Skip to content

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যা: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

গণমাধ্যমে চোখ রাখলেই এখন স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যার সংবাদ বেশি দেখা যায়। কিন্তু কথা হচ্ছে যে সম্পর্ক সবচেয়ে বিশ্বস্ত, নির্ভরতার হওয়ার কথা, সেখানে পুরুষ কেন তার সবচেয়ে আপনজনকে হত্যা করবে? অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বামীর হাতে স্ত্রীর হত্যা মূলত মানসিক বিকৃতি ও পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যের কারণেই ঘটছে। এই অপরাধ থেকে মুক্তি পেতে হলে নারীকে পর্দার আড়ালে, হিজাবের আড়ালে, বোরখার আড়ালে, চার দেওয়ালের মাঝে অবরুদ্ধ রেখে শোষণ করা যাবে না। না হয় ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

এই ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে ভুল তথ্য নয় বরং সঠিক তথ্য, সঠিক নির্দেশনা, জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি সমাজের কাছে ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ‘আত্মীয়-স্বজন-ভাই-বোন পরিবারগুলোকে জোর তাগিদ দিতে হবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার। ফলে একের নয় বরং প্রত্যেকের নিজ নিজ প্ল্যাটফর্ম থেকে সচেতন হওয়া এবং সচেতন করার মাধ্যমে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়িয়ে চলা সম্ভব।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন বা পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে, এটা আজকের নতুন কোনো ঘটনা নয়। এখন মিডিয়ার যুগ, বিশ্বায়নের যুগ। ফলে ঘটনাগুলো আমরা নিমিষেই জানতে পারছি। এটা যুগে যুগে ঘটে আসছে। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হয় পরিবারের বা স্বামীর মতের বাইরে গেলে। স্বামীর সঙ্গে স্ত্রী বা স্ত্রীর সঙ্গে স্বামী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। কিন্তু তারপরও সমাজে প্রতিনিয়ত এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেই চলেছে। এটা মানসিক বিকৃতির ফল।’

পরিবার থেকেই নারীকে শ্রদ্ধা-সম্মান-মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করার শিক্ষা দিতে হবে সন্তানদের। রাষ্ট্রের এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে। আর গণমাধ্যমগুলো তো আছেই। জাতিকে সচেতন করতে এই সেক্টরের মতো এত বড় প্ল্যাটফর্ম খুব কম।

দিলরুবা শরমিন আরও বলেন, ‘এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আমরা কাকে দায় দেবো? স্বামীকে? স্ত্রীকে? নাকি পরিবেশ পরিস্থিতিকে? তবে খুন একটি জঘন্যতম অপরাধ। কারণের কথা বলতে গেলে বলতে হবে, মানুষের অসহিষ্ণুতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর দিকে লক্ষ করা যায়, দেখবেন, সংবাদ বা নানারকম পোস্টের ঘরে কুরুচি, বিকৃত মন্তব্য। আক্রমণাত্মক মন্তব্য। যেমন কয়দিন আগেই সালমান রুশদির ওপর হামলা হলো। সেখানে কিছু মানুষের মধ্যে উল্লাস-বিকৃত কিছু পৈশাচিক আনন্দ মনে কাজ করেছে। এগুলো সবই কিন্তু এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নেপথ্য কারণ।’

বিচারকাজের সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, এখন অনেক নারীই বাইরে কাজ করে। সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ নারীকেই মূল্যায়ন করা হয় না। পরিবারের সদস্যদের এমনকি স্বামীকেও বলতে শোনা যায়, তুমি সারাদিন বাইরে ঘুরে আসলে কী এমন করো? এমনকি ছেলেমেয়েদেরও এই মানসিকতায় গড়ে তোলে পরিবারের অন্য সদস্যরা। কাজের লোক, আত্মীয়-স্বজনের সামনে যখন-তখন গালি দেয় কিছু পুরুষ। ফলে সংসারে একটা অশান্তির সৃষ্টি হয়। তারা বলছেন, এ ধরনের আচরণের প্রতিবাদ করতে গেলেই নারীটি আর আলোর মুখ দেখে না। বেশিদিন দেখতে পারে না। কিন্তু স্বামী হিসেবে কী দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করছে, এটা একবার ধাতর্ব্যের মধ্যেও আনে না। বা বাইরে সে কী করে, কার সঙ্গে ঘুরছে, কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে কখনো কথা বলার থাকে না। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে ঠিকই শুনতে হয়, সারাদিন তো বাইরে বাইরেই থাকো।

এই প্রসঙ্গে দিলরুবা শরমিন বলেন ‘এগুলোর প্রতিকার পাওয়ার জন্য প্রথমত পুরুষের নারীকে নিজের সম্পত্তি ভাবা বাদ দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হত্যা বা নির্যাতনের সঠিক বিচার বেশিরভাগ নারীই পায় না। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, সন্তানের কথা চিন্তা করে অনেক সময় অপরাধীর সাজা মওকুফ করা হয়। ফলে এদেশের পুরুষেরা সহসী হয়ে ওঠে। আইনের শাসন যতদিন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন না করা হবে, ততদিন এমন ঘটনা চলবে। কঠোর হস্তে দমন করতে হবে থানা-পুলিশ-প্রশাসনকে। এছাড়া পরিবার থেকেই নারীকে শ্রদ্ধা-সম্মান-মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করার শিক্ষা দিতে হবে সন্তানদের। রাষ্ট্রের এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে। আর গণমাধ্যমগুলো তো আছেই। জাতিকে সচেতন করতে এই সেক্টরের মতো এত বড় প্ল্যাটফর্ম খুব কম।’

আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হচ্ছে, যে মানুষটাকে বিশ্বাস করে বা যার হাত ধরে একজন নারী তার সব আপনজন ছেড়ে আসে, সেই অতি বিশ্বাসী, নির্ভরযোগ্য মানুষটিই যখন তাকে অবমূল্যায়ন করে বা তার খুনি রূপে আত্ম প্রকাশ করে, তখন মানবতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধার মতো শব্দগুলো খুব ফিকে শোনায়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও লেখক শেখ কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে সংবাদপত্রগুলোর শিরোনাম এবারের টিভি চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজে আমরা প্রায়ই দেখতে পাই স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতন,খুন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে এসব ঘটনা এখন খুব দ্রুত ভাইরাল হয়। আমরা এই ঘটনাগুলো নিয়ে হরহামেশাই অনেক তর্কে-বির্তকে জড়িয়ে যাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গরম করে ফেলি,মন্তব্যে ভাসিয়ে দেই,জাজমেন্টাল হয়ে যাই। কিন্তু এসব সহিংসতারমূলে আসল কারণগুলো সঠিকভাবে সবসময় খতিয়ে দেখতে পারি?’

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ এখন স্রোতে ভেসে যায়। দিন দিন মানুষ তথাকথিত শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু কয়জন সুশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত হতে পারছে? সামাজিক শিক্ষার পাশাপাশি এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে পারিবারিক শিক্ষা। মানুষ পরিবার থেকে কী শিখছে, সেই প্রশ্নও তুলছেন তারা। একইসঙ্গে বলছেন, একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন শুরু হয়েছে আরও অনেক আগে থেকেই। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের মূল্যায়ন,পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সম্মানের অভাব দিন দিন এ-ই ধরনের সহিংসতা বাড়াচ্ছে। মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হচ্ছে ঠিকই, বিশ্বায়নের এই যুগে দ্রুত নিজেকে তুলে ধরতে পারছে সবার সামনে। বিশ্ব দরবারে জায়গা হয়ে যাচ্ছে খুব সহজেই কিন্তু দূরত্ব বাড়ছে কাছের মানুষগুলোর কাছ থেকে।

বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী শেখ কানিজ ফাতেমা আরও বলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজের মস্তিষ্কে খুব সুক্ষভাবে নারীর প্রতি পুরুষের নিয়ন্ত্রণের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। জন্ম থেকেই নারী অধীনস্থ; এ আমাদের বদ্ধমূল ধারণা। নারী নিজেকে যতই শিক্ষায়,সংস্কৃতিতে,দক্ষতায় উন্নত করুক না কেন, তার পরিচয় সে নারী। তার সীমাবদ্ধতার চাবি থাকবে পুরুষের হাতে। তাই খুব সহজেই নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছে, খুন হচ্ছে। আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হচ্ছে, যে মানুষটাকে বিশ্বাস করে বা যার হাত ধরে একজন নারী তার সব আপনজন ছেড়ে আসে, সেই অতি বিশ্বাসী, নির্ভরযোগ্য মানুষটিই যখন তাকে অবমূল্যায়ন করে বা তার খুনি রূপে আত্ম প্রকাশ করে, তখন মানবতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধার মতো শব্দগুলো খুব ফিকে শোনায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক মূল্যবোধের উন্নতি, পারিবারিক সুশিক্ষা, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, উদার মানসিকতার সম্প্রসারণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা এসব সহিংসতা প্রতিরোধ করতে পারি।’

নিজের প্রতি সম্মানবোধ জাগ্রত করে দরকার হলে সমস্ত বন্ধন মুক্ত হয়ে একাই জীবনযাপন করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। নারীকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে পুরুষতন্ত্রের ফাঁদ আসলে কী?

স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যার জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে দায়ী করছেন লেখক-সাহিত্যিকরা। তারা বলছেন, যুগযুগ ধরেই নারী নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হয়ে আসছে। অতীতে সামাজিক কাঠামোই এমন ছিল যে সংসারে একাধিক সন্তানসন্ততি দ্বারা পরিবেষ্টিত একজন নারীর সংসারে অসংখ্য অসঙ্গতি থাকা স্বত্বেও, মুখ বুজে সমস্ত নিপীড়ন সহ্য করা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প পথ ছিল না। কিন্তু আধুনিক সমাজে একক পরিবারের বিস্তার ও সীমিত সংখ্যক সন্তান জন্ম দেওয়ার ফলে নারী আগের তুলনায় অধিক স্বাধীনতা ভোগ করতে শুরু করেছে। নারী শিক্ষার হার ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নারীর সংখ্যাও দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজে নারীর অবস্থান এবং ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই প্রসঙ্গে কবি-কথাসাহিত্যিক ফারহানা রহমান বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে পুরুষের আদিম পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। ফলে আধুনিক নারী ঠিক পূর্ববর্তী নারীদের মতো করে মুখ বুজে সমস্ত নিপীড়ন সহ্য করছেন না। প্রকৃতপক্ষে এতেই পুরুষের আঁতে ঘা লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুরুষের পক্ষে নারীর স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন অসহ্য। তাই তারা নারীর স্বাধীনতা ঠেকাতেই ক্রমাগত হিংস্র হয়ে উঠছে। যার ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুরুষ দিনদিন নারীকে ধর্মের দোহাই দিয়ে একদিকে যেমন পেছনের দিকে টেনে এনে শৃঙ্খলিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তেমনি তার নারীর প্রতি আধিপত্য বিস্তারের নৃশংসতম রূপ হচ্ছে খুন। আর একারণেই স্বামীর হাতে স্ত্রীর খুন হওয়ার ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

এই লেখক আরও বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, পুরুষের আক্রোশ থেকে নারীর মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাঁকে শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। একইসঙ্গে নিজের প্রতি সম্মানবোধ জাগ্রত করে দরকার হলে সমস্ত বন্ধন মুক্ত হয়ে একাই জীবনযাপন করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। নারীকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে পুরুষতন্ত্রের ফাঁদ আসলে কী? একইসঙ্গে প্রতিটি মাকে দায়িত্ব নিতে হবে, তার ছেলে সন্তানটিকে নারীবান্ধব মানুষে পরিণত করার। এছাড়া, সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে এই প্রবণতার গতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করি।’