Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

কর্মব্যস্ত শহরে এমন অনেক পরিবারই দেখা যাবে যেখানে স্বামী স্ত্রী দুজনেই চাকরি করেন। একজন স্ত্রীর পক্ষে অফিসের কাজের পাশাপাশি ঘরের কাজও পুরোপুরি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অনেক পরিবারেই ঘরের কাজের জন্য একজন গৃহকর্মী নিযুক্ত রাখা হয়। কেবল বাড়ির কর্ত্রী চাকরিজীবী হলেই যে গৃহিণী নিযুক্ত হয় এমন নয়। অনেক বাড়িতে অতিরিক্ত কাজের জন্যও গৃহকর্মী রাখা হয়। 

 

গৃহকর্মীর কাজে যুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী ও শিশু। মূলত দারিদ্র্যের কারণে বাবা-মা তাদের সন্তানদের গৃহশ্রমিক হিসেবে বাসাবাড়িতে পাঠান। অনেক দরিদ্র বাবা-মা  আছেন, যারা তাদের এই শিশুদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা পারিবারিক কাজের জন্য শিশু গৃহকর্মীদের ওপর।

 

বেশির ভাগ গৃহকর্মীর জন্য কোন ধরনের কর্মঘণ্টা নির্ধারিত নেই। পরিবারের সকলে ঘুম থেকে ওঠার আগে এই গ্রহশ্রমিকদের উঠতে হয় এবং তাঁরা ঘুমাতে যান সবাই ঘুমানোর পর।  বাড়িতে থেকে তারা বাড়ির ছোট- বড় অনেক কাজ করে থাকেন। রান্না থেকে শুরু করে ঘর পরিষ্কার, বাচ্চা সামলানো সহ অনেক কাজেই বাড়ির সদস্যরা এই গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল থাকে। তাদের দিয়ে বেশি কাজ করানো হলেও তাদের মজুরি দেওয়া হয় অনেক কম। আবার সামান্য ভুল-ত্রুটি হলেই তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন।

 

কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, একটি বাড়ির এতো কাজ করার পরও এই গৃহকর্মীরা নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মোট ৪৪ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এঁদের মধ্যে চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। ১২ জনের হয়েছে রহস্যজনক মৃত্যু, ধর্ষণের শিকার ১২ জন, শারীরিক আঘাত ও নিপীড়নের শিকার ১২ জন এবং নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ৪ জন। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ১৩ জন গৃহকর্মী নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এঁদের মধ্যে চারজন নিহত হয়েছেন। নিহত গৃহকর্মীদের মধ্যে তিনজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুজন।

 

এই গৃহকর্মীরা যাদের বাসায় কাজ করেন তারা অধিকাংশই শিক্ষিত আর উচ্চ অথবা মধ্যবিত্ত। কিন্তু শিক্ষার আলো তাদের মানসিক উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বর্তমানে সমাজে দাসপ্রথা উঠে গেলেও গৃহশ্রমিকদের সঙ্গে অনেক বাড়িতেই যে আচরণ করা হয়, তা দাসপ্রথার বর্বরতার সাথে তুলনা করা যায়। গৃহশ্রমিকরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে। তাদের কোন নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টা থাকে না। সাধারণত রান্নাঘরে বা ডাইনিং রুমে তাদের শোয়ার ব্যবস্থা থাকে। তাদের খাবারও দেওয়া হয় নিম্নমানের। তার ওপর অকথ্য বকাঝকা, শারীরিক মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ এগুলো সহিংসতা তো আছেই।

 

২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা আইন অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। নীতিমালায় গৃহকর্মীদের সুবিধার জন্য হেল্প লাইন চালুসহ ১৪ বছরের নিচে কাউকে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তাদের শ্রমঘণ্টা এবং বেতন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করার মতো অধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হয়। নীতিমালা অনুমোদন পাওয়ায় শ্রম আইন অনুযায়ী গৃহকর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। গৃহকর্মীদের নির্যাতন করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা নেবে।

 

কিন্তু আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নেই। প্রতিবছরই গৃহকর্মীরা এভাবে বাড়ির সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গৃহকর্মীদের দিকে নজর দেয়ার সময় এখনই। আমাদের সবার উচিত এবিষয়ে সোচ্চার হওয়ার। আইনি তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আশেপাশে এমন কোন গৃহকর্মী নির্যাতনর ঘটনা দেখলে দ্রুত এর একশন নিতে হবে। তবেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব হবে। প্রতিবছর ১৬ জুনকে ‘আন্তর্জাতিক গৃহশ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালনও করা হয়।

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ