Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারী-বিদ্বেষ সমাজের একটি প্রচলিত অসুখ

অনেক সময়ই দেখা যায়, নারী এবং পুরুষ পরস্পরের সাথে অনেক সামাজিক বা ব্যক্তিগত বিষয়ে একমত হতে পারছে না। নিজের মতবাদ, লাইফ-স্টাইল এবং একই বিষয়ে ভিন্ন মতবাদ প্রকাশ করছে লিঙ্গ-বিশেষে মানুষ। এই ভিন্ন মতামত একটি খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কারণ দুজনের বেড়ে ওঠা সমান না। পরিবেশ সমান না। এই সমাজ তাদের সাথে একই রকম আচরণ করে তাদেরকে বড় করে তোলেনি। তাই সমাজের নানা রকম বিষয়ে নারী পুরুষের মতামতের ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু এই ভিন্নতা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। যখন মেনে নিতে না পেরে একটা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তখন একে অন্যকে নারী-বিদ্বেষী এবং পুরুষ-বিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দেয়। 

কিন্তু এই নারী-বিদ্বেষী কাকে বলে? নারী বিদ্বেষ বলতে বোঝায় নারীর প্রতি তীব্র ঘৃণা ও তীব্র বিরাগকে। সমাজবিজ্ঞানী অ্যাল্যাং জি জংশনের মতে, ''স্ত্রী-বিদ্বেষ নারীর জন্য ঘৃণার একটি সাংস্কৃতিক মনোভাব কারণ তাঁরা মহিলা।'' জংশন যুক্তি দেন যে, ''স্ত্রী বিদ্বেষ যৌন বিষয়ক কুসংস্কার ও মতাদর্শের একটি কেন্দ্রীয় অংশ। যেমন, পুরুষ-শাসিত সমাজে নারী বিদ্বেষ বিভিন্ন উপায়ে উদ্ভাসিত হয়। সেইসাথে যুক্ত হয় নানা সামাজিক কুসংস্কার।'' স্ত্রী বিদ্বেষের প্রমাণ ইতিহাস ঘাঁটলেও অনেক পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রীকে, নারিবিদ্বেষকে একটি অসুখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও প্রাচ্যের কিছু ধর্মীয় বই এবং পাশ্চাত্যের কিছু দর্শনের গ্রন্থেও এই নারী-বিদ্বেষের উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

নারীর প্রতি সহিংসতার ইতিহাস অনেক প্রাচীন একটি ব্যাপার। ধর্মীয় বিধিবিধান ও কুসংস্কারের আশ্রয় নিয়ে প্রাচীনকালেও যেমন নারীদের অধীনস্থ করার চেষ্টা করা হতো। এখনও তাই করা হয়। কিন্তু এতকিছুর পরেও এ সমাজের মানুষ দাবি করে তাঁরা নারী কে স্বাধীনতা দিচ্ছে। যতটুকু দরকার তাঁর চেয়ে অনেক বেশিই দিচ্ছে। কিন্তু যেকোনো মানুষকেই আরেকজন মানুষ স্বাধীনতা দেয়ার কে? স্বাধীনতা কি আরেকজন মানুষকে গিফট-বক্স সমেত দেয়ার জিনিষ? নাকি এটা কোন সার্টিফিকেট যে, অমুক সার্টিফিকেট থাকলে তাহলে তাকে স্বাধীন বলা যাবে? 

 

পুরুষের ক্ষেত্রে, এই সকল নিয়ম দেওয়া থাকে না। তাঁরা জন্মগত স্বাধীন। যেহেতু তাঁরা নিজেরা জন্মগত স্বাধীন। আর জীবনের অনেকটা সময়ে বড় পরিসরে স্বাধীনতা উপভোগ করে তাই তাঁরা নারীর প্রতি একটা কর্তৃত্ব ফলানোর অধিকারটা নিজে থেকে নিয়ে নেয়। কিন্তু যে নারী তাঁর দেয়া অধিকারটি দান স্বরূপ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে, তাঁর প্রতি সে বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করে। তখনই সে নিজের পরিবারের মেয়েদের এবং স্ত্রী কন্যাকে নারীবাদী বই, পত্রিকা, সমালোচনা থেকে দূরে রাখতে চায়। তাছাড়া নারীদের জীবন যে অন্যের জন্য কাজ করে চলবে এ বিষয়ে তো অনেকে আগেই ব্রেইনওয়াশ হয়ে আছে অনেক নারী নিজেই। তখন সে পুরুষের অধীনস্থ হয়ে সেই কাজটি করে দেয় এবং সন্তান লালন পালনও করে সেভাবে। 

 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে অনেক অংশেই দ্বায় করা যায় এই ক্ষেত্রে। যেমন চলচ্চিত্রে ভালো মেয়ে খারাপ মেয়ের চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়া আছে। স্বামীর পায়ের নিচে বেহেস্ত বলে স্বামীকেই প্রভু মনে করে উপাসনা করার চল রয়েছে। আবার, লক্ষ্মী বউ এর কিছু সংজ্ঞাও রয়েছে। যেমন ঘরের বউদের কিভাবে চলা উচিত, কি করা উচিত। বউ মানেই যে গৃহিণী, এর বাইরে কখনওই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যেতে পারেনি। কোন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একজন ঘরের বউকে অফিস গামী কর্মশীল নারী হিসেবে দেখানো হয় না। যদিও বা দেখানো হয় তখন তা বিশেষ রকমের ট্র্যাজিক হয়। যেমন: স্বামী মারা যাবার পর নিরুপায় হয়ে স্ত্রী তাঁর স্বামীর ফেলে যাওয়া কোম্পানির হাল ধরেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। 

 

তো যাই হোক, নারীর প্রতি সহিংসতা মূলত দুই রকমের হয়। এক, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। দুই, ব্যক্তির দ্বারা সহিংসতা। সমাজ এতদিন ধরে নারীর প্রতি সহিংসতার যে আশকারা দিয়ে এসেছে তাকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বলা যায়। এছাড়া বেশ্যাবৃত্তি ও মানব পাচারও রয়েছে। আর ব্যক্তিগত সহিংসতা হচ্ছে, ধর্ষণ , যৌন নির্যাতন, শিশুহত্যা, গৃহ নির্যাতন, প্রজননগত জোর জবরদস্তি, যৌতুক সহিংসতা ইত্যাদি। বাংলাদেশে এই দুরকমের সহিংসতাই প্রকটভাবে আছে। তবুও বাংলাদেশে নারীবাদ, মানবতাবাদের প্রয়োজনীয়তা কি সেটা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করে।অনেকের মতে বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমাণ সম অধিকার চর্চা হয় তাই এদেশে সমান অধিকারের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই বলে তাঁরা মনে করেন।

 

এছাড়াও, নারীবাদী বলে কেউ কাউকে পরিচয় দিলেও সেটা তো এখন গালমন্দের পর্যায়ে চলে গেছে । অতএব নারীবাদী হিসেবে অনেকে নিজেকে পরিচয় দিতেও চান না। কিন্তু নারী পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতাটা প্রোমোট করাটা কোন মানবাধিকারের কাজ না। বরং একে অন্যের সাথে মিলে মিশে একটা সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ গড়ে তোলাই একমাত্র এর উদ্দেশ্য।