Skip to content

২০শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

জিপিএসের টুকিটাকি

আপনার মোবাইলটিতে এই মুহূর্তে সেটিংসে দেখুন লোকেশন নামে একটি ফিচার আছে। আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকেন নাহ কেন আপনাকে খুঁজে বের করা অনেকটা হাতের তুড়ি বাজানোর মতো। তাজ্জব ব্যাপার হল প্রযুক্তিটি অনেক সাধারণ হলেও একে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অনেক মিশন সম্পূর্ণ করেছে। আজকে আমরা ঘুরে আসবো জিপিএসের দুনিয়ায়।

 

জিপিএস চব্বিশটি স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে করা একটি পদ্ধতি। এর সাথে ঘড়ির সময় মেলানো থাকে। যখন কোন স্মার্ট ফোন জিপিএস ব্যবহার করে আপনার অবস্থান ম্যাপে খুঁজে বের করে, তখন এটা কোন একটি স্যাটেলাইট থেকে সিগন্যাল গ্রহণ করে এবং সিগন্যাল পাঠানোর সময়ের ভিত্তিতে হিসেব করে। জিপিএসের এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলো কিন্তু একসাথে অবস্থান করছে না। বরং পৃথিবীর চারপাশে প্রায় সমান দূরত্বে এমনভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে যেন সবগুলো স্যাটেলাইট মিলে পুরো পৃথিবীর প্রত্যেকটা অংশ  সিগন্যাল পাঠিয়ে কাভার করে। প্রায় ১২০০০ মাইল উচ্চতায় স্যাটেলাইট গুলো অবস্থান করছে। অন্তত ৪টি স্যাটেলাইট আপনি আপনার সাথে পাবেনই, এমনটি মাথায় রেখেই এই পুরো নেটওয়ার্ক সাজানো হয়েছে।

 

বাংলাদেশ গত বছর নিজস্ব (বঙ্গবন্ধু-১) কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটের মালিক হয়েছে। আবার অনেক দেশ আছে যাদের এখন পর্যন্ত কোন স্যাটেলাইট নেই। জিপিএস স্যাটেলাইটগুলোর মালিক হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার। তাদের প্রতিরক্ষা বিভাগ এই স্যাটেলাইটগুলো মিলিটারিদের ব্যবহারের জন্য ১৯৭০ এর দিকে স্পেসে পাঠিয়েছিল। পরবর্তীতে ৮০র দশকে তারা এই স্যাটেলাইটগুলো বা পুরো জিপিএস সিস্টেমটিকে সারা পৃথিবীর সব দেশ কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। জিপিএস স্যাটেলাইটগুলোর দেখভাল করার জন্য পৃথিবীতে মোট ৩০টি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ আছে, যার প্রধান কলোরাডো স্প্রিংস এ অবস্থিত।

 

পুরাতন প্রযুক্তি হলেও সাধারণ মানুষ জিপিএস খুব কমই ব্যবহার করতো। তখন শুধু বিমান, জাহাজ, মাছ ধরার জলযান কিংবা এডভেঞ্চারাররা জিপিএস ডিভাইস দিয়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতো। কিন্তু স্মার্টফোন আসার পর ফোনের ভিতরেই ঢুকিয়ে দেয়া হল ছোট্ট জিপিএস চিপ। আর এখন এর সাথে গুগল ম্যাপ কিংবা উবার এর মতো কনসেপ্টগুলোর কম্বিনেশনে জিপিএস এর ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। আপনার ফোনে যে জিপিএস চিপটি আছে সেটা হচ্ছে জিপিএস সিগন্যাল রিসিভার। জিপিএস স্যাটেলাইট থেকে আগত সিগন্যাল ধরতে পারে। রিসিভার চিপ কোন তথ্য ট্রান্সমিট করে না বা স্যাটেলাইটের নিকট প্রেরণ করেনা।

 

শুরুতে যে ২৪টি স্যাটেলাইটের কথা বলেছিলাম, ঐ স্যাটেলাইটগুলো আসলে দিনে ২৪ ঘণ্টা আর সপ্তাহের সাত দিনই এক ধরনের রেডিও সিগন্যাল ট্রান্সমিট করতে থাকে। সেই সিগন্যাল ধরার ক্ষমতা জিপিএস চিপ এর মাঝে আছে যা আপনার স্মার্টফোন কিংবা কার ট্র্যাকারে থাকে। 

 

জিপিএস স্যাটেলাইটগুলোতে এটমিক ক্লক লাগানো থাকে যা দিনের পর দিন ধরে খুবই সূক্ষ্ম সময় দেয়।আপনার ফোনে তো একটা ঘড়ি আছেই। স্যাটেলাইটগুলো যে সিগন্যাল পাঠায় তাতে মূলত সিগন্যালটি সেন্ড করার সময়কার সময় থাকে। আপনার ফোনটি প্রাপ্ত সিগন্যালটির উৎপন্ন হওয়ার সময় আর আপনার ফোনটি যখন সেই সিগন্যালটি রিসিভ করেছে তার ব্যবধান থেকে ঐ স্যাটেলাইট আর আপনার ফোনের মধ্যকার প্রকৃত দূরত্ব হিসেব করে ফেলে। এই দূরত্ব থেকেই মূলত জিপিএস আপনার অবস্থান নির্ধারণ করে।

 

তবে আপনি একটা জিনিসের সাথে আরেকটা জিনিসের দূরত্ব দিয়ে দ্বিতীয় জিনিসের অবস্থান নির্ণয় করতে পারবেন না। সেখানে অবস্থান নির্ণয় করতে হলে আপনাকে কমপক্ষে তিনটি জিনিসের সাপেক্ষে দূরত্ব নিতে হবে। জিপিএসে  ট্রাইল্যাটেরেশন পদ্ধতিতে কাজ করে। আপনার ফোনের জিপিএস চিপটি একই সাথে ৩-৪টি জিপিএস স্যাটেলাইট থেকে নিজের দূরত্ব নির্ণয় করে নেয়। সাধারণত তিনটি জিপিএস স্যাটেলাইটের সিগন্যাল নিয়েই আপনার লোকেশন বের করে ফেলে। এভাবে যত বেশি স্যাটেলাইটের সিগনাল পাবে আপনার লোকেশনও তত বেশি এক্যুরেট পাবেন। খোলা আকাশের নিচে এই সিস্টেম সবচেয়ে ভালো কাজ করে, কারণ স্যাটেলাইট সিগন্যাল পেতে তখন সুবিধা হয়।

 

জিপিএস কিন্তু এভাবে আপনার অবস্থানের জায়গাটির নাম জানে না। সে বের করে আপনার কোঅরডিনেট পয়েন্ট। ল্যাটিচ্যুড আর লঙ্গিচ্যুড নামক দুটি বিন্দুর মাধ্যমে এটা আপনার দ্বিমাত্রিক অবস্থান জেনে নেয়। পুরো পৃথিবীর প্রতিটা বিন্দুকেই আপনি কোন না কোন কোঅরডিনেট পয়েন্টে প্রকাশ করতে পারবেন। দুটি জায়গার নাম এক হতে পারে কিন্তু কোঅরডিনেট এক হবেনা। জিপিএস কোঅরডিনেট পয়েন্টস আপনার ফোনের গুগল ম্যাপ, বিং ম্যাপ কিংবা অ্যাপল ম্যাপের মতো ডিজিটাল ম্যাপের উপর প্লট করে দেয়ার পর আপনি বুঝতে পারেন যে আপনি কোন জায়গায় অবস্থান করছেন। এই প্লটিংয়ের কাজটা করে ম্যাপিং অ্যাপগুলো।

 

প্রকৃতপক্ষে জিপিএস সিগন্যাল রিসিভ করার জন্য আপনার ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন থাকার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। শুধুমাত্র গ্রাফিক্যাল ম্যাপ ডাউনলোড হওয়ার জন্য আপনার ইন্টারনেট দরকার হয়। তাই আপনি যদি গুগল ম্যাপ এর কোন অংশ অফলাইনে ব্যবহারের জন্য ডাউনলোড করে রাখেন তাহলে পরবর্তীতে ইন্টারনেট ছাড়াই জিপিএস অন করে আপনার নিজের লোকেশন দেখতে পাবেন। জিপিএস এর মালিক হল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। যদিও তারা এটা সারা পৃথিবীর জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছে, কিন্তু তারা চাইলেই এটা বন্ধ করে দিতে পারে।

 

তাই এর উপর থেকে নির্ভরতা কমানোর জন্য, রাশিয়া এরকম জিপিএসের মতো সিস্টেম ডেভেলপ করেছে যার নাম দিয়েছে তারা GLONASS। চীন বিডিএস নামে ও ইউরোপ গ্যালিলিও নামে তাদের নিজস্ব পজিশনিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। আপনি যে অবস্থানে থাকুন নাহ কেন আপনাকে খুঁজে পেতে কাউকেই বেগ পেতে হবে নাহ। প্রযুক্তিটি পেগাসাস প্রজেক্টের মতো অতোটা শক্তিশালী নাহ। তবে মানবজাতির কল্যাণ সাধনে অধিকতর সময় উপযোগী।

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ