Skip to content

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে আকাশেই হারিয়েছিলেন এই নারী

কল্পনা চাওলা, ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম নারী মহাকাশচারী। ছোটবেলা থেকেই  তাঁর স্বপ্ন ছিলো আকাশ ছোঁয়ার। ছোটবেলায় হাতে পেনসিল নিয়ে তিনি বসে যেতেন বিমান আকার প্রচেষ্টায়। ইচ্ছে ছিলো আকাশ ছোঁয়ার। ইচ্ছে পূরণও হয়েছিলো তাঁর, কিন্তু আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিশাল আকাশের মধ্যেই হারিয়েছেন জীবন। 

 

কল্পনা চাওলার জন্ম ১৯৬২ সালের ১৭ই মার্চে ভারতের পাঞ্জাবে। জন্মদিন কাগজে-কলমে পরিবর্তন করে ১ জুলাই, ১৯৬১ করা হয় যাতে তিনি মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোটো। তৎকালীন ভারতীয় সমাজে নারীদের অবস্থান বর্তমান সময়ের ন্যায় চোখে পরার মতো ছিলোনা। তখনকার সময়ে একজন নারীর মহাকাশচারী হতে চাওয়ার ইচ্ছে সমাজ একধরনের অন্যায়ের চোখেই দেখতো বলা চলে৷ 

 

তবে কল্পনা চাওলা শুরু থেকেই তাঁর পরিবারের সাপোর্ট পেয়ে এসেছেন। কখনো বাবার হাত ধরে বিমান দেখতে স্থানীয় ফ্লাইং ক্লাবে যাওয়া আবার কখনো মা বোনের থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা। এভাবেই ধীরে ধীরে তাঁর স্বপ্নের পথে এগোতে থাকেন কল্পনা চাওলা। তাঁর বয়সী অন্যসব মেয়েদের থেকে তিনি ছিলেন অনেকটাই ভিন্ন, তাঁর চিন্তাধারায় ছিলো বিশাল এক ভিন্নতা। কল্পনা ছেলেদের মতো চুলের কাট দিতেন। সাথের অন্য মেয়েরা নাচ, গান পছন্দ করলেও তিনি সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টন, দৌড় ভালোবাসতেন। 

 

১৯৭৮ সালে দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেন তিনি। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার প্রবল ইচ্ছে থেকেই তিনি আশা প্রকাশ করেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। তবে তাঁর বাবা তখনকার সমাজে মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে খুব একটা ভালো ভবিষ্যৎ নেই ভেবেই মেয়েকে ডাক্তারি পড়ার পরামর্শ দেন। তবে কল্পনা ছিলো জেদি এবং আত্মবিশ্বাসী একজন নারী। আর সাথে ছিলো তাঁর মায়ের অনুপ্রেরণা। কল্পনা চণ্ডীগড়ের পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনিই ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে একমাত্র মেয়ে।

এরপর ১৯৮২ সালে কল্পনা চাওলা পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। তিনি তাঁর ব্যাচে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন এবং তাঁর কলেজ থেকে তিনিই প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হিসেবে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হোন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স করার সুযোগ পান কল্পনা। কিন্তু এক্ষেত্রেও তাঁকে টপকাতে হয় বহু বাঁধা। তখনকার সময় একা একটি মেয়ে দেশের বাইরে পড়াশোনার জন্য যাওয়া ছিলো একদমই অস্বাভাবিক একটি বিষয়। 

 

কয়েকমাস দেরী করে হলেও সকল বাঁধা টপকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান তিনি। ১৯৮৪ সালে তিনি টেক্সাস ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর ১৯৮৬ সালে ইউনিভার্সিটি অভ কলোরাডো বোল্ডার থেকে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর তাঁর দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। ১৯৮৮ সালে শেষ করেন তাঁর ডক্টরাল স্টাডিজ, যার মাধ্যমে তিনি পিএইচডি ডিগ্রী পান।

 

১৯৯৬ সালে কল্পনা কলম্বিয়া মিশনে মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে রোবটিক আর্ম অপারেটরের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। যা ছিলো তাঁর জীবনের প্রথম মহাকাশ ভ্রমণ। এই মিশন ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করে ১৫ দিন মহাকাশে অবস্থান করে ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে পৃথিবীতে ফিরে আসে। 

 


 

২০০৩ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি স্পেস শাটলটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে। কিন্তু এই অভিযানের অভিযাত্রীরা কেউ আর জীবিত পৃথিবীর মাটিতে অবতরণ করতে পারেননি। কেনেডি স্পেস সেন্টারে অবতরণের ১৬ মিনিট আগেই স্পেস ক্রাফটটি টেক্সাসের আকাশে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিস্ফোরিত হয়। এতে মিশনের সাত অভিযাত্রী মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। কল্পনাও সেই অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন। সেটিই তার জীবনের শেষ মহাকাশ যাত্রায় পরিণত হয়।

 

কল্পনার ইচ্ছে ছিলো আরো অনেক গবেষণা করার, আরো অনেক মহাকাশ ভ্রমণের৷ তবে খুব অল্প সময়ে থেমে গিয়েছিলো তাঁর জীবন। তাঁর আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে ভারত তাদের প্রথম মেটোরোলজিকাল স্যাটেলাইট এর নাম ‘কল্পনা-১’ রাখে।কল্পনা তাঁর অবদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল স্পেস মেডেলের সম্মানে ভূষিত হন। 

 

 

তাছাড়াও নাসা স্পেস মেডেল, নাসা ডিস্টিঙ্গুইশড সার্ভিস মেডেলের সম্মানেও ভূষিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর কল্পনার স্মৃতিতে মঙ্গল গ্রহের কলম্বিয়া হিল চেইনের একটি চূড়াকে কল্পনা হিল নাম দেওয়া হয়। মাঝ আকাশে তার জীবন থেমে গেলেও তাঁর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়নি। আজও বিশ্ববাসী স্মরণ করেন দৃড়প্রতিজ্ঞ, আত্মবিশ্বাসী এই নারীকে। মহাকাশচারীদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম কল্পনা চাওলা।