Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

এইডসের বৈশ্বিক পরিস্থিতি

নতুন করে ২০২০ সালে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। ২০২০ সালে এইডস সংক্রান্ত রোগে ছয় লাখ ৮০ হাজার মানুষ এইডসসংক্রান্ত রোগে মারা গেছে। এইডস শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সাত কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে যার মধ্যে মারা গেছে তিন কোটি ৬০ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।

উম্মে সালমা সুলতানা

আশির দশকের শুরুর দিকে বিশ্বের মানুষ অবগত হয় এইচআইভি ভাইরাস তথা এইডসের সম্বন্ধে। তখনও পর্যন্ত এই রোগটি মানুষের কাছে আট-দশটা সাধারণ রোগের মতই ছিলো। কারণ- আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে লক্ষণ প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত তিন-চার বছর এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দশ বছর সময়ও লেগে যেত। ফলে মানুষ এইডসের ভয়াবহতা বুঝার আগেই দ্রুত এটি ছড়িয়ে পরে গোটা বিশ্বে। শুরুর পর্যায়ে সমগ্র আফ্রিকা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোগটি ছড়িয়ে যায়। আফ্রিকার দেশগুলোতে এই রোগে নেমে আসে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়। তারপর থেকেই এইডস জেন বিশ্বে মহামারি হিসেবে আধিপত্য গড়ে!

তখনকার সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে বৈশ্বিক জরুরি পরিস্থিতি জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো। রোগটি নিয়ে গবেষণা শুরুর এক দশকের মাঝেই বিশ্বব্যাপী রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় এক কোটিতে। আফ্রিকান দেশগুলোতে সরকার, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এইডসের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়। জন জীবনে নেমে আসে মানবিক বিপর্যয়। সে সময়ের বতসোয়ানার মর্মান্তিক উদাহরণ এখনো ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। সেখানে মানুষের গড় আয়ু নেমে আসে ত্রিশ বছরের নিচে! শুধু বতসোয়ানাই নয় পুরো আফ্রিকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই ব্যাধি। সময়ের সাথে সারা বিশ্বে রোগটি বিস্তার হয়; যার ফলাফল দাঁড়ায় ২০২১ সাল পর্যন্ত এইডস আক্রান্ত দুই কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার মানুষ। যারা বর্তমানে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি নিচ্ছে।

সর্বশেষ, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী তিন কোটি ৭০ লাখ ৭০ হাজার মানুষ এইডসের সঙ্গে বাস করছিল, নতুন করে ২০২০ সালে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে। ২০২০ সালে এইডস সংক্রান্ত রোগে ছয় লাখ ৮০ হাজার মানুষ এইডসসংক্রান্ত রোগে মারা গেছে। এইডস শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সাত কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে যার মধ্যে মারা গেছে তিন কোটি ৬০ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। এইডসের মহামারি থেকে মানুষকে বাঁচাতে তখনকার ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো জনমন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সারাদিন কাটতো ল্যাব এ। ১৯৮৭ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ অনুমোদন দেয় প্রথম ওষুধের, যেটি এইডস রোগীকে একদম ভালো করে না দিলেও তার বিস্তারকে ঠেকাতে কিছুটা সক্ষম ছিলো, এফডিএ এ ওষুধের নাম দেন ‘মনো-থেরাপি’।

এইডস ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার উঠেপড়ে লেগে যায়। তখন তিনটি এন্টি-রেট্রোভাইরাল ওষুধের সমন্বয় বা ‘ককটেল থেরাপি’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এইডস সংক্রান্ত মৃত্যুহার পঁচাত্তর শতাংশ কমিয়ে আনে। এ ওষুধ তথা থেরাপি আবিষ্কারের ফলে মানুষ স্বস্তিতে থাকে, নতুন সম্ভাবনার রেখা উন্মোচিত হয়। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, খরচ। বছরপ্রতি এ থেরাপির খরচ পনেরো থেকে বিশ হাজার ডলারের মতো। কিন্তু তাতেও সমস্যা মিটে না! বিশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বজুড়ে এইডসের সংক্রমণ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। অবস্থা বেগতিক হওয়ায় ফাইজার নতুন ‘ডাইফ্লুকান’ ওষুধ তৈরি করে। ব্যাপক চাহিদা থাকায় এর বিক্রিও বাড়ে, দামও চওড়া করে ফেলে; ফলে অনুন্নত দেশ সমূহের নাগরিকদের জন্য চিকিৎসা নেয়া দুরূহ হয়ে উঠে।

ওষুধ কোম্পানিগুলো চওড়া দামে ওষুধ বিক্রি আর প্যাটেন্ট-মুনাফা-জেনেরিক এই তিন চক্রের কবলে পরে আন্তর্জাতিক ওষুধের বাজারে তৈরি হয় দুষ্টচক্র। যার নির্মম শিকার হতে হয় দরিদ্র নিম্ন জনগোষ্ঠীকে,সুবিধার ফল ভোগে, উন্নত বিশ্বের নাগরিকরা। এ দুষ্ট চক্রে, একদিকে যেমন দাম চওড়া আরেকদিকে চাহিদার তুলনায় ওষুধ ছিল অপ্রতুল। নব্বইয়ের দশকে শেষের দিকে যখন এ দুষ্ট চক্রের ফলে অনুন্নত দেশে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে, তখন মানবিক বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে প্যাটেন্ট আইনের সংশোধন শুরু করে। কেউ কেউ ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি’ বা জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে কমদামে জেনেরিক ওষুধের আমদানি ও উৎপাদনে সক্রিয় হয়ে উঠে। উৎপাদনে বৈধতা পাওয়ার পর, বিভিন্ন দেশের ওষুধ কোম্পানি জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে থাকে। তখন কিছুটা বিপর্য কমে আসে এইডসে।

এইডসকে পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ব্রাজিল সরকার। তারা ব্যতিক্রমী কিছু উদ্যোগ নিয়েছে; যা পরবর্তীতে তাদের নাগরিকদের এইডসের ভয়াবহতা থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম করে। প্রাথমিক অবস্থা থাকতেই ব্রাজিলের গবেষকরা তার প্রতিকার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, গবেষণায় তাদের প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত সংক্রমণের হার বিবেচনা করে তারা বের করেছিলেন ন্যূনতম বারো লাখ ব্রাজিলিয়ান আক্রান্ত হতে পারে দুয়েক বছরের মাঝেই। তখন ব্রাজিল এইডস সংক্রমণ কমিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক প্যাটেন্ট কিংবা দাতা সংস্থার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি নিজেরাই এন্টি-রেট্রোভাইরাল উৎপাদন শুরু করে এবং সেই ওষুধ দেশের জন সাধারণের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করে। ফলাফল দাঁড়ায়, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে মৃত্যুহার অর্ধেকে নেমে আসে এবং এইডস-জনিত অন্য ইনফেকশনের হার ষাট শতাংশ কমে যায়।

২০০০ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে প্রথমবারের মতো এইডস বিষয়ে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর এইডস আক্রান্তের দুই তৃতীয়াংশ আফ্রিকা মহাদেশে বসবাস করা সকল শ্রেণি পেশান মানুষ কনফারেন্সে উপলক্ষে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরেন। ডাক্তার থেকে নার্স, সমাজকর্মী থেকে শিক্ষক, গবেষক সবাই যোগ দেন এ আন্দোলনে। তাদের পক্ষ থেকে দাবি উঠে, আফ্রিকার অর্থনৈতিক অবস্থা সূচনীয় হওয়ার কারণে তাদের পক্ষে দামী ওষুধ কেনা সম্ভব না। তাই মানবিক দিক চিন্তা করে, মানুষের জীবন বাঁচাতে তারা অন্তত জেন জেনেরিক ওষুধ আমদানি করাকে কঠিন না করে তুলে এবং প্যাটেন্টের আইনটিও জেন তাদের ক্ষেত্রে শিথিল করে। কিন্তু তখন কনফারেন্সের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই পরামর্শ মেনে নেয়নি।

পরবর্তীতে আবার অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য এইডসের ওষুধ সহজলভ্য করতে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরেকটি বৈঠক আয়োজন করে, যে মিটিংয়ে বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিদের ডাকা হয়। সে মিটিং-এ তৃতীয় বিশ্বের দেশের জন্য জেনেরিক ওষুধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, আফ্রিকান অঞ্চলের নেতারা। তারা প্রস্তাব দেন রোগীপ্রতি বার্ষিক ৮০০ মার্কিন ডলারে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বৃহৎ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো তার এই প্রস্তাবে মোটেই সাড়া দেয়নি। উল্টো ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেয়।

জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থা এইডসের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা ৯০-৯০-৯০ অর্থাৎ ৯০ শতাংশ আক্রান্তদের পরীক্ষার আওতায় আনা, শনাক্তদের ৯০ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং চিকিৎসাধীন ৯০ শতাংশ রোগীর ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে। পরীক্ষা যত বেশি হবে তত বেশি রোগী চিহ্নিত করা যাবে এবং ২০৩০ সালের ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করে দিলেও কার্যত পক্ষে কোনো মুখ্য ভূমিকা রাখছে না জাতিসংঘ।

এভাবে জাতিসংঘ আর উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর ওষুধ কোম্পানি সিন্ডিকেটে এইডস নিয়ন্ত্রণে ওষুধ নিয়ে খেলা করে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো আর ভোগে তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোর বাসিন্দারা। এইডস নিয়ন্ত্রণের জন্য, জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারে নাই। ফলে দিনের পর দিন, এইডসের বিস্তার তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অল্প বয়সে মারা যাচ্ছে লাখ-লাখ মানুষ। বিশ্বের দায়িত্বশীল নেতারা এখনি এইডসের নিয়ন্ত্রণে কার্যত ভূমিকা না রাখলে, অদূর ভবিষ্যতে এইডস বৈশ্বিক মহামারির আরো ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হবে।