Skip to content

২রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বউ কিসের জন্য?

নতুন বউয়ের হাতের মেহেদীর রং মলিন হবার পূর্বেই, তার জীবনের রঙ ধূসর হয়ে যায়। এই ধূসরতার স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠে যখন বাংলাদেশ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রে (আসক) দেখায় ২০২০ সালের প্রথম নয়মাসে নূন্যতম ২৩৫ জন নারী তাদের স্বামী বা স্বামীর পরিবার কর্তৃক খুন হয় কিংবা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে প্রায় ৭০ শতাংশ নারীর কথা যারা স্বামী বা ঘনিষ্ঠজন কর্তৃক পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এই সকল প্রতিবেদন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় আমাদের কাছে, সমাজের কাছে- 'বউ কিসের জন্য?' নির্যাতন করবার জন্য? খুন হবার জন্য? 

 

২০১৬ সালের ৭ এপ্রিল। সাদিয়ার বয়স তখন মাত্র ২৭ বছর। সন্ধ্যার নামাজের পর তার স্বামীর ডাকে ঘর থেকে ছুটে আসে দরজা পর্যন্ত কিন্তু দরজা পাড়ি দিয়ে আর বের হতে পারেনি। কেননা পথ আটকে দুজন ব্যক্তি তার স্বামীর উপস্থিতিতে ছুঁড়ে দেয় নাইট্রিক এসিড। স্বামী দাড়িয়ে দেখে সেই ঝলসে যাওয়া দৃশ্য। 

ঘটনাটির একবছর পর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)'এর নেওয়া সাক্ষাতকারে সাদিয়া তারসাথে ঘটে যাওয়া এই নির্মম ঘটনাটি খুলে বলে যা বাংলাদেশের নারী নির্যাতনের ওপর তৈরিকৃত HRW এর 'I sleep in my own deathbed' শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দীর্ঘ চার মাস ঢাকা মেডিকেলে থেকে বাম চোখ ও কান খোয়ান সাদিয়া। 

 

সাদিয়া কোন একক নারী নয়। ইলমা চৌধুরী মেঘলা নামে বিগত সপ্তাহে যে নারীটি বিয়ের ছয়মাস পরে মারা গিয়েছে শরীরে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কিংবা গতকাল (২০ ডিসেম্বর) মাহমুদা নামের যেই নারী বিয়ের ২ বছর পর মারা গিয়েছে নির্যাতনের শেষ সীমায় পৌঁছে, সাদিয়া সেসকল নির্যাতিত নারীর প্রতিনিধি।

 

 

সাদিয়ার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তার বিয়ের ১২ বছর পরের ঘটনা। এই বারো বছরে সহস্রবার নির্যাতিত হয়েছিলো সাদিয়া। কিন্তু মুখ খোলেনি। এই সাদিয়া ৯ শতাংশের একজন নারী যে কিনা চক্ষুলজ্জা, সামাজিকতার কথা ভেবে মুখ বুজে স্বামী, স্বামীর পরিবার কর্তৃক সকল সহিংসতা সহ্য করে এবং এই সাদিয়া সেই ৪ জনে ১ জন নারী যে  স্বামীর হাতে মার খাওয়াকে যৌক্তিক মনে করে। সাদিয়া আমরা সেই ৭০ শতাংশ নারী। 

 

মানবসভ্যতার শুরু থেকে মানুষ বহুগামিতার চর্চা করে এসেছে বলে আমরা জানি। আমরা যদি ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তাহলে জানা যায় আদিযুগে যখন মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত মালিকানার ধারনা উৎপত্তি লাভ করে তখন বিয়ের সূত্রপাত হয় এবং পরিবার প্রথার মূল উৎস ‘বিয়ে’। মানুষ কেন বিয়ে করে এবং স্ত্রী নির্যাতনের সূত্রপাত কোথায় সেই প্রশ্নের জবাবে সহযোগী অধ্যাপক (নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) জোবাইদা নাসরীন কনা বলেন, "বিয়েটা একটা চুক্তি যার মাধ্যমে যৌনতাকে স্বীকৃতি এবং বৈধতা দেওয়া হয়। সেই যৌনতাকে কেন্দ্র করে যে ক্ষমতা সম্পর্ক তৈরি হয়, ফুকো যেটাকে বলেছেন 'জৈবক্ষমতা', সেখান থেকে আসলে কর্তৃত্বপরায়ণতা তৈরি হয় এবং এই যৌনতা কেন্দ্রিক ক্ষমতার সম্পর্ক (বিয়ে) পুরুষকে নারীর ওপর কর্তৃত্বের বৈধতা দেয়। যার ফলে বিয়ের মাধ্যমে মানুষ বুঝে যায় যে সে (পুরুষ/স্বামী) একটি নারীকে মারলেও সেটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। বিষয়টি রাজনৈতিক হিসেবে আলোচনায় আসেনা অথচ বিখ্যাত নারীবাদী তাত্ত্বিকরা, যেমন কেইট মিলেট বলেছেন যৌনতা একটা রাজনৈতিক সত্তা।" 

 

স্বামী বা ঘনিষ্ঠজন কর্তৃক নিপীড়নের শেষ কোথায় প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান, যতদিন আমরা পারিবারিক নিপীড়নকে ব্যক্তিগত মনে করবো, যতদিন না আমরা এটাকে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবো ততদিন এই নিপীড়ন সমাজে থেকে যাবে। পারিবারিক নির্যাতন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। আমরা নারীকেই বলছি সচেতন হতে, আওয়াজ তুলতে কিন্তু বিপরীতে যাদের দ্বারা এইসব সহিংসতা সংগঠিত হচ্ছে তাদের আচরণকে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার কোথাও থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে না, তাদেরকে বলা হচ্ছেনা কিভাবে স্ত্রীর সঙ্গে আচরণ করতে হয়। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের (পুরুষদের) সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ হচ্ছেনা এবং কোন ধরনের কর্মশালার আওতায় আনা যাচ্ছেনা। অর্থাৎ অপরাধের শিকার যেমন নারী হচ্ছে তেমনি অপরাধ মোকাবেলার দায়ভারও  নারীর ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারী নিপীড়নের অপরাধগুলো কেবল নারীর বিষয় হিসেবেই গণ্য করছি এবং বলছি যে নারীরাই তাদের সাথে ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে। কিন্তু যতদিন না পুরুষ পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে কথা বলবে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে সচেতন হবে, সমবেতভাবে আওয়াজ না উঠাবে ততদিন পর্যন্ত পারিবারিক নির্যাতনের সমাধান হবেনা।"

 

পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হবার পেছনে স্বামীর পাশাপাশি শাশুড়ি, স্বামীর বোনদের নামও অনেক সময় উঠে আসে। পুরুষতান্ত্রিকতা এমন একটা সমাজব্যবস্থা, ধারনা যেখানে পুরুষকে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে মানা হয় এবং এই ধারনার বাহক একজন নারী নিজেও হয়। ফলশ্রুতিতে নারীর হাতে নারী নির্যাতিত হবার ঘটনাও বিরল নয়। 

যেই ঘরে শীতল হাওয়া বয়ে যাবার কথা সেই ঘরে কিসের আগুন!

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ