Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর প্রাত্যহিক জগতের বিষণ্ণতার কবি সিলভিয়া প্ল্যাথ

সিলভিয়া প্ল্যাথ


‘প্রতিটি নারীই একজন ফ্যাসিবাদীকে পূজা করে,
মুখ মাড়ানো সেই জুতাকে, সেই নিষ্ঠুরকে
নিষ্ঠুর হৃদয় তোমার মত এক পশুকে।’

সিলভিয়া প্ল্যাথের ‘বাবা’ কবিতার এই লাইনগুলো দেখলে কোনো বিদ্রোহের সুর লক্ষ্য করা যায়? বরং, আমরা দেখতে পাই বিষাদ। সেই বিষাদের আড়ালে কিছুটা বিদ্রোহের সুর আছে, সেটা অবশ্য অতীতের সাথে। কবির হৃদয়ের ভাবনাগুলো যখন শব্দের আকারে ফুটেওঠে, তখন সেখানে অনুভূতির ছোঁয়া থাকবেই। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নারী সাহিত্যিকের অভাব নেই। তবে খুব সামান্য নারীই নিজেকে সেরাদের কাতারে পৌঁছাতে পেরেছেন।

১৯৩২ সালের বোস্টনের ম্যাসাচুসেটসে সিলভিয়া প্ল্যাথের জন্ম। মাত্র আট বছর বয়সে বোস্টনের বিখ্যাত হেরল্ড পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। ফলে ভবিষ্যতে তিনি আমেরিকার সাহিত্যজগতে একজন সব্যসাচী নারী লেখিকা হিসেবে প্রতিভার সাক্ষ্য রাখবেন, সেটা আসম্ভব কিছুই নয় অবশ্যই। পনেরো বছর বয়সেই চিত্রশিল্পের জন্যে তিনি দ্য স্কলাস্টিক আর্ট অ্যান্ড রাইটিং অ্যাওয়ার্ড পান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর শিল্পমানস অন্যদের সুখী করেছে। অথচ এই শিল্পের জগতই যেন বিষাদ ছিল সিলভিয়ার।

কবিতার বন্ধুরপথে নারীদের প্রবেশ বরং আরো কঠিন। কিন্তু সিলভিয়া প্ল্যাথের কবিতায় অতীত বারবার ফিরে আসে। এই অতীতের বঞ্চনা, গ্লানি আর বিষাদ থেকেই লিখেছেন আঘাতের পদ্য। কবি সৌন্দর্যের পূজারী। অথচ সিলভিয়া প্ল্যাথ বলে গেছেন মৃত্যুর কথা। আধুনিকতার জনক ব্যোদলেয়ার নিজেও মৃত্যুতে শান্তি খুঁজে বেড়াননি। এ-জন্যেই সিলভিয়া প্ল্যাথ বিশ্বসাহিত্যে স্থান গড়ে নিয়েছেন।

এক রূপসীর মুখে এমন বিষণ্ণতা কি মানায়? এই বিষাদের জন্ম অবশ্য শৈশব থেকেই। সিলভিয়ার শৈশবের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বাবার হাতে। অধ্যাপক বাবা সব সময় মেয়েকে কঠোর শাসনে রাখতেন। এই কঠোর শাসন তাঁর মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল কি? সেই কথাই যেন তাঁর কবিতায় ছিল:
 
’আমি তোমাকে সব সময়ই ভয় পেতাম,
তোমার যুদ্ধবিমান, সেই গোয়েবলীয় প্রচার
মুখে আঁটা পরিপাটি একজোড়া গোঁফ,
সেই আর্য চোখ, ভীষণ নীল
পাঞ্জার ম্যান, পাঞ্জার ম্যান, ওহ! তুমি!’

যা-হোক, মেধাশক্তিতে এই যন্ত্রণা কখনই কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি। ১৯৫০ সালেই তিনি স্মিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনও মোটেও সুখের ছিল না তাঁর। কিন্তু ১৯৫৫ সালে ইচ্ছের জোরে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সিলভিয়া পরিশ্রম থামিয়ে দিতেন না। বরং পরিশ্রমের কারণে তাঁর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ আসে। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনই সিলভিয়ার সবচেয়ে বিষাদগ্রস্ত সময়। সারা দিন বিষণ্ণতায় ভোগা এক মানসিক ব্যধির মতো আকড়ে ধরেছিল সিলভিয়া প্ল্যাথকে। ভাবলেন এই অর্থহীন পৃথিবী থেকে মুক্তি পেতে হবে। না হলে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি নেই। স্মিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি। মৃত্যু হয়তো অনেকের জন্যে এত সহজ না। 

‘বিদায় পথে দেবদূত এবং মন্দজনে
নির্মিলিত নয়নে দেখি ধরণী যেন মৃত্যুগ্রাসে
অলীক সুখের প্রত্যাশায় বলেছিলে থাকতে অপেক্ষাতে।’

এই বিষণ্ণতা আসলে কিসের, আশ্রয়ের? এমন সময় সিলভিয়া কিছুটা শান্তির জন্যে কবি টেড হিউজের সাথে জোট বাঁধেন। এই সম্পর্ককে সার্থক করতেই দুজনের ঘরবাঁধা। সুখের সংসার। দুটি ফুটফুটে সন্তান। কিন্তু এই আনন্দময় সংসারও কেন যেন টিকতে পারেনি। ১৯৬২ সালেই মাত্র ছয় বছর পর দুজন আলাদা হয়ে যান। অনেকে এই ভাঙনের জন্যে সিলভিয়াকে দোষারোপ করেন। এই বিষণ্ণতা আর কত? আবার কেউ বলেন হিউজ মোটেও দায়িত্বশীল ছিলেন না। প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো অবিশ্বাস আর স্নেহের অভাব তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছিলো।

১৯৬৩ সালে সিলভিয়া প্ল্যাথ একটি উপন্যাস প্রকাশ করেন। ‘The Bell Jar’, তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলেই অনেকে ধরে নেন এটাকে। এখানেই এক অনুভূতিপ্রবণ মেয়ের গল্প আমরা পাই।

অবশেষে সিলভিয়াকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতেই হয়েছিল। সেই আত্মহত্যার ঘটনা নিয়েও অসংখ্য ধোঁয়াশা। মৃত্যুর আগে ডায়রিতে তাঁর নোট ছিল, ‘আমি ঠিকঠাক ভাবতে পারিনি। না পেরেছি বলতে কিংবা লিখতে। যন্ত্রণার আগুনে পুড়ে অঙ্গার হতে পারিনি। এবার বাকি নিজেকে শেষ করে ফেলা। দায়িত্ব সর্বনাশা, যেন এক ভয়াল রাক্ষস। বরং ফিরে যাই মাতৃজঠরের সেই প্রবল নিরাপত্তার বেষ্টনীতে। ভাসমান আনন্দিত অস্তিত্বেই বরং সুখ।’ 

সিলভিয়া প্ল্যাথ ঠিক এখানেই আমেরিকান সাহিত্যে এক অনন্য নজির। নারীর দায়িত্ব তার মুখ বেঁধে রাখে। হয়তো সে অত্যাচারের মুখোমুখি হয়নি। হয়তো তার জীবন ভীষণ স্বাভাবিক। তবু নারীকে প্রবল শাসনের মুখোমুখি থাকতে হয়। সিলভিয়া প্ল্যাথ যেন নারীর সেই বিষণ্ণ জগতকেই ডেকে এনেছেন। তাঁর কবিতায় ইয়েটস, মারিয়ান মুরের প্রভাব লক্ষণীয়। অসংখ্য চিত্রকল্প তাঁর কবিতাকে করে তুলেছে বিষাদময়।

সিলভিয়ার অস্থির জীবন-যাপনের এক চমৎকার চিত্রই যেন তাঁর কবিতায়। সচেতনভাবে তিনি প্রাত্যহিক জীবনের ব্যবহার্য অনেক জিনিস নিয়ে এসেছেন কবিতার ভাষায়। আচমকা চলে আসা অতিথি, অপ্রত্যাশিত শারীরিক আঘাত, কালশিটে কিংবা বিষণ্ণ রান্নাঘর। এ-সব জায়গাতেই নারীদের বিচরণ ও আনাগোনা।

সিলভিয়া প্ল্যাথ যেন সেই জগতেরই ছিলেন। একদম কল্পনার জগতে ফিরে যাননি। নারীর বাস্তবিক অবস্থানকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর কবিতা কতটুকু সমাদৃত, তা জানা নেই। তবে এখন হয়তো অনেকেই সিলভিয়া প্ল্যাথকে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।