Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

উমোজা, নির্মম ইতিহাস থেকে গড়ে ওঠা নারীদের গ্রাম

পুরো গ্রামজুড়ে কেবল নারীদের বাস। আফ্রিকা মহাদেশের কেনিয়ায় অবস্থিত এই উমোজা গ্রামে নেই কোনো পুরুষ। গ্রামের এই নারীরা নিজেরাই নিজেদের সব কাজ করছে ও জীবিকা নির্বাহ করছে। নারী পরিচালিত এই গ্রামে পুরুষদের প্রবেশ একদম নিষিদ্ধ। কোনো পুরুষের সহায়তা ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করছে এই গ্রামের নারীরা।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গত ৫০ বছরে ৮৫ টি রাজ্য রয়েছে যেখানে শীর্ষস্থানীয় কোনও নারী নেই। পৃথিবী বিশেষ করে উপমহাদেশে অধিকাংশ মানুষেরই চিন্তাভাবনা পুরুষ শাসিত। তারা মনে করেন নারীরা পুরুষের অধীন। আবার অনেকের চিন্তা হলো তারা কোনো নারীর পরিচালনায় থাকবেনা। এইসব চিন্তাকে যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে এই উমোজ গ্রাম। পুরো পৃথিবীর কাছে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই গ্রাম।

উমোজা শব্দের অর্থ হলো ‘একতা’। কয়েকজন নির্যাতিত নারীর একতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছিলো এই গ্রামটি। এই গ্রামের গোড়াপত্তনের পেছনে রয়েছে এক নির্মম ইতিহাস।

১৯৯০ সালে উমোজা গ্রামটি গড়ে ওঠে ১৫ ধর্ষণের শিকার নারীর উদ্যোগে। কেনিয়ার সাম্বরু নামক এক গ্রামের নারীরা ছিলো খুবই নির্যাতিত। সাম্বুরুর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মহিলাদের প্রায় নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতেন পুরুষেরা। কিছু সামাজিক কুপ্রথার জন্য তাদের যৌনাঙ্গহানি, অকথ্য নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। জোর করে নাবালিকাদের বিয়েও দিয়ে দেওয়া হত। একাধিক পুরুষের ধর্ষণের শিকারও হতেন তারা। অথচ তাদের কথা শোনার জন্য কেউ ছিল না। এমনকি স্বামীর ইচ্ছা হলে স্ত্রীকে হত্যাও করতে পারতেন। মহিলাদের পাশে দাঁড়ানোর ছিল না কেউ।

এর ওপর ১৯৯০ সালের দিকে এসব নারীরা ব্রিটিশ সৈন্য দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন। প্রায় ১,৪০০ সাম্বুরু নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। পরবর্তী কালে তাদের স্বামী এবং তাদের পরিবারের প্রতি সম্প্রদায়ের মানুষ অসম্মানজনক উক্তি করেছিল। তারপর এই নারীদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। ১৫ জন নির্যাতিতাকে নিয়ে এক অনাবাদি জমিতে বসতি স্থাপন করেন। মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরবর্তীকালে আশেপাশের এলাকা থেকেও সামাজিক ও পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হওয়া মহিলারা একে একে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। ২০১৫ সালে এই গ্রামে বসবাসকারী নারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭। আর এভাবেই গড়ে ওঠে উমোজা গ্রামটি।

বর্তমানে এই গ্রামে শিশুসহ ৪০০ জনের বসবাস। এখানে বসবাসরত নারীরা ৯৮ বছর বয়সী থেকে ৬ মাস বয়সী কিশোরী পর্যন্ত রয়েছে। এই গ্রামের প্রত্যেক নারীই স্বনির্ভর। মূলত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এই গ্রামের সকল সদস্য। এই গ্রামের নারীদের তৈরি গহনা বর্তমানে সারা বিশ্বেই বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তারা পুঁতি দিয়ে বিভিন্ন গয়না তৈরি করে থাকেন। যেগুলো পর্যটকরা ঘুরতে গিয়ে কিনে আনেন। এসব গয়না বিক্রি করে দিব্যি সংসার চালান উমোজার নারী। এ ছাড়াও কৃষি কাজ, পশু পালনসহ সন্তানদের দেখভাল সবই দু’হাতে সামলান উমোজার নারীরা। প্রতিটি নারী তাদের আয়ের ১০ শতাংশ বিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য, কর হিসাবে গ্রামে দান করে। প্রতি বছর দুজন করে প্রতিনিধি উমোজা গ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব পান।

উমোজা গ্রামে এই প্রত্যয়ী, স্বনির্ভর নারীদের দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসেন। এই পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশমূল্য বাবদ পাওয়া সামান্য অর্থও গ্রাম উন্নয়নের কাজেই ব্যয় করেন এই স্বনির্ভর নারীরা। ছোটদের পড়াশোনার দায়িত্ব থেকে সংসার চালানোর যাবতীয় ভার বয়ে চলেছেন গ্রামের নারীরাই।

উমোজার গ্রামের এই জনপ্রিয়তা পুরুষদের কাছে হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে থাকে । একাধিকবার তাদের গ্রামে আক্রমণ করে ঘর-বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। মামলা করে মহিলাদের দখলে থাকা ওই জমি ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা হয়। কিন্তু যত বেশি আঘাত তাদের উপর করা হয়েছে, ততটাই বুমেরাং হয়ে তা ফিরে এসেছে পুরুষদের উপর। এ খবর জানাজানি হওয়ার পর তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে রাষ্ট্রপুঞ্জ, কেনিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রক। আইনত ওই উমোজার জমি এখন মহিলাদের।

এক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন থাকতে পারে যে গ্রামে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ হলে মেয়েরা কীভাবে সন্তানধারণ করছেন ও সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। গ্রামে যেহেতু পুরুষের প্রবেশ নিষেধ তাই মেয়েরা অন্যগ্রামে গিয়ে পছন্দমতো পুরুষের সঙ্গে যৌনমিলন করেন। এভাবেই তারা গর্ভধারণ করেন এবং সন্তান জন্ম দেন। কেবল যৌনাকাঙ্ক্ষা ও সন্তান উৎপাদনের জন্য তারা পুরুষের সাথে এই শারীরিক সম্পর্ক করেন। তবে বাইরের কোনও অতিথির সঙ্গে যৌ’নমি’লন করতে পারবেন না মেয়েরা এমনও নিয়ম রয়েছে।

উমোজা গ্রামে মহিলারা সম্পূর্ণ স্বাধীনতায় ও সুখে বসবাস করেন। এখানে তাদের কোনও কাজের জন্য অনুমতি নিতে হয়না। ব্যতিক্রমী এই গ্রামটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।