Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নেলি ব্লাই: ‘অ্যাসাইলামে দশ দিন’

নেলি ব্লাই

‘টেন ডেজ ইন দ্য ম্যাডহাউজ’ মুভিটি যারা দেখেছেন, তারা ঠিকই নেলি ব্লাইকে চিনতে পারবেন। ব্ল্যাকওয়েল আইল্যান্ডের এক পাগলাগারদে মানসিক রোগীদের প্রতি কেমন অবিচার করা হতো, তা উদঘাটনের জন্য তিনি যে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সাংবাদিকতার ইতিহাসে সত্যিই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এমন গল্প নিয়ে যখন খোদ হলিউডই বসে থাকেনি, সেখানে নেলি ব্লাইয়ের গল্প না জানাটা বোধ হয় অন্যায়।


পুরো নাম এলিজাবেথ কোচরান। ১৮৬৪ সালে পেনসিলভেনিয়া  পিটসবার্গের শহরতলিতে জন্ম। বেশ অল্প বয়সেই নিজের সাংবাদিক-জীবনের শুরু করেন নিলি। ১৮৮৫ সালে তিনি প্রথম লেখালেখি শুরু করেন। এক স্থানীয় পত্রিকা প্রায়ই নারী-বিদ্বেষী সংবাদ প্রকাশ করে। তাই তিনি ছদ্মনামে দ্য ‘পিটসবার্গ ডিসপ্যাচ’ নামের এক স্থানীয় পত্রিকায় লেখা পাঠান। ভাষার ওপর দখল দেখে পত্রিকার প্রকাশক, তাঁর পরিচয় উদ্ঘাটনে নেমে পড়েন। এ-ভাবেই কোচরান ডিসপ্যাচের জন্য লেখালেখি শুরু করেন। সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী কোচরান একটি ছদ্মনাম ধারণ করেন। সেখান থেকেই তাঁর নাম নেলি ব্লাই হয়ে ওঠে। স্টিফেন ফস্টারের জনপ্রিয় গানের চরিত্র এই নেলি ব্লাই।

মূলত, নারী-বিষয়ক খবরগুলো নিয়েই নেলিকে কাজ করতে হতো। সে-জন্য তাঁকে প্রায়ই অনুসন্ধানে নেমে পড়তে হতো। ম্যাক্সিকোতে ছয় মাস কাটিয়ে একবার নেলি স্বৈরশাসক পোরফিরিও দিয়াজের ব্যাপারে খবর প্রকাশ করেন। ১৮৮৭ সালে নেলি নিউইয়র্কে চলে আসেন। এসেই অবশ্য চাকরি পেলেন না। কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় তিনি ‘নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড’ নামের এক পত্রিকায় কাজ জুটিয়ে নিলেন।

জোসেফ পুলিতজারের এই পত্রিকা আকর্ষণীয় খবর ছাপাত। সে-জন্যে পত্রিকার কাটতি ছিল ভালোই। এ-ছাড়া, এই পত্রিকা কিছু রোমহর্ষক খবরও প্রকাশ করত। ব্লাইয়ের জন্যে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। মাত্র তেইশ বছর বয়সে হয়তো সাংবাদিক হওয়া বেশ চমৎকার ব্যাপার। কিন্তু নিউ ইয়র্কে তখন অনেক নারী রিপোর্টার ছিল। নিজেকে তুলে ধরার আশায় নেলি এক অদ্ভুত কাজ হাতে নিলেন। অদ্ভুত, একই সাথে বিপজ্জনকও। ব্ল্যাকওয়েল আইল্যান্ডের এক পাগলাগারদের ওপর রিপোর্ট করবেন। এই দ্বীপকে অনেকে রুজভেল্ট আইল্যান্ড বলেও ডাকে। এই জায়গায় অনেক প্রতিষ্ঠান ছিল: দরিদ্রদের আবাসস্থল, ছোঁয়াচে রোগের হাসপাতাল এবং পাগলাগারদ।

ব্লাইয়ের এডিটর বললেন, তিনি যেন দশ দিন সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট করেন। বাস্তবিক অবস্থায় কাজ করার ঝুঁকির বিষয় তো আছেই, ব্লাই তবু তা নিয়ে চিন্তিত না। একটি ছদ্মনাম ধারণ করে তিনি ব্ল্যাকওয়েল আইল্যান্ডের এক বোর্ডিং হাউজ ভাড়া করলেন। এবার নিজেকে মানসিক রোগী প্রমাণ করতে হবে। পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে তিনি অধিকাংশ সময় হল, কিংবা রাস্তায় একা একা দিশেহারা হয়ে ঘোরাঘুরি করতেন। পারতপক্ষে ঘুমাতেন না এবং হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন। এমনকি নেলি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মধ্যে এক ধরনের বিপর্যস্তভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় রত থাকতেন।

কয়েক দিন পরেই বোর্ডিং হাউজের মালিক পুলিশ ডেকে আনলেন। পুলিশকে ব্লাই জানালেন, তাঁর অ্যামনেশিয়া আছে। নিজের পরিচয় দিলেন এক কিউবান ইমিগ্র্যান্ট বলে। এবার ব্লাইকে বেল্যুয়েভ হাসপাতালে পাঠানো হলো। এখানেই নেলিকে সহ্য করতে হবে অস্বাভাবিক যন্ত্রণা। হাসপাতালের কয়েদিদের সেখানে পচে যাওয়া খাবার দেওয়া হতো। এমনকি থাকার জায়গাকেও স্বাস্থ্যকর বলা যাবে না। সেখানে ব্লাইয়ের ডিমেনশিয়া এবং অন্যান্য মানসিক সমস্যা ধরা পড়ে। এবার তাঁকে ইস্ট রিভার অর্থাৎ ব্ল্যাকওয়েল আইল্যান্ডে পাঠানো হলো।

ব্ল্যাকওয়েল আইল্যান্ডের পাগলাগারদ। এই পাগলাগারদ নির্মাণ করা হয়েছিল ১০০০ জন রোগীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। অথচ তখন সেই পাগলাগারদে অন্তত ১৬০০ রোগী ছিল। তত দিনে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ অর্থ অনেক কমে গেছে। তাই স্বাস্থ্যসেবাতেও কিছুটা কাটতি করা হয়েছে। রোগীদের দেখভালের জন্য মাত্র ১৬ জন ডাক্তার। এই পাগলাগারদে যেন কৌতূহলীদের আগমন ঘটত। চার্লস ডিকেন্সের মতো লেখকও এখানে মাঝে-মধ্যে ঘুরে যেতেন। ডাক্তার ও কর্মচারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ছিল না। তাই তারা রোগীদের কিভাবে সামলাতে হয়, তা বুঝত না। উলটো রোগীদের সাথে বাজে ব্যবহার করা হতো। শারীরিক নির্যাতন ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।

ব্লাই সেখানে কিছু পাগলের সাথে সখ্য গড়ে তোলেন। রোগীদের জোর করে বরফ-পানিতে গোসল করানো হতো এবং ভেজা পোশাকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেখে দেওয়া হতো। ফলে অন্যান্য রোগ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। চেয়ারে তাদের একটানা বারো ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হতো। এই সময় অন্য কারো সাথে কথা বলা ছিল একেবারে নিষেধ। খাবারের মান নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। অভিযোগ করলে উলটো মার খেতে হতো। ব্লাই এমনকি স্টাফদের কাছে যৌন নিপীড়নের হুমকিও পেয়েছিলেন। 

সব চেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অ্যাসাইলামের অধিকাংশ রোগীই পাগল না। মূলত, এরা অভিবাসী, যাদের অধিকাংশই নারী। আইনের কবলে পড়ে আজ তাদের এই পরিণতি। এখানে আসার আগে অনেকেরই মানসিক রোগ ছিলো না। বরং পাগলাগারদের অত্যাচারে অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে।
 
ব্লাই ছদ্মবেশ অন্য এক রিপোর্টারের বদৌলতে প্রায় উড়ে যেতে নিয়েছিল। ভাগ্য ভালো, ব্লাই কোনো মতে টিকে ছিলেন। দশ দিন পর তাঁর এডিটর সেখান থেকে তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করেন। সেখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করেন। প্রথম কিস্তির লেখাই আলোড়ন সৃষ্টি করে। আস্তে আস্তে এই সিরিজ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নেলির লেখা প্রকাশ হওয়ার এক মাস পর গ্র্যান্ড জুরি প্যানেল তদন্তের জন্য সেই পাগলাগারদ পরিদর্শন করেন। কিন্তু স্টাফরা প্রস্তুতই ছিলেন। তত দিনে পাগলাগারদ পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। এমনকি ব্লাইকে যারা খবরাখবর বা অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। স্টাফরা ব্লাইকে মিথ্যাচারী দাবি করেন।

এত কিছু সত্ত্বেও গ্র্যান্ড জুরি নেলির পক্ষেই ছিলেন। এত দিন এই বিভাগে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা চলছিল। এই ঘটনার পর অন্তত ১ মিলিয়ন অর্থ বরাদ্দ করা হয়। এখনকার দিনের হিসেবে তা অন্তত ২৪ মিলিয়নের কাছাকাছি। নির্যাতন করে এমন স্টাফদের বের করে দেওয়া হয়। এমনকি অভিবাসীদের কথা বোঝার জন্যে অনুবাদক ভাড়া করা হয়।

এ-ভাবেই নেলি সমগ্র বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এর কিছু দিন পর আবার নেলি ব্লাইয়ের নাম উঠে আসে। জুল ভার্নের বিখ্যাত ‘এরাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’-এর ভ্রমণ তিনি শুরু করেন। এক সপ্তাহে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে তিনি আবার প্রশংসা কুড়ান। ফিরেই তিনি এক ধনী ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন। কিন্তু লেখালেখিতে দ্রুতই ফিরে আসেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফরেন করেসপন্ডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯২২ সালে মৃত্যুর আগেও সাংবাদিকতা চালিয়ে যান।

বিলির সাফল্য বহু বই, নাটক এমনকি চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৯০ সালেই পৃথিবী প্রদক্ষিণের একটা বোর্ড গেম মুক্তি পায়। সেখানে ব্লাই নামটা স্মরণীয় করেই রাখা। এখনো পৃথিবীতে তার সাংবাদিকতার প্রতি সততা অনেক মানুষকেই অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলে।

  • আফরিদা ইফরাত

অনন্যা/এআই