’

অধ্যাপক ড. শামীমা নাছরিন

ড. শামীমা নাছরিন আরও বলেন, ‘‘নারীরা বর্তমান যুগে শুধু অন্তঃপুরবাসী নয় বরং তারা উন্নয়নে পুরুষের সমঅংশীদারিত্বের দাবি রাখে। কিছু ক্ষেত্রে নারী সমাজ যুগ যুগ ধরে শোষিত ও অবহেলিত হয়ে আসছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বেড়াজালে নারীকে সর্বদা রাখা হয়েছে অবদমিত। অথচ সংবিধানে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন।’ বস্তুত নারীরা খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছেদ, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পুরুষের বৈষম্যের শিকার হয়। প্রত্যেক মানুষেরই চিন্তার স্বাধীনতা এমন হতে হবে যেন অন্যের ক্ষতির কারণ কিংবা বিদ্বেষ সৃষ্টি না করে। জনজীবন ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর সম্মান ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে প্রতিটি স্তরে। নারীর রয়েছে শিক্ষা অর্জনের অধিকার স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকার। কবি কাজী নজরুল ইসলামের উক্তি দিয়ে শেষ করছি, ‘সেদিন সুদূর নয়/ যে দিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।’’

রহনপুর আহম্মদী বেগম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার সহকারী শিক্ষক মোসা. শামীমা সুলতানা ছন্দা বলেন, ‘‘নারী শব্দটার মধ্যেই কেন যেন পরাধীনতা লুকিয়ে রয়েছে। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও ‘নারী স্বাধীনতা’র স্বাদ তেতো, না কি মিষ্টি; তা পুরোপুরি নারীরা বুঝতে পারে না! স্বাধীনতা মানে চিন্তার স্বাধীনতা, স্বাধীনতা মানে কর্মের স্বাধীনতা, স্বাধীনতা মানে পোশাক-আশাক, চলাফেরাসহ মত-প্রকাশের স্বাধীনতা। অথচ আজ নারীর পোশাক নিয়ে আন্দোলন হয়, ছোট পোশাক পরিহিত মেয়েকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা হয়! তাহলে কি নারীর শারীরিক গঠনই তার পরাধীনতার কারণ! যেখানে নারীর পোশাকেরই স্বাধীনতা নেই, সেখানে তার মতকে কে প্রধান্য দেবে?’

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘আজও আমাদের মায়েরা সেই চিরচেনা রান্নাঘরে বন্দি! কখনো কি আমরা আমাদের মাকে জিজ্ঞাসা করেছি, মা রান্না ছাড়া তুমি আর কী পারো? তুমি জীবনে কী হতে চেয়েছিলে, যা তুমি হতে পারোনি? কারণ রান্না করাটা জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আজ নারীরা ক্ষমতায় আছে, সেটা যেমন আমরা জানি, তেমনি বাসে ট্রামে নারীকে ধর্ষণ করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ‘এই তুই নারী, তুই পুরুষের লোলুপ দৃষ্টিতে ক্ষত-বিক্ষত হতেই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিস!’ তখন কোথায় যায় নারীর ক্ষমতায়ন?’’


মোসা. শামীমা সুলতানা ছন্দা

শামীমা সুলতানা বলেন, ‘এখনো সমাজে ৯৯ শতাংশ নারীর জীবন ছোটবেলায় তার বাবারা নির্ধারণ করে দেয়, আর বড় হয়ে স্বামীরা নির্ধারণ করে দেয়। তাহলে নারীরদের মত বলে সমাজে কোনো শব্দই থাকলো কি?’ তিনি বলেন, ‘‘তুমি বাবার বাড়িতে অবহেলিত হও মেয়ে বলে। তুমি শ্বশুর বাড়িতে অবহেলিত হও বউ বলে। তুমি স্কুল-কলেজে লাঞ্চিত হও ছাত্রী বলে। তুমি বাসে, ট্রামে ধর্ষণের শিকার হও, তোমার শারীরক গঠন ছেলেদের মতো নয় বলে। তাহলে, ‘নারীর মত’ বলে কোনো শব্দই সমাজে নেই।’’

লেখক ও গবেষক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের বাংলার প্রভাষক পূজা মিত্র, বলেন, ‘‘না, আজকের যুগে এসেও নারীরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পায়নি। মুখে আধুনিকতা, নারী স্বাধীনতা, নারীর স্বাবলম্বিতা ইত্যাদি নানাবিধ কথা আমরা বলি এবং শুনি। কিন্তু তার বাস্তবায়ন সর্বক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি বলেই এখনো নারী স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে না। যদিও ‘নারীর অধিকার, ‘নারী স্বাধীনতা’ শব্দগুলোকে মাঝে মাঝে অবান্তর মনে হয় কিন্তু সমাজ তো নারীকে এখনো কেবল নারী করেই রেখেছে। নারীবাদী পুরুষও তার ঘরের নারীর অবাধ চলাচলে কট্টর। গ্রামীণ সমাজে নারী এখনো সেই কেতাবকথিত ‘শস্য উৎপাদন ক্ষেত্র’, এখনো বিবেচনা করা হয় তাদের জন্ম কেবল ‘পুত্র উৎপাদনের উদ্দেশ্যে’।’’

পূজা মিত্র বলেন, ‘‘শুধু অশিক্ষা জর্জরিত সমাজে নয়, শিক্ষিত সমাজও নারীকে কাপড়চোপড় পেচিয়ে পুতুল করে রেখেছে। আর জড়বস্তু পুতুল কথা বলবেই বা কিভাবে? মূলকথা, মুখে আমরা নারীর যথাযথ মর্যাদার কথা বলি কিন্তু তাদের ওপর চাপিয়ে দেই ডালাভর্তি বিধিনিষেধ। এই বিধিনিষেধের বোঝা যতক্ষণ না তাদের মাথা থেকে নামানো হবে, ততক্ষণ তারা মুখফুটে কিছু বলার সাহস পারবে না। মন চাইলেও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে না। নারী যে স্বাধীনভাবে কিছু বলতে পারছে না, তার আরেকটি কারণ ‘লজ্জা-শরম’ নামক ভয়ঙ্কর একটা অবাস্তব বস্তুর আবরণ জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের অঙ্গে। পুরুষের লজ্জার বালাই নেই কিন্তু নারীকে হতে হবে শান্তশিষ্ট লজ্জাশীলা। এই কারণে মন চাইলেও তারা ইচ্ছেমিতো কিছু বলতে পারে না। পাছে লোকে কী মনে করবে এই ভেবে।’’

পূজা মিত্র


এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘মুখে আমরা যতই নারী স্বাধনতার কথা বলি. নারী কিন্তু এখনো স্বাধীন নয়। স্বাধীন হতে হলে প্রথমে মুখফুটে কথা কথা বলতে হবে। আমাদের নারীরা এখনো এক চতুর্থাংশের বেশি বোবা। কিছু লোভনীয় বিশাল বিশাল মুলো তাদের মুখের ওপর ঝুলিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, মুখফুটে কিছু বললেই মুলো খেতে পারবি না। নারীরাও মেনে নিয়ে বসে আছে। মুলো তাদের চাই-ই চাই। আমার মতে, নারীরা যে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে না, এর জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে সঙ্গে সমান দায়ী নারী। নারী যতদিন না তাদের নারী না ভেবে মানুষ ভাবা শুরু করবে, ততদিনে তারা মুখ খুলতে পারবে না। গোড়ার গলদ দূর হওয়া আবশ্যক। কাল্পনিক সুখের চেয়ে বাস্তব জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।’
পূজা মিত্র বলেন, ‘শেষকথা হলো, নারীরা এখনো তাদের নারী ভাবে এবং পুরুষরা নারীরকে ভীষণভাবে ঈর্ষা করে বলেই নারী আজকের যুগে এসেও স্বাধীনভাবে কিছু বলার সাহস পায় না।’

আন্তর্জাতিক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, দিল্লি পাবলিক স্কুরের সিনিয়র সেকশনের শিক্ষক নাজিয়া হাসান বলেন, ‘নারীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবসময়ই সীমিত। আধুনিক যুগে নারী মত প্রকাশ করতে পারবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নারীর পেশাগত অবস্থান, সামাজিক অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিকতার ওপর। একজন নারী যদি কর্মজীবী হন বা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তাহলে তিনি সহজেই নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন। অন্যথায় মত প্রকাশ করার চেষ্টা করলেও ব্যাহত হতে হয়। তার মূল্যায়ন হয় না। একজন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষক হিসেবে বলতে পারি, কর্মক্ষেত্রে যোগদানের পর থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মূল্যায়ন অনেকাংশে বেড়ে গেছে।’


নাজিয়া হাসান

এই শিক্ষক বলেন, ‘গোঁড়ামির কারণে অনেক সময় আমাদের দেশে নারীদের মতের গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যা উচিত নয়। তবু বলা যায়, আজকের যুগে নারীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবারিত না হলেও অনেকটাই প্রশস্ত।’

আবৃত্তিশিল্পী, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলা ভিশনের সংবাদ উপস্থাপক ফারহানা তৃনা বলেন, ‘মত-প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে যদি জীবনের সব সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারার স্বাধীনতার কথা বলা হয়, তবে বলতে হবে, সেই স্বাধীনতা এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে দেয়নি। এদেশে নারীরা প্রথমে তার পরিবার থেকেই বৈষম্যের স্বীকার হয়। শুরুতে বাবা-ভাইয়ের কড়া শাসন, এরপর স্বামীর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে, অবশেষে নিজের ছেলের দ্বারা শাসিত হওয়াই অধিকাংশ বাঙালি নারীর জীবনচক্র।’

তৃনা বলেন, ‘আমাদের দেশে তো এখন অনেক নারীই শিক্ষিত। তবু সবাই কি সব সময় সব জায়গায় প্রতিবাদের মুখ খুলতে পারেন? নারীর ক্ষমতায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার। আবার কখনো সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীর ক্ষমতায়নে নারীরাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার থেকে নারীদের পুরুষের কাছে নমনীয় হয়ে জীবনযাপনের শিক্ষা দেওয়া হয়। সবার সব সিদ্ধান্ত বিনাবাক্যে মেনে নেওয়াই যেন নারীর ধর্ম। তখন কিন্তু নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রকাশের কোন সুযোগ থাকে না, সব ক্ষেত্রে স্বাধীনতাও থাকে না।’

ফারহানা তৃনা

এই সংবাদ উপস্থাপক আরও বলেন, ‘তবে, অতীত ও আজকের যুগের তুলনায় যদি আসি, আমি যখন আমার মায়ের দিকে তাকাই তখন, আমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়। কেননা আমি ছোটবেলা আমার মাকে শিক্ষিতা হওয়া সত্ত্বেও পরিবারে যতটুকু মত-প্রকাশের স্বাধীনতা পেতে দেখেছি, তার চেয়ে আরও বেশি স্বাধীনভাবে আমি এখন মত প্রকাশ করতে পারছি। আবার ক্ষেত্র বিশেষে, আমাদের আশেপাশের নারীদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও সমাজের ও ধর্মের চাপিয়ে দেওয়া নারীর নমনীয় বৈশিষ্ট্যের তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব ও নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে পারার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন।’

এই আবৃত্তিশিল্পী আরও বলেন, ‘নারীর মত-প্রকাশের স্বাধীনতা যে কী, তা উপলব্ধি করার মানুষের বড় অভাব। বর্তমান সমাজে দুই ধরনের জনগোষ্ঠী খুব তৎপর। এক ধরনের জনগোষ্ঠী বিধিনিষেধের দোহাই দিয়ে নারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কৌশলে ধ্বংস করার চেষ্টায় মত্ত। আরেক ধরনের জনগোষ্ঠী নারী স্বাধীনতার আড়ালে উগ্রতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত। নারীর মত-প্রকাশের স্বাধীনতা মানে কিন্তু উগ্রতা নয়। সেই বিষয়টি অনুধাবন করার মতো ব্যক্তিত্বও কিন্তু একজন নারীর থাকতে হবে।’