Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আটলান্টিকের মেঘ চিরে ছুটে যাওয়া প্রথম নারী অ্যামেলিয়া 

সফলতা এবং ট্রাজেডি পাশাপাশি জুড়ে আছে এমন ঘটনা নজিরবিহীন কিছু না। অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের গল্প যেন তেমনই কিছু। বিশ শতকের ইতিহাস ঘাটলে লক্ষ্য করা যাবে উদ্যমী নারীদের। যারা কিনা প্রথমবারের মতো পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের দুঃসাহস দেখাতে পিছপা হতেন না। অবশ্য বিংশ শতাব্দীর দুটো ভয়ংকর যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক মন্দায় নারীদেরকেও নামতে হয়েছে পথে, শিল্প-কারখানায়। কিন্তু সম্মান কিংবা নিজেদের অস্তিত্বের পরিচায়কের জায়গাগুলিতে তখনো নারীরা যেন অবহেলিত। আর ঠিক তখনই অ্যামেলিয়া এয়ারহার্ট আটলান্টিকের উপর একা বিমান চালিয়ে দেখান। আকাশপথেও নারীদের পদচারণার সূচনা হয় এই অ্যামেলিয়া হার্টের মাধ্যমেই। তাঁর এডভেঞ্চারের এই সূচনা সফলতার কথাই জানায়। কিন্তু এই তিনি বিমান চালানোর সময় অন্তর্হিত হয়ে যান যা কিনা এখনো এক রহস্য। সেই গল্পই আজ বলবো। 

 

অ্যামেলিয়া মেরি ইয়ারহার্ট ১৮৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাসে অবস্থিত আচিসনে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পেশায় রেলপথ বিষয়ক আইনজীবী এবং মা এক ধনাঢ্য পরিবারের কন্যা। বাবা মায়ের প্রশ্রয়েই অ্যামেলিয়া শৈশব থেকেই দুরন্ত। এই দুরন্তপনার সাথে স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং দুঃসাহসী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতা হয়তো দূরাগত যে কারো জন্যেই কিছুটা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু এই দুঃশ্চিন্তাকেই অ্যামেলিয়া একদিন বিস্ময়ে রূপান্তর করবে।

 

যাহোক, ১৯১৫ সাল পর্যন্ত অ্যামেলিয়া শিকাগোর হাইড পার্ক স্কুলেই তাঁর হাই স্কুলের পাঠ শেষ করেন। তারপর মা পৈতৃক সম্পত্তি পেলে তাকে পেনসিলভেনিয়ায় ওগলস স্কুলে ভর্তি করানো হয়। স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষেই লেখাপড়া ছেড়ে কানাডার এক সামরিক হাসপাতালে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। সেখানেই তিনি নার্সিং-এর উপর পড়ালেখা শেষ করেন। কানাডা থেকে ফিরেই বোস্টনের ডেনিসন হাউজ নামক সেটলমেন্টের সাথে তিনি জড়িয়ে যান। মূলত বিশ শতকের সেটলমেন্ট মুভমেন্ট আন্দোলনের সাথে এই সংস্থাটি জড়িত ছিলো।

 

তবে ইয়ারহার্টের বিমানের প্রতি ভালোবাসার গল্পটা একটু ভিন্ন। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি প্রথম বিমান দেখেন। সেবার কাঠ ও তারের এই জঞ্জাল তার মনে একটুও দাগ কাটেনি। ঠিক আরো দশ বছর পরেই তিনি তাঁর আশৈশব লালিত এই ভাবনাকে চিরতরে বিদায় জানাবেন। হয়ে উঠবেন জগদ্বিখ্যাত এক বৈমানিক। সেই গল্পই বলছি। 

 

১৯২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর, অ্যামেলিয়া জীবনে প্রথমবার বিমানে আরোহণ করেন। এর আগে তিনি নিজ চোখে বিমান দেখেছিলেন। বিমানের পাইলটের আসনে ফ্রাঙ্ক হকস। এই ফ্লাইট থেকেই ইয়ারহার্ট বিমান চালানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। এতদিন ধরে বিক্ষিপ্তভাবে ছুটে বেড়ানো ইয়ারহার্ট ভাবেন তিনি নিজেই বিমান চালাবেন। তাতে যেখানে খুশি সেখানেই উড়ে যাবেন। পরের বছর জানুয়ারিতে তিনি বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন পুরো ছয় মাস তিনি টাকা জমাতে শুরু করেন। নিজের জমানো টাকায় এয়ারস্টারের দুই আসনের একটি পুরাতন বিমান কিনে ফেলেন। হলদে রঙের ওই বিমানটির নাম দেন 'দ্য ক্যানারি'। আমেরিকান ক্যানারি পাখি যারা দেখেছেন তারা হয়তো বুঝতে পারবেন। এই হলদে ক্যানারি দিয়েই তিনি প্রথম নারী বৈমানিক হিসেবে এক লক্ষ চল্লিশ ফুট উপরে বিমান চালানোর রেকর্ড গড়ে ইতিহাসের পাতাই ঠাঁই করে নেন।

 

যে সময়ের কথা বলছি সে সময় নারীরা কর্মক্ষেত্রে চলে এলেও কর্তৃত্ববাদী পুরুষদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেনি। এমন সময় ঠিক হলদে ক্যানারি পাখির মতোই ইয়ারহার্ট মেঘ ভেঙে আকাশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। অ্যামেলিয়া তখন এক বাণীতেই বলেছিলেন, "পুরুষরা যা করে মেয়েদেরও সেগুলো করে দেখা উচিত। কেউ যদি তার কাজে ব্যর্থ হয় তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের কোনো মেয়ের কাছে তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।" এভাবেই অ্যামিলিয়া ইয়ারহার্ট নারীদের দুঃসাহসিকতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ না। ১৯২৮ সালের এপ্রিলে এক অজ্ঞাতনামা নাম্বার থেকে ইয়ারহার্টকে ফোন করা হয়। ইয়ারহার্টকে অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হয়, "আপনি কি প্রথম নারী বৈমানিক হিসেবে আটলান্টিক পাড়ি দিতে চান?" ইয়ারহার্ট প্রথমে একে স্রেফ রসিকতা ভেবেছিলেন। কিন্তু যখন টেলিফোনের অপরপ্রান্ত থেকে লেখক ও প্রকাশন জর্জ পালমার পুটনাম তাঁর পরিচয় জানান, ইয়ারহার্ট বুঝলেন তাঁর সাথে রসিকতা করা হচ্ছেনা।  

 

তিনি পুটনামের প্রস্তাবে সায় জানান এবং নিউ ইয়র্কে তাঁর সাথে দেখা করেন। সেখানেই ইয়ারহার্টকে তার সঙ্গী বৈমানিক উইলমার বিল স্টালজ ও মেকানিক লুইস গর্ডনের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হয়। ১৯২৮ সালের ১৭ জুন, নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের ট্রিপসি হার্বার থেকে ফয়ার এফ সেভেন মডেলের ফ্রেন্ডশীপ বিমান নিয়ে তিনজন যাত্রা শুরু করেন। এই যাত্রা নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা আতঙ্ক। একই বছর তিনজনের একটি দল এমন যাত্রা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু ২১ ঘণ্টার যাত্রা শেষে তারা ওয়েলসের বুরি পোর্টে অবতরণ করতেই সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনামে ঠাই করে নেন। সারা বিশ্বেই অ্যামেলিয়ার নামে প্রশংসা। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেলভিন কুলিজ এই দলটিকে হোয়াইট হাউজে অভ্যর্থনা জানান। এখান থেকেই ইয়ারহার্টের রেকর্ডের শুরু। 

 

১৯৩১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পুটনাম এবং ইয়ারহার্ট বিয়ের পিড়িতে বসেন। অবশ্য দুজনের কাছেই বিয়ে ছিলো একটি অংশীদ্বারিত্বের বিষয়। স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলেই একটি দুঃসাহসিক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। এই অভিযানে ইয়ারহার্ট একা সম্পূর্ণ আটলান্টিক পাড়ি দিবে, ১৯৩২ সালের ২০ মে, তিনি একাকী নিউ ফাউন্ডল্যান্ড থেকে প্যারিসের পথে রওয়ানা হন। কিন্তু উত্তরের আবহাওয়া ও যান্ত্রিক গোলযোগের জন্যে আয়ারল্যান্ডের এক চারণভূমিতে তাকে অবতরণ করতে হয়। এমন এক দুঃসাহসিকতার জন্যে প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার তাকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির পক্ষ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করেন। এমনকি কংগ্রেস থেকেও তাকে সম্মাননা দেয়া হয়।

 

এর পরের বছর অ্যামেলিয়া আরো কিছু রেকর্ডে ব্যস্ত। ১৮,৪১৫ ফিট উঁচুতে বিমান চালিয়ে এক অনন্য নজির গড়েন তিনি। আবার ১৯৩৫ সালের ১১ জানুরাই, একেক ব্যক্তি হিসেবে আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি। নিজের রেকর্ডগুলো ভাঙতে ভাঙতে তিনি যেন পৃথিবীর আকাশপথকে নিজের দখলেই আনতে চাচ্ছিলেন। ভাবছিলেন বিষুবরেখা বরাবর পৃথিবীর চারপাশ ঘুরে বেড়াবেন। দুর্ভাগ্যবশত এই অভিযান শুরু করলেও তার সমাপ্তি আজও আমাদের অজানা। কি ঘটেছিলো অ্যামেলিয়ার ভাগ্যে আমরা জানিনা। তবে ঘটনাটি একটু দেখে নেয়া যায়।

 

অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের অন্তর্ধান

 

১৯৩৭ সালে অ্যামেলিয়া বিষুবরেখা বরাবর পৃথিবী ঘোরার পরিকল্পনা নেন। পূর্বদিকগামী তার যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য উনত্রিশ হাজার মাইল। লকহিড ইলেক্ট্রো টেন ই বিমান নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেন। সঙ্গী নাবিক ফ্রেড নুনান। সেবার অবশ্য ইয়ারহার্টের প্রথমবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় যান্ত্রিক গোলযোগের দরুণ। বিমান ঠিক করে তিনি ২১ মে বন্ধু নাবিক নুনানকে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ড থেকে। 

 

৪০ দিনে তিনি মোট ২০ জায়গায় যাত্রা বিরতি নেন। এই সময়ে তারা বাইশ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন। তারা অবশেষে পাপুয়া নিউগিনির পূর্ব উপকূলবর্তী লায়ে নামক স্থানে পৌঁছান। এখান থেকে ২৫০০ মাইল দূরে মধ্য প্রশান্ত সাগরে অবস্থিত হাউল্যান্ড প্রবালদ্বীপ তাদের গন্তব্য। এই দ্বীপেই ইয়ারহার্ট ও নুনান যাত্রাবিরতি দিয়ে বিমানের জ্বালানি ও মেরামত করে নিবেন। ইটাসকা নামক এক জাহাজের দেখানো পথ অনুসরণ করেই তারা এগিয়ে চলেছেন।

 

কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলো। ইয়ারহার্ট এবং নুনান বেশ কবার সিগন্যাল পাঠিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর জাহাজের রেডিও সিগন্যাল অপারেটর বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, বিমানের হদিস নেই। অপারেটর একের পর এক সিগন্যাল বিমানে পাঠালেও তা ইয়ারহার্ট বা নুনানের কাছে পৌছায় নি। হাউল্যান্ড দ্বীপে তারা কখনই পৌঁছায়নি। অনেকে ধারণা করেন তারা হয়তো জাহাজের সাথে সিগন্যাল রাখতে না পেরে ভুলপথে চলে যান। পরবর্তীতে বিমানের জ্বালানী শেষ হয়ে যাওয়ায় বিমানটি প্রশান্ত ময়াসাগরে বিধ্বস্ত হয়। 

 

ইয়ারহার্ট এবং নুনানের নিখোঁজ নিয়ে অনেক ধরণের তত্ত্ব আছে। সঠিকটি কেউ জানেনা। তবে সমগ্র বিশ্বেই ইয়ারহার্ট এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন যা এখনো অনেকেরই মনে কৌতূহল জাগায়। যেদিন তাঁর বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যাবে। সেদিনই হয়তো রহস্যের মীমাংসা হবে।

 

 

অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট যেন আকাশের মেঘ ভেঙে নারীদের এক সরল বার্তা দিতে চাচ্ছিলেন। তবে এসব একদমই মনগড়া নয়। নারীদের উদ্দেশ্যে তাঁর একটি বার্তা এখনো অনেককে উৎসাহ জুগিয়ে বেড়ায়, "যে নারী নিজের পেশা গড়ে নিতে পারবে, খ্যাতি ও সম্পদ তার করায়ত্ত হবেই।" এক নতুন উদ্দীপনাই যেন তিনি জুগিয়ে গিয়েছেন নারীদের। যা কিনা সত্যিই পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্যে শুধু চ্যালেঞ্জ হয়েই দাঁড়াবে, সীমাবদ্ধতা নয়।