Skip to content

২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মেন্সট্রুয়াল কাপ ও নারীবাদ 

ঋতুচক্র  নারী দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক প্রক্রিয়া যা সন্তান ধারণ অর্থাৎ বংশ রক্ষার মুল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। আর তাই প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষায় ঋতুচক্রের পরিচর্যা অতন্ত্য জরুরি।  আমাদের  দেশে অধিকাংশ মেয়েরাই তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মাসিকের সময়ে পরিচ্ছন্নতা বা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তেমন সচেতন নয়। কিন্তু  এই সময়ে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে  সচেতনতা তৈরি করা অতীব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই পিরিয়ডের সময় কাপড়,  তুলা বা একই প্যাড দীর্ঘ সময় ব্যবহার করে থাকেন যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।  পিরিয়ডের সময় এসব অস্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা এড়াতে মেন্সট্রুয়াল কাপ একটি অভিনব জিনিস। 

তবে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মেয়েদেরই এখনও মেনস্ট্রুয়াল কাপের ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। অনেকে এটি ব্যবহার করতে ভয় পায়, বা কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটাও বুঝতে পারে না। মাসিক কালীন পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনায় মেনস্ট্রুয়াল কাপ কিভাবে কাজ করে, ব্যবহারের নিয়ম ও এর সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে জেনে নেই চলুন। 

 

 

মেন্সট্রুয়াল কাপ কি?

এটি মূলত ফানেলের মতো আকৃতির মেডিক্যাল গ্রেড সিলিকনের কাপ। যা ভাঁজ করে যোনিপথ দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং ভেতরে যেয়ে সেটা প্রসারিত হয়ে জরায়ু মুখে আটকে যায়। মেনস্ট্রুয়াল কাপ স্যানিটারি প্যাডের মতো মাসিকের রক্ত শুষে নেয় না, বরং এটি কাপের মধ্যে রক্ত স্টোর করে বা জমিয়ে রাখে। হেভি ফ্লো চললে নির্দিষ্ট সময় পরপর এই কাপটি বের করে পরিষ্কার করে নিতে হয়। কিন্তু প্যাডের মতো বার বার পাল্টানোর প্রয়োজন হয় না। মাসিকের সময় একজন নারীর দিনে গড়ে ২৫-৩০ মিলি ঋতুস্রাব হয়, আর কাপের ফানেলের ধারণ ক্ষমতা  প্রায় ৬০ মিলি রক্ত! মানে এটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোনোরকম ইরিটেশন বা অস্বস্তি ছাড়াই পিরিয়ডের রক্ত জমিয়ে রাখতে পারে। মেনস্ট্রুয়াল কাপ প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে , সঠিকভাবে  ব্যবহার ও সংরক্ষণ করলে একটি কাপ আপনি ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। 

 

 

মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে সতর্কতা 

 

প্রথমে সঠিক সাইজের কাপ নির্বাচন করতে হবে। সেক্ষেত্রে  আপনার বয়স, ভ্যাজাইনার গঠন এবং সন্তানধারণ করেছেন কি না এসব বিষয় বিবেচনা করে সাইজ নির্ধারণ করতে হবে। কেননা সন্তানের জন্ম দিলে ভ্যাজাইনার পেশি শিথিল হয়ে যায়, তখন বড় সাইজের কাপ ব্যবহারের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। আবার কিশোরীদের জন্য আলাদা মাপের কাপ ব্যবহার করতে হবে। যাদের জরায়ুতে ইনফেকশন  থাকে, তাদের  এটি ব্যবহার না করাই ভালো। হেভি ফ্লো বা স্বাস্থ্যগত কোন সমস্যা আছে কি না সেটাও এক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে। মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করা অবশ্যই নিরাপদ। আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী হওয়ায় উন্নত দেশগুলোতে এটির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তারপরও ব্যবহারে আগে এই ব্যাপারে অবশ্যই  বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। অবশ্যই কাপের কোয়ালিটি, তৈরিকৃত  উপাদান, মেডিক্যাল গ্রেড কি না এগুলো খুব ভালোভাবে জেনে তারপর ব্যবহার করতে হবে।

 

 

বে ব্যবহার করবেন 

 

প্রথমবার ব্যবহারের সময় একটু অস্বস্তি হলেও অভ্যস্ত হয়ে গেলে নিশ্চিন্তে পিরিয়ডের সময়টা কাটানো যাবে ! প্রথমে কাপের খোলা মুখটি উপরে রেখে নীচের অংশ শক্ত করে ধরে যোনিপথে ঢুকিয়ে দিতে হবে। কাপটি আলতো করে সি (C) শেইপে ভাঁজ করে নিতে হবে। ঢোকানোর পর ছাতার মতো খুলে গিয়ে কাপটি আপনাআপনি  আটকে যাবে ভেতরে। তারপর ঘুরিয়ে সেটির মুখ আটকাতে হবে, যাতে ঋতুস্রাবের রক্ত বাইরে না বেরিয়ে আসে।এতে লিকেজ বা জামাকাপড়ে রক্ত লেগে যাওয়ার ভয় থাকবে না, বার বার প্যাড পাল্টানোর ঝমােলাও থাকবে না! টানা ৮ ঘণ্টা ব্যবহার করার পর আস্তে করে টেনে খুলে নিয়ে ব্লাড পরিষ্কার করে নিতে হবে। তবে পিরিয়ডের ফ্লো কেমন সেটার উপর নির্ভর করে ব্যবহার নির্ধারণ করতে হবে। 

 

 

যেভাবে সংরক্ষণ করবেন 

 

প্রতিবার পিরিয়ডের শেষে এটিকে গরম পানিতে ভালোভাবে ফুটিয়ে নিন। এরপর মুছে নিয়ে তুলে রাখুন। জীবাণুমুক্ত রাখতে এটি শুকনো জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যবহারের সময় অবশ্যই পরিষ্কার হাতে  কাপটি খুলতে, পড়তে এবং ধরতে হবে। কারণ হাত থেকেও  জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। তাই সবসময়ই হাইজিন নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

তবে এত সুবিধা ও সহজ হওয়া সত্ত্বেও মেন্সট্রুয়াল কাপের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান।  কেননা আমাদের সমাজে এখনো পিরিয়ড নিয়ে নানান কুসংস্কার প্রচলিত আছে। খুঁজে দেখলে এখনো এমন অনেক অঞ্চল পাওয়া যাবে যেখানে মেয়েদের পিরিয়ড হলে সাতদিন সূর্যের আলো অবধি গায়ে লাগতে দেয় না। অথচ এই পিরিয়ড শুধু নিষিক্ত হতে না পারা ডিম্বাণু মাসর একটা নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে আসা ছাড়া আড় কিছুই না।  তাও এই সহজ বিষয়টাকে আমরা এখনো সহজ করে নিতে পারিনা। এরপর এমন অভিনব জিনিসের ব্যবহারকে প্রচলিত করা যেন এক প্রকার অপরাধ মূলক কাজ। কারণ এক শ্রেণির মানুষ এমন ধারণা নিয়ে আছেন যে মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে নারীদের ভার্জিনিটি নষ্ট হবে। নারীবাদীরা মেয়েদের নষ্ট করার জন্য এমন প্রচারণা করছেন। অনেকেই বলবেন মা খালারা তো এসব ব্যবহার করেননি তারা কি মারা গেছিলেন? তবে কথা হচ্ছে আমাদের মা খালারাও এমন জরায়ুজনিত নানা সমস্যায় ভুগেছেন। কেউ জ্ঞানের অভাবে, কেউ লজ্জায় সেসবের সঠিক উদ্যোগ নেয়নি। তাই এই সময়ে এসে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারকে প্রচলিত করতে হবে। এতে শারীরিক তো বটে মানসিক স্বস্তিতেও পিরিয়ডের দিনগুলো কাটানে সম্ভব।