Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মেয়েরা থাকবে স্বামীর সংসারে, হলে কেন থাকবে?

বাংলাদেশি হিসেবে গর্বভরে বলার মতো বিষয় আমাদের বিজয়ের ৫০টি বছর পূর্ণ হয়েছে। এই ৫০ বছরে তলাবিহীন ঝুড়ি বলা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিজের নাম লিখিয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে প্রবৃদ্ধির হার, কৃষি, রেমিট্যান্স সকল সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ। মহাকাশেও এই জয়যাত্রা জারি রেখে উৎক্ষেপণ করেছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট – ১। ৫০ বছরের এতো অর্জনে বাংলাদেশের নাগরিকদের অর্ধেকের বিজয় ঠিক কতখানি ঘটেছে? এই নাগরিকদের অর্ধেকরা হলেন নারী। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র,পরিবার, সমাজ কিংবা অনলাইন নারী স্বাধীনতার স্বাদ ৫০ বছরে কোথায় কতটুকু পেয়েছে তার উত্তর বাংলাদেশের নারীদের জীবনে উপর থেকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়৷ 

করোনা কালীন মহামারীতে গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি। বাল্যবিয়ে ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার ছাত্রীদের উপবৃত্তি সহ নানান সব চমকপ্রদ পন্থা অবলম্বন করে যাচ্ছেন। এরপরেও বাংলাদেশে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বেশিরভাগ পরিবারের প্রথম এবং একমাত্র পছন্দ বিয়ে। 

 

বাল্যবিয়ে ঠেকাতে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিলো নারীশিক্ষাকে আরো বহুমাত্রায় উৎসাহ দেয়া কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় গুলো হতাশাজনক ভাবে পুরোপুরি উলটো ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে যার প্রমাণ আমরা পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবাহিত ছাত্রীদের হল থেকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবাহিত ছাত্রীদের আগামী জানুয়ারির মাঝেই হল ছাড়ার নোটিশে। 

 

আইসিসিপিআর, ইউডিএইচআর সহ বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিয়ে ও পরিবার গঠনের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশে বিবাহিত ছাত্রীদের বিয়েকে কেবল অস্বীকৃতি নয় যথারীতি অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যেই দেশে মাত্র কয়েকমাসে গত ২৫ বছরে বাল্যবিয়ে রেকর্ড সংখ্যক হারে বেড়ে যায় সেই দেশে বিবাহিত ছাত্রীদের এইভাবে বঞ্চিত করা হলে এই বাল্যবিয়ে, অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা ঘিয়ে আগুন ঢালার মতো ব্যাপার। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গুলো বিবাহিত ছাত্রীদের অধিকার বঞ্চিত করে, হলের সিট কেটে সাজা দিয়ে নারী শিক্ষার পথে বাঁধা সৃষ্টি করছে যেটি অস্বীকার করার উপায় একেবারেই নেই। 

"বিবাহিত মেয়েরা থাকবে স্বামীর সংসারে, সে কেনো হলে থাকবে? স্বামী যদি বাইরে থাকে সেক্ষেত্রে স্বামীকে শেল্টার খুঁজে দিতে হবে।" এমনটাই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হলের প্রভোস্ট  এবং জিওগ্রাফি ও এন্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের শিক্ষিকা অধ্যাপক ড. নাজমুন নাহার। 

 

স্বামীর সংসারে থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের ছাত্রী ইলমা চৌধুরী মেঘলা কে সারা শরীরে কালশিটে দাগ নিয়ে খুন হতে হয়েছে গত ১৪ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। এর আগে করোনা মহামারী কালীন ছুটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া আক্তারকে চাকরী করতে চাওয়ায় স্বামীর সংসারেই জীবন হারাতে হয়েছে।

 

গত ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২১ – এ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী এক মাসে স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ৮৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার ২ হাজার আট জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন  ১ হাজার ৩০৮ জন নারী। 

 

অর্থাৎ একজন নারী স্বামীর সংসারে সর্বোচ্চ নিরাপদ এই মধ্যযুগীয় চিন্তা বারবার নারীকে জীবন দিয়ে ভুল প্রমাণ করতে হয়েছে। ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবসে অসংখ্য শিক্ষাবিদের শহীদ হওয়াকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। একই দিনে একজন শিক্ষাবিদ এখনো আদিম যুগের কালা আইনের পক্ষে সাফাই গেয়ে কিভাবে নারীকে স্বামীর সংসারেই থাকতে হবে এই সার্টিফিকেট দেন সেটি যথেষ্ট আশংকা ও ভয়ের।  বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সে বিবাহিত হোক, অবিবাহিত হোক, ডিভোর্সি হোক অথবা বিধবা হোক তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে আবাসন সুবিধা দেবার দায়িত্ব প্রশাসনের যতক্ষণ পর্যন্ত সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আবাসন সমস্যার সমাধান তো দূর বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা যখন স্বামীর সংসারেই নারীকে থাকতে এমন পুরুষতান্ত্রিক বাক্য উচ্চারণ করেন তখন নারী হিসেবে আমাদের চিন্তিত হতে হয়। 

 

এই ধরনের বক্তব্য স্বামীর ঘরে নারী নির্যাতনকে অঘোষিতভাবে দায়মুক্ত করে ফেলে। অসংখ্য বিবাহিত নারীকে অত্যাচারের মুখে সংসারের মায়া ত্যাগ করে শান্তির জীবন বেছে নেয়ার বদলে স্বামীর সংসারে মেঘলা অথবা সুমাইয়ার মত খুন হতে যেতে বাধ্য করে। 

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষিত নারীরা বেশ সরব থেকেছেন বরাবর। অথচ একজন শিক্ষিতা নারী যখন বলেন "স্বামী ঢাকার বাইরে থাকলে স্ত্রীর শেল্টার খুঁজে দেয়ার ব্যবস্থা স্বামীকে করতে হবে" তখন অদ্ভুত ভাবে একজন শিক্ষিতা নারী যিনি নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেন তিনি স্বামীর আধিপত্যকে মাথা পেতে স্বীকার করে নেন। দুজন ছেলেমেয়ে যদি সমবয়সী হয় এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাহলে স্বামীর পক্ষে কিভাবে এতো অল্প বয়সে ছাত্র থাকা অবস্থায় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের মাঝে অন্যতম ঢাকা শহরের পরিপূর্ণ আবাস নিয়ে শেল্টার দেয়া সম্ভব। যেই সমাজ নারীর ক্ষমতায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই সমাজে একজন নারীকে এখনো কেনো স্বামীর উপরে ভর করে নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে বাঁচতে হবে? নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে এই শিক্ষিত নারীরা কি তাহলে স্বাবলম্বী পুরুষ ছাড়া বিয়ে করা যাবে না, নারী মাত্রই তিনি পুরুষের উপর ভাত কাপড়ের জন্য নির্ভর হয়ে পরবেন এমন মানসিকতাকেই পাকাপোক্ত করছে না? 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্ট এবং হাউজ টিউটর হিসেবে পুরুষ রয়েছেন। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাউজ টিউটর এবং প্রভোস্টরা সকলেই নারী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিয়ের মত ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর মত বিধিনিষেধ আরোপ করা নেই। বরং ছাত্রীদের সাথে যথেষ্ট অভিভাবকসুলভ আচরণ তারা করেন। একজন নারী যখন বিপদে পরবেন সবার আগে তিনি প্রত্যাশা করবেন অপর নারীটিই তার দুঃখ, বেদনা সবার আগে বুঝবে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন হল প্রভোস্ট এবং হাউজ টিউটরদের বিরুদ্ধে ছাত্রীরা যেই বিমাতাসুলভ আচরণের অভিযোগ করেন তাতে এই ধারণা মিথ্যে বলে বারবার প্রমাণিত হয়।