Skip to content

২রা মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য ‘তাঁতশিল্প’

উৎসবে হোক বা বাড়ির আঙিনায়, আটপৌঢ়ে ঢঙে কিংবা জমকালো সাজে; বাঙালি নারীর অপরূপ সৌন্দর্য জুড়ে রয়েছে শাড়ি! বাহারি শাড়ির ভীড়ে নারীদের পছন্দের তালিকায় দৃঢ় জায়গা করে নিয়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। এ শাড়ি বাংলাদেশের প্রাচীনতম কুটির শিল্পের মাঝে অন্যতম। প্রাচীনকাল থেকেই টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের প্রসার ও খ্যাতি ব্যাপক।

 
বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাং এর ভ্রমণকাহিনীতে  টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্পের উল্লেখ রয়েছে। তাঁতশিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে টাঙ্গাইলের সফট সিল্ক ও কটন শাড়ি। এ শাড়ীর বৈশিষ্ট্য হল পাড় বা কিনারের নান্দনিক কারুকাজ। একসময় টাঙ্গাইলের তাঁতিরা মসলিন শাড়ি বুনতেন বলেও শোনা যায়। সে মসলিনের দিল্লীর মোঘল দরবার থেকে বৃটেনের রাজপ্রাসাদ অবধি গতি ছিল।

 

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য ‘তাঁতশিল্প’

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বসাক সম্প্রদায়রাই প্রথম টাঙ্গাইলে তাঁতের গোড়াপত্তন করেন। শুরুতে এরা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এসে তাঁতের কাজ শুরু করে। আবহাওয়া ভালো না হওয়ায় সেখান থেকে চলে আসেন রাজশাহীতে। সেখানেও আবহাওয়া প্রতিকূল দেখে তারা দুভাগে ভাগ হয়ে একদল চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর এবং আরেকদল চলে যান ঢাকার ধামরাইয়ে। তবে তৎকালীন সন্তোষের জমিদারের অনুরোধে কিছু তাঁতি টাঙ্গাইলে এসে কাপড় বোনা শুরু করেন। তবে কিছু সংখ্যক তাঁতি সিল্কের কাজের সাথে যুক্ত হয়ে রাজশাহীতেই থেকে যান।

 

টাঙ্গাইলের আবহাওয়া কাপড় বোনার উপযোগী বলে এখানে আসা তাঁতিরা স্থায়ী ভাবে বাস করতে শুরু করেন এবং বংশানুক্রমে এ তাঁতশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। টাঙ্গাইল জেলার তাঁতবহুল গ্রাম গুলো হচ্ছে বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, বামনকুশিয়া, পাথরাইল, ঘারিন্দা, গোসাই, তন্দ্রি, নলুয়া, তারটিয়া, জোয়ার, এনায়েতপুর, দেওজান, বেলতা, গড়াসিন, সন্তোষ, নলসুন্দা, কাগমারি, বল্লা, রামপুর, বাংরা, সহদেবপুর, ভুক্তা, আকুয়া, ছাতিহাটি, আইসরা, রতনগঞ্জ, বিষ্ঞুপুর ইত্যাদি।

 

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য ‘তাঁতশিল্প’

 

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের জন্য তাঁতিরা পূর্বে চরকায় সুতা কাটতো একসময় কিন্তু এখন সুতা কাটবার জন্য মেশিন ব্যবহার করা হয়। তাঁতের কাজে পুরুষের পাশাপাশি বাড়ির নারী সদস্যরাও সমান ভুমিকা রেখেছেন। সুতা গোছানো, রং নির্বাচন, রেশমি সুতার কারুকাজ এবং অতিরিক্ত সুতা ছাটাইয়ের কাজ করে থাকেন তারা। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িতে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন মানের সুতা। এসব শাড়ী ছয়শত থেকে এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বর্তমানে জামদানি বা সফট সিল্ক, হাফ সিল্ক, টাঙ্গাইল বিটি, বালুচরি, জরিপাড়, সূতিপাড়, হাজার বুটি, কটকি, স্বর্ণচূড়, ইককাত, আনারকলি, দেবদাস, কুমকুম, সানন্দা, নীলাম্বরী, ময়ুরকন্ঠী ইত্যাদি নামের অত্যন্ত জনপ্রিয় শাড়ি তৈরি হয়। শাড়ির নাম, মান ও কারুকাজ ভেদে দাম ভিন্ন ভিন্ন হয়।

 

টাঙ্গাইলে তাঁতের শাড়ির প্রধান হাঁট হচ্ছে বাজিতপুর। সপ্তাহে দুদিন বসা এ হাঁটের বেশিরভাগ ক্রেতারাই মহাজন। এছাড়া বিদেশি ব্যবসায়ীরা শাড়ি নিতে আসেন এখানে। হাজার প্রতিকুলতা ও প্রতিযোগিতার এই বিংশ শতাব্দীতেও টাঙ্গাইলের এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ি তার গৌরব ধরে রেখেছে,আজো বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দ টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। লোকমুখে একটি প্রচলিত কথা প্রায়ই শোনা যায় 

"নদী চর খাল বিল গজারির বন
টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।"

 

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ