Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে বিরল নারীবাদী কবি চন্দ্রাবতী

চন্দ্রাবতী বলে‘পিতা সম বাক্য ধর।
জন্মে না করিব বিয়া রইব আইবর ॥
শিবপূজা করি আমি শিবপদে মতি।
দুঃখিনীর কথা রাখ কর অনুমতি’॥
অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে।
‘শিবপূজা কর আর লেখ রামায়ণে’॥

 

ব্রজেন্দ্রকুমার দের মঞ্চনাটক 'কবি চন্দ্রাবতী' থেকে অনেকেই বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম নারী-কবির পরিচয় পেয়ে থাকবেন। এ নিয়ে অবশ্য নানা মতবিভেদ আছে। তবে বাংলাদেশের প্রথম নারী-কবি যে চন্দ্রাবতী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মধ্যযুগের জটিল সময়ে চন্দ্রাবতীর আবির্ভাব যতটা বিস্ময়কর, তাঁর জীবন নিয়ে রটে যাওয়া গল্প আরো আকর্ষণীয়। সেই গল্পই আজ বরং করা যাক:

 

কিশোরগঞ্জ জেলার পাতুয়ারী গ্রামে দ্বিজ বংশীদাসের ঘরে চন্দ্রাবতীর জন্ম ষোড়শ শতাব্দীতে। তার আগে উঁচু মাপের কোনো নারী কবির জন্ম হয়নি। অবশ্য চন্দ্রাবতীর প্রতিভা নিয়ে সংশয় প্রকাশের কোনো উপায় নেই। বাবা দ্বিজ বংশীদাস নিজেও মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি। লিখেছেন 'পদ্মপুরাণ' এবং 'মনসামঙ্গল'-এর মতো সাহিত্যকর্ম। পূর্ববঙ্গে পাওয়া বিস্তর মনসামঙ্গলের মধ্যে তার কাব্যই সর্বশ্রেষ্ঠ। এ-ছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রেই বাবার কবিত্ব চন্দ্রাবতী পেয়েছিলেন। বাবার মতো তাঁর ভাষাতেও বিন্দুমাত্র গ্রাম্যতা ছিল না। অথচ পূর্ব বাংলার বৃষ্টিভেজা উর্বর ভূমির সাথে তাঁর কবিতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এমনকি অনেকে মনে করেন, মনসামঙ্গল লেখার সময় চন্দ্রাবতী বাবাকে সাহায্য করেছিলেন। বাড়ির সামনে ফুলেশ্বরীর স্বচ্ছ জল এবং পূর্ব শ্যামল নিসর্গের ছোঁয়ায় চন্দ্রাবতীর কবিমনের সাথে তার রূপেরও প্রশংসা ছড়াতে শুরু করে। পরমা সুন্দরী এই নারী-কবি অত্যন্ত স্পর্শকাতর রোমান্টিক মনের অধিকারী ছিলেন। সেই স্পর্শকাতর মনের সংযোগেই কিনা বাংলা সাহিত্যে এক ট্র্যাজিক গল্পের জন্ম দিয়েছিলেন চন্দ্রাবতী। 

 

 

সম্ভবত, বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম নারীবাদী দৃষ্টিকোণ রপ্ত করেছিলেন চন্দ্রাবতী। বাবার পরামর্শে তিনি রামায়ণ লেখা শুরু করেন বাংলায়। এই রামায়ণে সীতাই ছিল, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সীতার সাথে হয়ে ওঠা অবিচার ও সীতার মর্মবেদনা অত্যন্ত দরদের সাথে তুলে ধরেন তিনি। সেই রামায়ণের সংস্করণটি এখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সযত্নে সংরক্ষিত আছে। সম্ভবত প্রেম- বিরহের পাশাপাশি সর্বপ্রথম বৈষম্য এবং অবিচারকেও নিজের লেখার অনুষঙ্গ করে তোলেন চন্দ্রাবতী। এখনো অসংখ্য পালাগানে চন্দ্রাবতীর গান শুনতে পাওয়া যায়। তবে তাঁর জীবনের গল্পটি ট্র্যাজিক।

 

দ্বিজ বংশীদাসের লেখা পড়লে চন্দ্রাবতী ও জয়ানন্দের ছোট ছোট অনেক রচনা খুঁজে পাওয়া যাবে। জয়ানন্দের ছোটবেলার খেলার সাথি চন্দ্রাবতী। দুজনই কবিতা লিখতেন। চন্দ্রাবতী বাবার দেখাদেখি সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। গানের গলাও চন্দ্রাবতীর বেশ ভালো ছিল। একে তো পরমা সুন্দরী, ভালো লিখেন এবং গানের গলাও ভালো। এত সব গুণ থাকায় অনেকেই চন্দ্রাবতীর পাণিপ্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রাবতী মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছেন জয়ানন্দকে। সব সময় একই সাথে থাকায় দুজনের পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়ে উঠছিল। একে অপরকে কবিতা লিখে মনের ভাব প্রকাশে কোনো কার্পণ্য ছিল না। কৈশোর পার হতেই দুজনের পরিবার বিয়ের আলোচনা করতে শুরু করে। বিয়ের সময়ও নির্ধারিত হয়। চন্দ্রাবতী এক সুখী সুন্দর জীবনের সম্ভাবনায় নিশ্চিন্ত, কিন্তু জয়ানন্দের ঠিক থিঁতু হওয়ার ধাত ছিল না। চারপাশে নিজেকে মেলে দিতে পারতেই যেন তিনি খুশি।

 

এমন সময় গ্রামের আরেক সুন্দরী আসমানিকে দেখে জয়ানন্দ প্রেমে পড়ে যান। আসমানি জাতে মুসলমান। এমন প্রেম সমাজ মেনে নেবে না। আসমানি আগেও চন্দ্রাবতী আর জয়ানন্দের সম্পর্কের কথা জানত, এর পরও সে তার বাবাকে দৃঢ়চিত্তে জয়ানন্দকে বিয়ের ইচ্ছার কথা বলে। পরিবার রাজি। তবে জয়ানন্দকেও মুসলমান হতে হবে। আসমানির প্রেমে মুগ্ধ জয়ানন্দ এই শর্তে রাজি হয়ে যান।

 

 

এ-দিকে, ওই একই দিন চন্দ্রাবতী বিয়ের সাজে বরের অপেক্ষায়। চারপাশে আনন্দের উৎসব থামতেই চন্দ্রাবতী কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। শোনা গেলো, জয়ানন্দ আসমানিকে বিয়ে করেছেন ধর্মান্তরিত হয়ে। কিন্তু সে কী করে হয়! এ-কথা চন্দ্রাবতী মোটেও বিশ্বাস করতে পারেন না। কিন্তু সত্যকে কি অস্বীকার করা যায়? এহেন অপমানে সর্বপ্রথম চন্দ্রাবতী আত্মসম্মানবোধ ফিরে পান। জয়ানন্দের প্রতি ভালোবাসা মুহূর্তেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এক কোমল হৃদয় বিধ্বস্ত হয়ে এক সম্ভাবনাময় জীবনের আকাঙ্ক্ষা সেখানেই সমাধিস্থ হয়। এবার বাবার কাছে তাঁর প্রার্থনা, ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি শিব মন্দির যেন তাঁকে গড়ে দেওয়া হয়। এখানেই চন্দ্রাবতী চিরকুমারী থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

 

শিবপূজা এবং রামায়ণ লেখাতেই তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ। কৈশোর থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রবল অনুরাগ। সম্ভবত, সাহিত্যেই বিরহবিধুর জীবনে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেয়েছিলেন চন্দ্রাবতী। এ-দিকে, জয়ানন্দের যেন আবার মনে হলো, আসমানিকে নয়, বরং চন্দ্রাবতীকেই তিনি ভালোবাসেন। আবার কবিতা লেখা এবং কবিতা একে অপরকে শোনানোর আনন্দ ফিরে পেতে হবে। একদিন সন্ধ্যায় জয়ানন্দের অনুপস্থিতি এক বিচ্ছেদের জন্ম দেয়। আরেক সন্ধ্যায় জয়ানন্দ সেই শিবমন্দিরের খোঁজ করে চন্দ্রাবতীর কাছে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করেন। কিন্তু মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকায় এবং একাগ্রমনে ধ্যান করায় জয়ানন্দের কোনো আকুতিই তাঁর কানে যায়নি। অবশেষে ব্যর্থ জয়ানন্দকে ফিরতে হলো। কিন্তু ফেরার আগে সন্ধ্যামালতীফুলের রস নিংড়ে মন্দিরের প্রধান ফটকে একটি ছোট কবিতা লিখে যান:

 

'শৈশব কালের সঙ্গী তুমি যৌবনকালের সাথি।
অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী’॥

কবিতা দেখেও চন্দ্রাবতী অনড়। অভিমান এবং অপমানে জর্জরিত চন্দ্রাবতী ক্ষমা করেননি জয়ানন্দকে। জয়ানন্দ ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অবশ্য এই গল্প নিয়ে ভিন্নমত আছে অনেক। জয়ানন্দের মৃত্যু চন্দ্রাবতীর মনে ব্যাপক আঘাত দেয়। কেউ বলেন, তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ হয়, আবার কেউ বলেন শিবদর্শনের কিছু দিন পরেই হৃদরোগে তাঁর মৃত্যু হয়। 

 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন বেদনার ঘটনা বেশ বিরল। এমন বেদনার জীবন স্বত্বেও আত্ম-বিস্মৃত যে রস তিনি কবিতায় সঞ্চার করেছেন, তা উঁচু দরের কবির পক্ষেই সম্ভব। 

 

 

এমনকি দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর রামায়ণের সাথে মেঘনাদবধ কাব্যের আশ্চর্য মিল খুঁজে পেয়েছেন। অনেকের ধারণা মাইকেল মধুসূদন নিজেও এই কবিতা পড়ে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। সমগ্র বিশ্বেই চন্দ্রাবতী এখন পরিচিত। পৃথিবীর একুশটি ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়ে গবেষণা হচ্ছে। এমনকি ফুলেশ্বরী নদীর ধারে এখনো তাঁর শিবমন্দির আছে। এই মন্দিরকে 'চন্দ্রাবতীর মন্দির' বলে অভিহিত করা হয়। এমনকি এই বিরল কবিকে শ্রদ্ধা করে মেলাও আয়োজন করা হয় সেখানে।

 

চন্দ্রাবতী এক বিরল প্রতিভা। বিশেষত, মধ্যযুগে তাঁর নারীবাদী দৃষ্টিকোণ আধুনিক অনেক কবিকেও হার মানায়। বিশেষত, ট্র্যাজিক জীবনের মাঝেও নিজের ব্যক্তিত্ব এবং আত্মসম্মানবোধ অটুট রাখায় তাঁর উপহার বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে।