Skip to content

২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীকে দোষারোপ করে পুরুষতন্ত্র কী সুখ পায়?

নারীর সম্পূর্ণ জীবনযাপন পদ্ধতি এবং দায়-দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে গেলে বোঝা যায়, নারীর ওপর কতকিছু চাপানো। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র নারীকে প্রতিপদে বিভিন্ন বিধিনিষেধ দিয়ে একটা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছে। যুগের পরিবর্তনে নারীরা যখন নিজেদের অধিকার ও জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করেছে, তখনই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যার। নারীকে অবরুদ্ধ রাখতে, দমিয়ে রেখে শোষণ করার নানারকম পাঁয়তারা লক্ষ করা যাচ্ছে পুরুষতন্ত্রের মধ্যে।

পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে কিছু নারীও গলা মিলেয়ে-কোমর বেঁধে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়ায় অংশ নিতেও পিছপা হচ্ছে না। কিন্তু নারী কেন পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার ধারক-বাহক হচ্ছে? সবার সমান অধিকার স্বাধীনভাবে বাঁচার কিন্তু বারবার নারীর পায়ে শেঁকল বেঁধে নিচের দিকে টেনে-হিঁচড়ে নামাতে না পারলে যেন এক শ্রেণির মনোবাসনা পূর্ণ হয় না কিছুতেই। সেক্ষেত্রে যখন জ্ঞান-মেধা-প্রজ্ঞায় নারীরা অগ্রগ্রামী ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে, তখনো তাকে থামাতে চেষ্টা করা হচ্ছে পোশাকের কোডিং করে। শুধু কি তাই? বরং নারীকে পোশাকের কোডিং-এ বেঁধে করা হচ্ছে যৌননির্যাতন। ধর্ষণ, গুম, খুনের মতো ভয়াবহ ঘটনার শিকার হচ্ছে নারীরা। কিন্তু নারীকে যেই কাঠগড়ায় পুরুষতন্ত্র দাঁড় করাচ্ছে, তারা একবারও কি নিজের মানসিকতার পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছে?

যখন যেই বিষয় সামনে আসে, সেখানে কিভাবে নারীদের সংযুক্ত করে হেনস্তা করা যাবে, সেই মানসিকতা পুরুষতন্ত্রের।

নারীর জীবনযাপনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে সঠিক পথ না দেখতে চেষ্টা করে বরং পুরুষতন্ত্রের আজ্ঞাবহ যারা, তারা নিজেদের ওপর রেশ টানলে কী সমস্যা? নারীরা জানে, তার পোশাক থেকে শুরু করে তার জীবন পরিচালনা কিভাবে করতে হবে। যদি না জানতো, তবে হয়তো পুরুষ সমাজ আজকের স্থানে এসে হামবড়া ভাব দেখাতে পারতো না। যদি শুধু অর্থনৈতিক জোগান দেওয়া ছাড়া পরিবারের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব কোনো পুরুষ পালন করতো, তবে হয়তো স্পষ্ট হতো, নারী কে-কী এবং নারীরা কতটা কষ্ট সহিষ্ণু। নারীর সম্পর্কে যখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শ্রেষ্ঠত্বের জয় নিয়ে কিছু নারীর মিছিল সামনে আসে, তখন মনে হয় জাতির উন্নতি এখনো থমকে আছে।

সব দায় কখনোই নারীর একার নয়। পথে বের হলেই নারীর প্রতি দৃষ্টি অবনত করাও পুরুষের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত না করে একতরফা নারীর প্রতি সব দোষ দেয় তারা। কিছুদিন যাবৎ নারীর পোশাক নিয়ে কথা হচ্ছে। তবে, কথা বললে ভুল হবে বরং বলা চলে অশ্লীল, অকথ্য মন্তব্য চলছে। যেই মন্তব্যের জোয়ারে শুধু পুরুষ নয় বরং পুরুষের কিছু নারী সারথীও আছে, যাদের মন্তব্য সবচেয়ে ভয়ানক। তবে যখন এক নারীর প্রতি আরেক নারীর এ ধরনের কদর্য মন্তব্য উঠে আসে, তখন সেই নারীর প্রতিই করুণা হয়। নারীদের থমকে যাওয়া, পিছিয়ে পড়ার পেছনে পুরুষ যতটা দায়ী, কতিপয় নারীও ততটা দায়ী। তারা সব দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব থেকে সরে আসতে চান।

আজকাল গণমাধ্যমের সুবাদে নানারকম ঘটনারই সাক্ষী হতে হয়। কিন্তু যখন নারীদের সম্পর্কে কোনো সংবাদ সামনে আসে এবং নারীদের প্রতি পুরুষের আক্রমণাত্মক মানসিকতা দেখি, তখন আঁতকে উঠতে হয়। এই সমাজে নারীকে সব দায় দিয়ে পুরুষতন্ত্র দিব্যি নাকে নস্যি দিয়ে ঘুমায়। নিজেদের যে কিছু দায় আছে, সমাজকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে সে বিষয়ে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন মানুষেরা অনেকটাই উদাসীন। সবাই শুধু একে অন্যের প্রতি দায় দিয়ে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় রাখতে চায়। কিন্তু নিজেকে কতটা বদলানো উচিত, ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন কতটা হওয়া উচিত, সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি কিভাবে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করা যায়, তার চর্চায় কারও অংশগ্রহণ দেখা যায় না। বরং সবাই আছে, একটি উদ্ভট চিন্তা-চেতনার জোয়ারে। যখন যেই বিষয় সামনে আসে, সেখানে কিভাবে নারীদের সংযুক্ত করে হেনস্তা করা যাবে, সেই মানসিকতা পুরুষতন্ত্রের।

নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ছাড়া, মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া কোনোভাবেই জাতির প্রতি, নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সম্ভব নয়।

বেশিরভাগ পুরুষের চোখ তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখবে না। তাদের যা ইচ্ছে তাই তারা করতে পারেন। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানারকম বার্তার লিংকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পারে। কেন তারা নিজেদের সামলাবে? ভুল তো সব নারীর! তারা এ ধরনের কুলাঙ্গার জন্ম দিয়েছেন। যারা যেই নারীর গর্ভে জন্মেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।

তবে নারী তো নারীই। সমাজের নগণ্য কোনো বস্তুর সঙ্গে তুলনীয়। ফলে সব দায় নারীর। পরিবারে সমস্যা হলে নারীর দোষ। সমাজের মাঝে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে সেখানেও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নারীকে সংযুক্ত করে ক্ষান্ত হয় পুরুষতন্ত্র। এটা যেন একমাত্র সমাধান-নারীই সব দোষের ভাগী। ফলে বিচার-আচারের কোনোই ব্যাপার নাই, যা ঘটেছে তার জন্য একবাক্যে নারীই দোষী। কারও বিচ্ছেদ হলো দোষী নারী। কারও দাম্পত্য সমস্যা সে দায়ও নারীর। কারও সন্তান পড়াশোনায় খুব একটা ভালো করছে না, সে দায় নারীর, কারও শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে মনোমালিন্য, তার দায় কার নারীর।

পৃথিবীর সব দায় নারীর। এখানে আর কারও কোনোই সম্পৃক্ততা নেই, এমন ভাব পুরুষতন্ত্রের। কিন্তু সব দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে দমিয়ে দেওয়ার আগে ভাবতে চেষ্টা করুন, যদি ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খুব মাথা ঘামাতে ইচ্ছে হয়, তবে নিজেকে ব্যক্তিটির জায়গায় বসান। সহজ সমাধান হিসেবে নিজে কী করতেন, কী করা উচিত ছিল, তা নিয়ে ভাবুন। তাতে বরং আপনার নিজের চারিত্র্যিক উন্নতি ও চিন্তার প্রসার ঘটবে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ছাড়া, মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া কোনোভাবেই জাতির প্রতি, নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সম্ভব নয়। অন্যের প্রতি যতটা অবনত হবেন, ঠিক ততটা অন্য ব্যক্তিও নত হতে বাধ্য। ফলে আগে নিজের মগজের প্রসরতা বৃদ্ধি করুন।