Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

২১ জন ফিরে এলো, বাকিরা? 

সম্প্রতি দেশের প্রায় সব খবরের পাতায়ই বড় বড় অক্ষরে একটি শিরোনাম চোখে পরবে তা হলো, "দেশে ফিরল ভারতে পাচার হওয়া ২১ নারী ও শিশু"। খবর শুনে দর্শকমহল আবার স্বস্তির নিশ্বাসও ফেলছে। তবে পাচার হওয়া নারী-শিশুদের তুলনায় এই ফিরে আসার সংখ্যা যে কতটা নগণ্য তা তো বলার অপেক্ষা রাখেনা। 

 

শুক্রবার (৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ভারতের কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সেক্রেটারি শামিমা ইয়াসমিন স্মৃতি এসব নারী শিশুদের বেনাপোল সীমান্তে ফেরত পাঠায়। ৩ থেকে ৫ বছর আগে দালালের খপ্পরে পড়ে ভালো কাজের প্রলোভনে এরা দেশের বিভিন্ন সীমান্তপথে ভারতে গিয়েছিল। এ সময় অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারতীয় পুলিশ তাদের আটক করে আদালতে পাঠায়। পরে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস তাদেরকে ছাড়িয়ে নিজেদের জিম্মায় রাখে।

 

আইনি ব্যবস্থাপনা শেষে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় দুই দেশের সরকারের দেওয়া বিশেষ ট্রাভেল পারমিটে এরা দেশে ফেরার সুযোগ পায়। ফেরত আসা ২১ বাংলাদেশির মধ্যে ১৫ জন নারী ও ৬ জন শিশু রয়েছে। তাদের বাড়ি যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, ঢাকা ও বরিশাল জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে।

 

এ ঘটনা নতুন কিছু নয়, নারী পাচার যেনো বাংলাদেশের অতি পরিচিত এক ঘটনা। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ নারী-পুরুষ ও শিশু পাচার হয়েছে। প্রতিবছর ২০ হাজার নারী ও শিশু ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে যায়। অপর এক হিসাবে দেখা যায়, ভারতে অথবা ভারত হয়ে অন্য দেশে ৫০ হাজার নারী পাচার হয়ে গেছেন। ২০২০ সালে মানব পাচারের যে ৩১২টি মামলার বিচার হয়, সেগুলোর ২৫৬টি ছিল নারী পাচার ও যৌন সহিংসতা-সংক্রান্ত। (প্রথম আলো) 

 

দেশে নারী পাচারের অবস্থা এমনই যে বছরজুড়েই একের পর এক এসব ঘটনা আলোচনায় থাকবেই। তবুও আলোচনার বাইরে থাকে বড় একটি অংশ। নারী পাচারের জন্য অপরাধীরা ব্যবহার করছেন বহু ধরনের অপকৌশল। এর মধ্যে প্রধান কৌশল হলো বিয়ে বা বিয়ের প্রলোভন। গ্রামের সহজ সরল নারীদের এভাবে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বা ভুয়া বিয়ে করে কিংবা প্রেমের ফাঁদে ফেলে বহু নারীদের পাচার করা হচ্ছে৷  

 

২০২১ এ আলোচনায় আসেন বাংলাদেশের যশোরের মনিরুল ইসলাম মনির। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, আটকের পর মনির স্বীকার করে, বাংলাদেশের দরিদ্র মেয়েদের বিয়ে করে তাদের পাচার করাই তার পেশা। পাচারের উদ্দেশ্যে মনির বিয়ে করেন ৭৫টি। বিয়ের পর স্ত্রীদের অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে নিয়ে যেতো কলকাতায়। তারপর তাদের বিক্রি করে দিতেন ভারতের বিভিন্ন যৌনপল্লীতে। 

 

মনিরের মতো এমন বহু অপরাধী রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যারা শুধু বিয়ে বা প্রেম নয় মডেলিং এবং বিদেশে চাকুরীর প্রলোভনসহ নানা ধরনের ফাঁদ পেতে নারী পাচার করে থাকেন। বর্তমানে নারীদের ফাঁদে ফেলার আরেকটি অপকৌশল টিকটক। টিকটকের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করা হচ্ছে অনেক নারীকে। 

 

শুধু যে বাঙালি নারীরাই এই পাচারের শিকার হচ্ছেন, তা নয়। আদিবাসী নারীরাও বিভিন্নভাবে পাচার হচ্ছেন। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, গত ৫ বছরে প্রায় ৪৫০ জন আদিবাসী নারী পাচারের শিকার হয়েছেন।

 

২০১২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো মানব পাচার অপরাধের বিচারের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইনে  বলা হয়েছে যে, এই আইনের অধীনে অপরাধগুলো আমলযোগ্য, আপোষের অযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। 

 

এ আইনের ৬ ধারায় মানবপাচার নিষিদ্ধ করে এই অপরাধের জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ৭ ধারায় আছে সংঘবদ্ধ মানবপাচার অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের কথা। 

 

ধারা ৮-এ অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র বা চেষ্টা চালানোর দণ্ড হিসেবে অনধিক সাত বছর এবং কমপক্ষে তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ১১ ধারায় পতিতাবৃত্তি বা অন্য কোনো ধরনের যৌন শোষণ বা নিপীড়নের জন্য আমদানি বা স্থানান্তরের দণ্ড অনধিক সাত বছর এবং কমপক্ষে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

 

তবে এতোসব আইন থাকা সত্ত্বেও আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না নারী পাচারের সাথে সম্পৃক্ত বড় একটি অংশকে। নিয়মিত চলছে নারী-শিশু পাচার। পাচারকারীরা প্রতিনিয়তই নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে পাচার অব্যাহত রাখছেন। মাঝেমধ্যে আইনের সহায়তায় কিছুসংখ্যক নারী শিশু দেশে ফিরে আসলেও বড় একটি অংশের কথা আলোচনায়ই আসেনা। যেমন সম্প্রতি পাচার হওয়া এই ২১ জন নারী-শিশু ফিরে এলেও প্রশ্ন ওঠে, তবে বাকিরা কোথায়?