Skip to content

১০ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ২৬শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

১০৭ বছরের ব্রিটিশ নিদর্শন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

ব্রিটিশ স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। তৎকালীন ব্রিটিশ ঐতিহ্যকে বুকে  ধারণ করে দীর্ঘ ১০৭ বছর ধরে বীর দর্পে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজটি। হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ রেলসেতু হিসেবে পরিচিত। 

 

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি থেকে কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলা পর্যন্ত যুক্তকারী একটি রেলসেতু। ১৯১৫ সালে পদ্মা নদীর বুকে তৈরি করা হয়েছিল এই ব্রিজটি। তখন পদ্মার জলরাশি আর খরস্রোতা উত্তাল ঢেউ ছিল, ছিল ভরা যৌবন। সেই পদ্মার যৌবন হয়তো এখন শেষ হতে চলেছে, কিন্তু চিরযৌবনা সেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পদ্মার বুকে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অমর কীর্তি হয়ে। 

 

এই ব্রিজ স্থাপনের এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। ১৮৮৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কলকাতার সঙ্গে আসাম, ত্রিপুরাসহ উত্তরাঞ্চলের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এই ব্রিজ তৈরির প্রস্তাব করেছিলেন। সেই সময়ে প্রস্তাবটি কার্যকরী না হলেও তার কয়েক দশক পর ১৯০৯ সাল থেকে ব্রিজটি নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। এই ব্রিজ নির্মাণের সময়কাল ছিল ১৯০৯ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত। ১৯১৫ সালে ৪ মার্চ তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ব্যারন হার্ডিঞ্জ নিজে ফিতা কেটে ব্রিজটি উদ্বোধন করেন। তার নাম অনুসারেই ব্রিজের নাম হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

 

এই ব্রিজটি এককভাবে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইস্পাত নির্মিত ডুয়েল গেজ রেলওয়ে ব্রিজ। এটাকে সুরক্ষা করার জন্য ব্রিজের দুই পাশে নদী শাসনের জন্য ব্রিজ থেকে উজানে ৯১০ মিটার এবং ভাটিতে ৩শ’ মিটার করে গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ১,৭৯৮.৩২ মিটার বা ৫,৮৯৪ ফুট (১.৮ কি.মি)। সর্বমোট ১৫টি গার্ডার বা স্প্যান রয়েছে। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ মিটার করে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ব্যারন হার্ডিঞ্জের নাম অনুসারে এই ব্রিজটির নামকরণ করা হয়। ব্রিজটি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট উইলিয়াম গেইলসকে। ব্রিটিশ সরকার তাকে এই ব্রিজ নির্মাণের স্বীকৃতিস্বরুপ ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত করে। ব্রিজটির নকশা প্রণয়ন করেন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি আলেকজান্ডার মেয়াডোস রেন্ডেল। 

ব্রিজটি নির্মাণের জন্য প্রায় ২৪ হাজার ৪’শ শ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এসব শ্রমিকের অধিকাংশই ছিল বাঙালী। সেসময় অনেক ব্রিটিশ নাগরিকের জন্য পাকশীতে গড়ে তোলা হয় বাংলো বাড়ি ও কটেজ। পাকশীতে তখন ব্রিটিশদের অবাধ চলাচল ছিল। এটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয় ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ভারতীয় রুপি। ব্রিজের ওপর দিয়ে দু’টি ব্রডগেজ রেললাইন গেছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভারবহন ক্ষমতা ১ হাজার ৯২৭ টন। 

 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আকাশ থেকে নিক্ষেপিত বোমার আঘাতে ব্রিজটি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এই ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্যাংক, যুদ্ধসরঞ্জামসহ সৈন্যও পারাপার করত। ফলে মিত্র বাহিনীর যুদ্ধবিমান থেকে এই ব্রিজের ওপর বোমা ফেলা হয়েছিল। ফলে ব্রিজের ১২ নম্বর স্প্যান ভেঙে গিয়েছিল এবং ৯ ও ১৫ নম্বর স্প্যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে জাপান সরকারের সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া রেলওয়ে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি প্রকল্পের অধীনে ব্রিজটি মেরামত করা হয়। নির্মাণকালে ব্রিজটির কোন আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়নি, যদিও এটি একশ’ বছর ধরে কার্যকর রয়েছে।

 

সেসময় প্রমত্ত পদ্মার বুক চিরে নৌকা যোগে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য কৌতূহলী মানুষ ব্রিজটি দেখতে আসত। এখন পদ্মার সেই ধারা না থাকলেও প্রতিদিন অগণিত দর্শনার্থী এখানে ভিড় জমায়।

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ