Skip to content

১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর ছোট পোশাকে পুরুষতন্ত্রের আপত্তি কেন

গ্রাফিক্স: অনন্যা

নারীর পোশাক নিয়ে কেবল পুরুষরাই আপত্তিকর কথা বলে না, পুরুষতন্ত্রের আজ্ঞাবহ নারীরাও কটূক্তি করে। এমন কিছু পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি কদিন আগে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিল। আর তাদের ওই সব প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘নারীর ছোটো পোশাক তাকে বিজ্ঞানী নয়, বরং পণ্য বানায়’। বিষয়টি নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের বিদ্বেষ ও বিকৃত মানসিকতা হিসেবে দেখছেন বিচারক, শিক্ষকসহ পেশাজীবী নারীরা। তারা বলছেন, এমন বিকৃত মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।

নারীর পোশাক নিয়ে পুরুষতন্ত্রের আপত্তির বিষয়টি বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক বলে মনে করেন বরিশালের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ রূপে ভুল ধারণা। মাদাম কুরি, মেরী কুরি, বোরখা, হিজাব কিংবা সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি পরা নারী ছিলেন না! তারা তো ছোট পোশাকেই পৃথিবী জয় করলেন! একবার নয়, মাদাম কুরি তো তিন-তিন বার নোবেল জিতেছেন। আসলে আমার মতে, পোশাক প্রত্যেকের নিজস্ব রুচি ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরবে। দেখুন আমাদের সমাজ মেয়েদের পোশাক নিয়ে ভাবছে কিন্তু খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুরুষের প্রস্রাব করা নিয়ে ভাবছে না! আসলে সমস্যা পোশাকে নয়, সমস্যা চিন্তায়! কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেয়েরা ছোট পোশাকে থেকে নিজেকে বহুভাবে প্রমাণ করেছে, করে চলেছে! একজন বিজ্ঞানীকে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে হয়, তার গবেষণাগারের তাপমাত্রা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, যেখানে পুরুষ সেই তাপমাত্রা অনুযায়ী পোশাক পরতে পারেন, নারী কেন পারবেন না!’

এই বিচারক আরও বলেন, ‘আরেকটি বিষয় নারীর ছোট পোশাকই যদি তাকে ‘পণ্য’ বানায়, তবে ২/৩ বছরের শিশু কেন ধর্ষণের শিকার হয়ে খুনেরও শিাকর হয়?’ তিনি বলেন, ‘আপনি খোলা রাস্তায় পুরুষাঙ্গ বের করে নিজের প্রস্রাব করতে দ্বিধা করছেন না, অন্যদিকে নারীর হাত-পা, গলা-পিঠ দেখেই আপনি জাগ্ৰত পিশাচে পরিণত হবেন, তা তো হতে পারে না। চিন্তার দৈন্য দূর করুন। আপনার যেমন বিভিন্ন বিষয়ে ভালো লাগা, মন্দ লাগা রয়েছে, তেমনি অন্যেরও একই রকমের অনুভূতি রয়েছে। প্রত্যেককে তার মতো বাঁচতে দিন, অন্যের সমালোচনা বন্ধ করুন। নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানুষ হিসেবে ভাবুন, মানুষকে ভালোবাসুন।’

ইসরাত জাহান

শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত নারীরা মনে করেন, নারীর পোশাক নিয়ে বিতর্ক বহু বছর ধরেই চলছে। বারবারই নারী কোথায় কী ধরনের পোশাক পরবে, সেটা পুরুষতন্ত্র জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি দেখা গেছে ‘ছোট পোশাক নারীকে বিজ্ঞানী বানায় না, পণ্য বানায়’, ‘পোশাকের স্বাধীনতার নামে পাবলিক নুইসেন্স বন্ধ হোক’ প্রভৃতি লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে মানববন্ধন করেছে, যা নারীর অধিকার হরণের সামিল।

এই প্রসঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসনের সহযোগী অধ্যাপক ড. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘একজন নারী কী পরবেন, সেটা সম্পূর্ণই তার অভিরুচির ওপর নির্ভর করে। আমি মনে করি বেশিরভাগ নারীরই পোশাকজ্ঞান তৈরি হয়ে যায়। কোথায় কোন পোশাকটি পরিধান করবে, তা নারীরা জানে। তারপরও যেহেতু পোশাক সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই অন্য কারও পোশাকের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করাটা অনুচিত। পোশাকের সঙ্গে বিজ্ঞানী ও পণ্য হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই৷ শুধু শরীর ঢাকার জন্য নয়, মানুষ পোশাক পরে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্যও। মানুষের দক্ষতা বাড়ানোর সঙ্গে পোশাকের কোনো সম্পর্ক নেই৷ পোশাক কাউকে পণ্যও বানায় না৷ মানুষ নিজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জন্য পোশাক পরিধান করে৷’

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘ওয়েস্টার্ন দেশগুলোতে নারীরা যে ধরনের পোশাক পরে, তাহলে তো তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কথা। পণ্য হয়ে যাওয়ার কথা৷ কিন্তু তারা কি পিছিয়ে আছে বা পণ্য হয়ে গেছে? এটা কেবল আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা। যদিও এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জেন্ডার গ্যাপ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ভালো। তবু বাস্তবিক অর্থে আমাদের চিন্তাধারা এখনো সেকেলে। যার কারণেই বিভিন্ন নারীদের পোশাক নিয়ে বিতর্ক হয় এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণে নারীদের হেয় করা হয়৷ এমনকি বিভিন্ন সময় পোশাকের জন্য হেনস্তার শিকার হয় নারীরা৷ ’ তিনি আরও বলেন, আমরা এখনো চিন্তাশক্তির প্রসার ঘটাতে পারিনি৷ এভাবে যদি পোশাকের জন্য নারীদের হয়রানি করা হয় তাহলে দেশের উন্নয়নে নারীরা অবদান রাখতে পারবে না৷ আমাদের উচিত নারীদের অধিকার সম্পর্কে জানার পাশাপাশি সেকেলে চিন্তাধারার পরিবর্তন করা।’

ড. জান্নাতুল ফেরদৌস

প্রায় একই অভিমত জানালেন বরিশালের জেলা প্রশাসক কার্যলয়ের ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর দীপ্তি মণ্ডল দিতি। তিনি বলেন, ‘আসলে পোশাকে সঙ্গে কর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরাই না পোশাককে কর্মে রূপ দিয়েছি। কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনও ছিল। যেমন পুলিশ, আর্মি, রোড ও ভবন নির্মাণকর্মীদের বাস্তবিক প্রয়োজনেই পোশাকটা এমন দরকার ছিল। আমি অনেককেই দেখেছি সারাদিন তাদের জন্য পোশাকটা কম্ফোর্ট হয় না। কিন্তু ডিউটি টাইমও পরিবর্তন করতে পারেন না। নার্স ও ডাক্তারের জন্য যে পোশাক, এটারও প্রয়োজন আছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি বলছি কর্মের ভিত্তিতে পোশাকের কথা। এখন কর্মস্থলের বাইরে আমি পারিবারিক জীবনযাপন করি। এখানে আমার ব্যক্তিগত পোশাক পরি। কখনো টপস পরি, কখনো জিন্স, শার্ট পরি। অফিসিয়ালি কামিজ ও শাড়ি তুলে রাখি। কিন্তু সরকারি চাকরিগুলোতে পোশাক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পোশাকে আপনার সম্মান বাড়িয়ে তোলে। একটা মার্জিত ভাব তো যেকোনো পোশাকেই রাখা যায়। কিন্তু বিষয় হলো পাবলিক ডিল। পাবলিক ডিলিং যাদের সঙ্গে হয়, তারা অধিকাংশ রুট লেভেলের। আবার অশিক্ষিত। আবার অফিসারদের মধ্যেও কেউ কেউ বিব্রতবোধ করে। এজন্য কামিজ পরলেও লম্বা হাতার কামিজ অথবা শাড়ি পরি।’

এই সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন বলতে চাই, গবেষকদের সঙ্গে পোশাক সাচ্ছন্দ্যবোধ কিভাবে সৃষ্টি হয়। একজন গবেষক আমাদের যেকোনো সাধারণ মানুষের চেয়ে অধিক জানেন। তার বিশাল উদারতা নিয়েই দীর্ঘদিন একই কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখে একদিন গবেষণায় সাফল্য লাভ করে। এটা তার ব্যক্তিগত পেশা এবং নেশা। সেখানে ছোট পোশাক পরাই ভালো যদি তিনি রসায়নশাস্ত্র, পারমাণবিক শক্তি, পদার্থ নিয়ে গবেষণা করে তাহলে লম্বা পোশাক তার বিপদ ঘটতে পারে আপনি জানেন কি না?’ তিনি আরও বলেন, ‘গার্মেন্টসকর্মীদের শাড়ি পরা যায় না। বিশেষ করে চীনা, জাপানের, ইউএসএ তত্ত্বাবধানে যেসব প্রতিষ্ঠান চলে তাদের শাড়ি পরা একদমই নিষেধ অফিস টাইমে। আবার জুতা,কসমেটিক ও অন্য শোরুমগুলোতেও কিন্তু পোশাকের বিষয় আছে। পোশাকের মাপকাঠিতে মানুষ মাপা সম্ভব নয় সে পণ্য না বিজ্ঞানী। আমাদের বাংলাদেশে নারী বিজ্ঞানী দেখি না, তাহলে হয়তো জানা যেতো, তিনি কী বলেন? তবে অন্য দেশের বিজ্ঞানীরা তো ছোট পোশাক পরাই দেখি তাতে তাদের জ্ঞান আমাদের থেকে অনেক বেশি। যে মেয়ে বাইরে এসে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, বোরাকা পরে ও কিন্তু হোস্টেলে টিশার্টের সঙ্গে পাজামা পরে এটা আরও বিশ্রী এবং বিদেশি পোশাকের বিকৃতি। যারা লাইভে এসে মাথায় হিজাব দিয়ে বসে জামাকাপড় বিক্রি করে, তারা অনেক মানুষের বাজে কথা শুনে।’

দীপ্তি মণ্ডল দিতি বলেন, ‘গার্মেন্টসকর্মীরা পর্দা মেনে পোশাক বিক্রি করতে আসে। আসলে ওটা ওর মনের পোশাক নয়। অনলাইন ব্যবসায়ে মেয়েদের পোশাক নিয়ে মানুষ এত কমেন্ট করে শেষমেষ বোরকা পরে ব্যবসা বাঁচায়। আবার আপনি দেখবেন কতগুলো ক্যাপল জাপান, ইতালির তারা রান্না করে ভিডিও দেয় বেড়াতে যায় খুব মুসলিম মুসলিমভাবে প্রচার করে। ভিডিও ভিও বাড়ানোর জন্য আমরা তো দেখে বলি আহারে তারা কত বড় আল্লাহর নেক বান্দা। খ্রিষ্টান বিয়ে করে মুসলিম বানিয়ে আবার এটা প্রাকটিস করছে। মূলত উদ্দেশ্য শুধু বাংলাদের ভিউ বাড়ানো। বাস্তবে তারা ছোট্ট পোশাক পরেই ঘুরে বেড়ায়। আবার নিউইয়র্কে একটা মেয়েকে দেখি সে হিজাব ছাড়া লাইভে আসে না এটা আসলে ওই সময়ের জন্য মেকি।’ তিনি বলেন, ‘পোশাক দেশি-বিদেশি আমি সবই পরতে পছন্দ করি এটা সত্যি। একটা কমফোর্ট লাগার বিষয়। এই ঢাকায় এমন পরিবার আছে তারা বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে বসে ড্রিংকস করছে তাদের স্ত্রী মেয়েদের গাড়ি আছে, হেলিকপ্টার আছে কেউ টিচ করার নাগাল পায় না। মধ্যবিত্ত হয়ে একটু পোশাকের সাচ্ছন্দ্য বোধ করতে চাইবেন তাহলেই হলো বিপদ, কারণ সবাই আপনার নাগাল পায়, খুবলে ধরার জন্যও আবার খাওয়ার জন্যও পায়। তাই মানসিক বিকৃতি কমাতে হবে। নতুবা সব দোষ নারীর ঘাড়ে দিয়ে যে যার মতো দিনযাপনে ব্যস্ত হবে।’

দীপ্তি মণ্ডল দিতি

‘নারীর ছোটো পোশাক তাকে বিজ্ঞানী নয়, বরং পণ্য বানায়’ স্লোগানটির তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কর্মকর্তা ফাহমিদা আলী। তিনি বলেন, ‘এমন একটা অগ্রহণযোগ্য প্রচারণায় ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন অবধারিতভাবেই এসে যায়। কোনো গবেষণার জন্য পোশাকের ধরন কিংবা তার আকার কি কোনোভাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে? না কি, সেটা বাধা হয়েও দাঁড়ায়? পোশাকের কাজ কী? শরীরকে তাপ ও অতিরিক্ত ঠাণ্ডা থেকে বাঁচিয়ে রাখা, ক্ষতিকর উপাদান থেকে মুক্ত রাখা, বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে নিরাপদ রাখা। বোধ করি, এই বিষয়টি মেনে নিতে কারও কোনো আপত্তি নেই।’

ফাহমিদা আলী বলেন, ‘যেকোনো গবেষণা ঠিকভাবে করার জন্য চাই একটা সুস্থ মস্তিষ্ক, আর সেটার সঠিক ব্যবহার। অসুস্থ মস্তিষ্ক নিশ্চয়ই কোনো ভাল কাজকে উপস্থাপন করতে পারে না। আর না সেটা গ্রহণযোগ্যতাও লাভ করে। গবেষণার জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট সময় এবং গবেষণা কাজের জন্য উপযোগী স্থান ও যন্ত্রপাতি। গবেষণায় নারীর ছোট বা বড় পোশাক, কোনোটারই কোনো কার্যকরী ভূমিকা নেই।’ তিনি বলেন, ‘একজন বিজ্ঞানী কী নিয়ে গবেষণা করবেন, সেটাই তার কাছে মুখ্য বিষয়। তিনি কোন ধরনের পোশাক পরবেন, কোন ধরনের পোশাক পরে গবেষণা করবেন, সেই পোশাকটা গবেষণার জন্য কতটা জরুরি। এগুলোর একটাও তার কাছে প্রাধান্য পায় না। ছোট আকারের পোশাক যদি নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে সেই একই দোষে পুরুষও দুষ্ট, যারা ছোটো পোশাকে নিজের আরাম, কিংবা স্বস্তি খোঁজেন, নিজেকে উপস্থাপন করেন বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্নভাবে। ’

পেশাজীবী নারীরা বলছেন, যেসব পুরুষ সাগর সৈকতে ছোট ছোট পোশাক পরে বিচরণ করেন, তারা কি নিজেকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করেন? নাকি, তাদের যৌনাঙ্গ উন্মুক্ত থাকে? একইভাবে যেসব নারী নিজেকে ছোট পোশাকে উপস্থাপন করেন, তারা কি কেউ নিজেদের যৌনাঙ্গকে উন্মুক্ত করে রাখেন? প্রত্যেকেই যার যার যৌনাঙ্গকে কোনো না কোনো পোশাক দিয়ে আবৃত করে রাখেন, তাই সে পুরুষ,বা নারী যে-ই হোন না কেন। যে কাজ কোনো পুরুষ করলে দোষী হিসেবে সাব্যস্ত হয় না, সেই একই কাজ কোনো নারী করলেই সেটা তার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কেন?

সচেতন মহলের প্রশ্ন, ক’জন বিজ্ঞানীর নাম বলতে পারবেন, যাদের সম্পর্কে আপনারা ব্যক্তিগতভাবে জানেন? তাদের জীবন বোধ, যাপন পদ্ধতি, কিংবা আচার সম্পর্কে এতটুকুও ধারণা আছে, আপনাদের কারও? পোশাক, মূলত ধর্মীয় অনুশাসন এবং নিজের দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে পরার চর্চা করার বিষয়। এটা একজন মানুষের কাজের ধরন, তার কর্ম পরিবেশ দ্বারাও নির্ধারিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।

পেশাজীবী নারীরা বলছেন, আমরা যেটা যেভাবে দেখতে অভ্যস্ত, তার বাইরে কি কোনো কিছু দেখি না? যারা প্রবাসী, কিংবা যারা বিভিন্ন প্রয়োজনে নিজের দেশের বাইরে যান, তারা কি এইসব ছোট ছোট পোশাকপরা নারীদের দেখে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেন? নেন না তো। তাহলে ওখানে যেটা আপনার জন্য আপনি জায়েজ ভাবছেন, সেটাকে নিজের দেশে হচ্ছে বলেই আপনার এত আপত্তি কিসের? তারা আরও বলছেন, যে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমাম, মুয়াজ্জিন, কিংবা শিক্ষাগুরুর হাতে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষানবিশ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তারা তো কেউ ছোট পোশাক পরে না, তাই না? তারা তাদের পুরো শরীর আবৃত করে রাখে। তবু এইসব সম্মানিত ব্যক্তি নিজেদের রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। নিজেদের যৌন ক্ষুধা চরিতার্থ করতে তখন তারা বয়স কিংবা লিঙ্গ কোনোটারই বিবেচনা করেন না। আপনি নিশ্চয়ই এখানে ছোট পোশাককে দায়ী করতে পারবেন না!

ফাহমিদা আলী

এই প্রসঙ্গে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, ‘মূল বিষয় হচ্ছে, আমাদের সব থেকে বড় এলার্জি এই নারী শব্দটিতেই। তাদের কোনো ভালো কাজকেই আমরা সমর্থন দিতে পারি না। আর মেনে নিলে তো আমাদের জাতই চলে যায় বলে, আমাদের বিশ্বাস। সেজন্যই, আমরা কিছুতেই এদের নিজেদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, কিংবা পণ্য ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারি না। আর ভাবতেও চাই না। আমরা, আমাদের মননে ভীষণ সংকীর্ণ। আমরা কাগুজে ডিগ্রিধারী হলেও, নিজেদের সুশিক্ষিত বলে দাবি করলেও, স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারি না। আমরা কোনো পরিবর্তনকে মানতে নারাজ। সেটার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে, সেটার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতেও চাই না।’ তিনি আরও বলেন, সব চেয়ে বড় আপত্তি, কোনো নারী ভালো কিছু করছে, সে সম্মানিত হচ্ছে; এগুলো তো আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। এগুলো মেনে নিতে হলে তো তাদের পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এটাই, আমাদের পৌরুষের সবচেয়ে বড় বাধা। সেই সব শিক্ষা পরিহার করতে হবে, যেগুলো আমাদেরকে একজন নারীর শারীরিক কাঠামোর জন্য তাকে শুধুই নারী বলে শেখায়। তাকে কিছুতেই একজন মানুষের মর্যাদা কিংবা সম্মান দিতে শেখায় না।’

ফাহমিদা আলী বলেন, ‘পোশাকের কাজ, নারী, পুরুষ, শিশু, বয়োঃবৃদ্ধ; সবার জন্যই একই। তাই এটা নিয়ে শুধু নারীর দিকে আঙুল তুলে নিজের পৌরুষ জাহির করার কিছু নেই। ’ তিনি বলেন, ‘নারী, পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একইসঙ্গে সব ভাল কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। পরিহার করতে হবে, অকল্যাণকর সবকিছু। তাহলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্র ও দেশ লাভবান হবে।’