Skip to content

২৯শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ১৫ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

একটু খানি সুখ

কৈ রে। জলদি খাবার দে।

সখিনা চুপ করে বসে আছে। কাসিম আবার বললো, ‘শুনতে পারছিস না?’ খাবার চাইছি।

সখিনা উত্তর দিলো, ‘কোথা থেকে খাবার দেবো? আজ সাতদিন তুমি কোনো কাজে যাও নাই। ঘরে একমুঠো চালও নাই। আমি কিভাবে তোমার মুখে ভাত তুলে দেই, তুমি কী জানতে চেয়েছ কোনো দিন? যা দু’পয়সা আয় করো, তা দিয়ে গাঞ্জা গিলতে চলে যায়। আবার সময়মতো ভাত চাইতে আইছো। লজ্জা করে না তোমার? ঈদের আর দুই দিন মাত্র বাকি।ছেলে-মেয়ের একটা নতুন জামা দেওয়ার কোনো মুরদ হয়নি তোমার।। আমার হয়েছে যত জ্বালা, এই বলে সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। কাসিম লাল টকটকে চোখজোড়া গোল্লা করে বললো, একমুঠো ভাত দিস বলে তোর গায়ে এত জ্বালা? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা! এই বলে থালা-বাটি-ঘটি ফেলে দিলো উঠানে।

কাসিমের দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে সাজুর বয়স দশ বছর, ছোট ছেলে রাজুর বয়স সাত বছর। আর মেয়ে মিলির বয়স চার বছর। সাজু পেটে-ভাতে থাকে একটা গ্যারেজে। কাসিমের বউ সখিনা কাজ করে পরের বাড়িতে। কাসিম একদিন রিকশা চালালে তিন দিন বসে বসে তাস খেলে, গাঁজা টানে। সংসারের কোনো খোঁজ-খবর রাখে না। বউটা সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। নিজে না খেয়ে মালিকের বাড়ির ভাত এনে সবাই মিলে ভাগ করে খায়। রাজু আর মিলি সারাদিন ক্ষুধার্ত পেটে বসে থাকে মায়ের পথের দিকে।কখন আসবে মা। কখন একমুঠো ভাত খেতে পারবে।

ঝগড়া শুনে এলেন পাশের বাড়ির সাহানা ভাবি। খুবই অমায়িক। শিক্ষকতা করেন। সময়ে-অসময়ে তাদের সাহায্য করেন। ছোট ছেলেমেয়ে দুটোকে পড়িয়ে দেন। তিনি দু’এক পা ফেলতে ফেলতে সখিনার উঠানে এসে দাঁড়ালেন। সখিনাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে সখিনা?’ থালাবাটির এই হাল কেন? সখিনা উত্তর দিলো, কী আর বলবো আপা। সবই আমার কপালের দোষ। তা না হলে এমন স্বামী কপালে জুটবে ক্যান? কোন পাপের শাস্তি আল্লায় আমায় দিছে কে জানে। এর চেয়ে মরণও ভালো। আর সইতে পারি না আপা।


সাহানাকে দেখে কাসিম ঘরের ভেতর চুপ করে রইলো। কাসিমকে সাহানা জিজ্ঞাসা করলো, ছেলে-মেয়ের জন্য কী কাপড় কিনেছ কাসিম? কাসিম কোনো উত্তর দিলো না। ছকিনা বললো, সে কপাল কি ওরা করে আইছে? বাবার হাতের জিনিস পরার? এ জীবনে আমার কিছু দেই নাই, আবার ছেলেমেয়ে! 

এমন সময় সাজু কাজ সেরে বাড়ি ফিরলো। সাজুর মালিক সাজুকে প্রতিদিন বিশ টাকা করে দেয়। সাজু দশ টাকা নিজের জন্য খরচ করে। আর দশ টাকা মাটির ব্যাংকে জমা রাখে। সেটা পরিবারের কাউকে জানায় না।সাজু ভাবলো,ব্যাংকটা ভেঙে দেখবো ঈদে সবার জন্য কিছু কিনতে পারি কি না। গত বছর ঈদের পর থেকে এই টাকাটা খুব কষ্ট করে রেখেছে। মাঝে মাঝে কোনো কাস্টমার কাজের জন্য খুশি হয়ে বকশিস দিলে সাজু তা খরচ না করে ব্যাংকে জমা রাখে। সে কাউকে কিছু না বলে পরের দিন সকালে মাটির ব্যাংকটা প্যাকেটে করে গ্যারেজে নিয়ে গেলো।


মাটির ব্যাংকটা ভেঙে টাকাগুলো গুনলো সাজু। চার হাজার আশি টাকা। তার চোখদুটো খুশিতে চকচক করে উঠলো। মায়ের কথা ভাবতেই সাজুর চোখ থেকে পানি পড়লো। আহারে, মা আমার কত কষ্ট করে খাওয়ায়। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। বাপটা যে কী! মায়ের কোনোদিন একটু সুখ দিতে পারলো না। আজ প্রথম সে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনলো।শাড়িটা বুকের সঙ্গে ধরে খুশিতে কেঁদে ফেললো। মনে মনে বললো,মা তোর সাজু কোনোদিন তোকে কষ্ট দেবে না। বাপ দেখে না তো কী হয়েছে,? আমি তো আছি। আর কয়টা বছর দেরি কর। আমি আর একটু বড় হলে, তোকে আর পরের বাড়ি কাজ করতে দেবো না মা। সে বাপের জন্যও একটা পাঞ্জাবি, ভাইয়ের জন্য জামা, আদরের বোন মিলির জন্য লাল ফ্রক, জুতা, ফিতা, রেশমি চুড়ি, মেহেদি কিনলো। সেমাই, চিনি, মুরগি সব কিনলো। এদিকে সখিনা ভেবে অস্থির। কান্নায় বুকটা তার খান খান হয়ে যাচ্ছে। রাত পোহালেই ঈদ। ছেলে-মেয়ের মুখে কিছুই তুলে দিতে পারবে না। জামাকাপড় তো দূরের কথা। একটু সেমাইও না। এমন সময় সাজু মা মা করে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকলো।


সাজুর হাতে অনেক জিনিসপত্র দেখে সখিনা অবাক হয়ে গেলো। সাজুকে বাজান বলে ডাকে। সখিনা জিজ্ঞেস করলো, বাজান তোর হাতে এত সব কী? সাজু হাসিমুখে মায়ের হাতটা ধরে কাছে বসালো। শাড়িটা বের করে মাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর একে একে সবার জামাকাপড় বের করে দিলো। এত টাকা কই পাইছোস বাজান? সাজু সব কথা খুলে বলল। সখিনাও ছেলেকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বললো, বাজান রে তোর মতো ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার। খুশিতে সাজুর চোখে, মুখে, কপালে চুমু খেতে খেতে বললো, আল্লাহ আমার বাজানরে আমার মাথায় যত চুল তার চেয়ে বেশি হায়াত দিক। রাজু, মিলি খুশিতে ডগমগ হয়ে গেলো। এমন খুশির দিন সাজু এর আগে কখনো দেখেনি। মায়ের এই খুশি ভরা মুখখানা স্বর্গের চেয়েও দামি মনে হলো।

কাসিম ঘর থেকে বের হয়ে সাজুকে ধরে কেঁদে দিলো। সাজু বাবার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বাবাকে পাঞ্জাবিটা পরিয়ে দিয়ে বললো, আমার বাবাকে কত সুন্দর লাগছে। কাসিম সাজুকে বুকে ধরে বললো,আমি এবার থেকে কাজ করবো বাবা। তুই  আমার চোখ খুলে দিয়েছিস। আমাকে তোরা মাফ করে দে। ঈদের চাঁদ সেদিন সত্যিই সখিনার আঙিনাতে নেমেছিল। ওদের খুশির জোয়ার আকাশ বাতাসও মুখরিত ছিল। একটুখানি সুখ দিয়ে সেদিন কিনেছিল এক স্বর্গ পৃথিবী।

সাহানা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল খুশির বন্যা। নিজের অজান্তে  দু’ফোঁটা আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়লো সাহানার চোখ বেয়ে।