Skip to content

২০শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

মায়ের কথা

আমার মা ছিল অন্তর্মুখী, চাপাস্বভাব, নিজের মনে মনে কথা বলা মানুষ l ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে বাঁশখালী কোকদণ্ডী গ্রামে সরস্বতী পুজোর রাতে মামাবাড়িতে ডাকাত ঢুকলো l মায়ের মুখে যতদূর শুনেছি, দাদু ধীরেন্দ্রলাল দাশের জীবনটাও ছিল একটা উপন্যাস l

ছোটবেলায় বাবা মারা যায় l ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘর ছাড়া মা ছেলের সম্পদ বলতে কিছু আর ছিল না l সেই ঘরটিও হঠাৎ কোনকারণে আগুনে পুড়ে যায় l মনের দুঃখে দাদু একটা আশ্রমের চাতালে গিয়ে বসেছিল l এক সাধু কাছে এসে সবকথা জানতে পেরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছে, চিন্তা করিস না, পুড়ে গেলে উড়ে আসে l চারানা পয়সা দিয়েছিল দাদুকে, কিছু খাবার কিনে নিয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য l

দাদু মনের মধ্যে কিছুটা শক্তি ফিরে পেয়ে, বাড়ি ফেরার পথে খাবার না কিনে, এক গৃহস্থ পরিবার গাছ থেকে সুপুরি নামিয়ে আনছে দেখতে পেয়ে, চারানা দিয়ে কিছু সুপুরি কিনলো l হাটে গিয়ে সেই সুপুরি বিক্রি করলো l কিছু লাভ এলো l সেই পয়সা দিয়ে আবার সুপুরি কিনলো l হাটে গিয়ে বিক্রি করলো l

এই করতে করতে সুপুরি ব্যাপারী হয়ে উঠলো l ক্রমে একটা ব্যবসা থেকে অন্য একটা ব্যবসা l বাড়ি করলো l মায়ের কথা মতো একই পাড়ার পুকুরের এপার ওপার বিমলাকে বিয়ে করলো l সন্তান আসতে লাগলো, দাদু অনেক জমিজমা কিনে ছোটখাট একজন জমিদারে পরিণত হয়েছে তখন l

আমার মা ছিল দাদু দীদার অনেক সন্তানের মধ্যে অষ্টম গর্ভের সন্তান l তখন সম্ভবত জন্মনিরোধক কোনো পন্থা চালু না থাকায় অনেক সন্তান যেমন আসতো, সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক সন্তান মারাও যেতl আমার মা অষ্টম গর্ভজাত হলেও শেষপর্যন্ত চার বোন আর দুই ভাই বেঁচে ছিল l এই অষ্টম গর্ভজাত কথাটা মায়ের মুখে যতবারই শুনতাম, দেখতাম মুখটা কেমন বিষাদে ছেয়ে আছে l পৌরাণিক ধারণা থেকে মায়ের মনে হতো অষ্টম গর্ভের সন্তান, কখনো সুখী হয় না l

তবে আমার মাও জীবনে খুব একটা সুখী হতে পারেনি l সরস্বতী পুজোর রাতে আমার মা, প্রিয় বোনপো (বড়দির ছেলে )কে নিয়ে বাড়ির সদর দরজার ঘরটিতে শুয়ে ছিল l মাটির দোতলা বাড়ি l সাথে লাগোয়া দুটো পাকা ঘর বারান্দা তখন l ডাকাত এসেছে বুঝতে পেরে দাদু ছুটে এসে মা কে তৎক্ষণাৎ ছাদের ঘরে তুলে দিল l বোনপোটি কোন কারণে ছাদে যেতে পারলো না, খাটের তলায় লুকিয়ে পড়লো l

দরজা ভেঙে ডাকাত ঢুকে লোহার সিন্দুক থেকে সোনাদানা টাকাপয়সা সব তুলে নিল l বন্দুক হাতে ডাকাতের সামনে দাদু লাঠি হাতে একাই লড়ে যেতে লাগলো l শুনেছি লাঠি দিয়ে মেরে এক ডাকাতকে ধরাশায়ী করে ফেলেছে l পরবর্তীতে হাসপাতালে সেই ডাকাত মারা যায় l দাদুকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিল পাড়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রতাপ চক্রবর্তী l ডাকাতের গুলিতে মারা যায় l ডাকাতেরা ছাদের ঘরে খুব ওঠার চেষ্টা করেছিল l দীদা, মা, মামা, মাসীরা ওপর থেকে অ্যাসিড ছুঁড়ে ফেলেছে l দাদু গহনার ব্যবসাও শুরু করেছিল l বাড়িতে তাই গ্যালন ভর্তি সোনাগলানো অ্যাসিড ছিল l

নির্মম তাণ্ডব চালিয়ে সব লুঠ করে নিয়ে ডাকাত চলে যায় l ভোর থেকে পাকিস্তান সরকারের পুলিশ এসে বাড়ি ঘিরে ফেলে l দাদুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না l অনেক খোঁজাখুঁজির পর দুপুর নাগাদ টিনের চালের ওপর কোনো একটা অংশে গুলিবিদ্ধ লাশ ঝুঁকে থাকতে দেখা যায় l এই ঘটনা মায়ের মনে তীব্র প্রভাব ফেলে।

পিতৃশোক বুকে নিয়ে মা মেট্রিক পাশ করলো l একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সে বছর আই. এ পরীক্ষা দেবে l রাতে কখনো সখনো বাড়ি ফেরে l দিনে মুড়ি চিড়ে বেঁধে নিয়ে,ধানের মাঠে জলে জঙ্গলে পালিয়ে বেড়ায় l কখনো ভালো মুসলিম বন্ধুর বাড়ি গিয়ে থাকে l একসময় কোকদণ্ডী গ্রামের পশ্চিমে ইলসা গ্রামে, মামাদের খুব প্ৰিয় এক চাষার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয় l

গ্রামে পাকিস্তানী সেনা ঢুকে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিতে থাকে l লুঠপাঠ চালায় l মামাবাড়ির চারদিকে সব ছিল খড়ের চালা ছোট ছোট বেড়ার ঘর l সেই ঘর পোড়াতে পোড়াতে একটা অগ্নিক্ষেত্র তৈরী হয়ে যায় l শেষপর্যন্ত এই বাড়িতে এসে আর ঢোকেনা l কারণ তারাও জানতে পারে দুবছর আগে ডাকাতি হয়েছে, এই বাড়িতে তেমন কিছু সম্পদ আর নেই l তবে দুটো গোলা ভর্তি ধান ছিল, পাকিস্তানীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়াতে বড় মামা সেই ধান দিয়ে গ্রামের সবাইকে সাহায্য করতো l

এই ভয়াবহ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে মায়ের টাইফয়েড হলো l ঠিকমত চিকিৎসা পেল না l দীর্ঘ এক মাস অসুস্থ l সাথে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শব্দে মা চিরতরে বধির হয়ে উঠলো l

মায়ের এই বধিরতা পরবর্তী জীবনে মাকে তিলে তিলে ভোগাবে l পাশে কেউ কারো সাথে কথা বলছে, মা শুনতে পাচ্ছে না l মায়ের হয়তো মনে হচ্ছে, বোধহয় তাকে নিয়ে কেউ নিন্দে করছে l ইলেভেনে পড়ার সময় টিউশনির টাকা দিয়ে আমি মাকে একটা শ্রুতিযন্ত্র কিনে দিয়েছিলাম l তবে কানে ঠিক রাখতে পারতো না l

হাওড়া জেনারেল হাসপাতালে সাইক্রিয়াটিক বিভাগে নিয়মিত দেখাতে নিয়ে যেতাম, তখনও কান পরীক্ষা করে জেলা পরিষদ থেকে একবার একটা শ্রুতিযন্ত্র দেওয়া হলো l মা ব্যবহার করলো না l কানে শব্দ এলে মাথায় যন্ত্রনা হয় l

আমার জন্মের পর দুবার আমাদের ঘর পুড়ে যায় l বাবা ছোটখাট ব্যবসা করতো l বেড়ার ঘরে ভাড়া থাকতো l একবার আমাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেল, ফিরে এসে বন্ধ ঘরের তালা আর খুলতে হয়নি l সব ভস্ম l দ্বিতীয়বার আবার ভাড়া ঘর l বাবা বাইরে থেকে এল, মা চা করছে l অমনি রব উঠলো একই সারিতে দু তিনটা ঘর ছেড়ে আগুন লেগেছে l আমাকে কোলে নিয়ে মা বাবা দুজনেই এক কাপড়ে বেরিয়ে গেল l ছয় মাসের মধ্যে দুবার ঘর পুড়ে যাওয়া অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই কঠিন হয়ে পড়লো l

আমার মাতাল জ্যেঠু বারো ঘন্টা মদ খেয়ে থাকতো l বউ পেটাতো l জ্যেঠুর হাতেও বহুবার অত্যাচারিত হতে হয়েছে l বাবা মায়ের বিয়ের পাঁচ বছর পর আমার জন্ম l দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়াতে শশুরবাড়িতে অনেক কথা শুনতে হয়েছে l

পুজোর জন্য আমের পল্লব পেরে আনছে, অমনি একজন বলে বসলো, যে গাছে ফল হয় না, সেই গাছের পল্লব পুজোতে লাগে না l এই কথাটা মায়ের মনে তীব্র আঘাত আনলো l মা হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে l জ্যেঠু নাকি একবার বলেছে, মায়ের মুখ দেখে কেউ যাতে কাজে না বেরোয় l শুভ হবে না l পর পর তিনটি সন্তানের জননী হওয়ার পর, এরা অবশ্য সকলে অন্য রকম সব ছুঁতো খুঁজে খুঁজে বার করতো l এসব ঘরোয়া হিংসা মায়ের মনে খুবই প্রভাব ফেলতো l

আমার বাবা ব্যবসা করার নাম করে বারবার সবকিছু খুঁইয়েছে l মায়ের জমানো টাকা পয়সা বারবার নিয়ে গিয়ে ব্যবসাতে লাগাতো, সেই টাকা আর ফেরৎ আসতো না l আবার মায়ের হাতে জমানোর জন্য কখনো কোনো টাকা দিচ্ছে, তাও কোনদিন দেখিনি l মা তবু ঘরখরচের সামান্য টাকা থেকেই একটু একটু করে জমিয়ে রাখতো l

আসামের নওগাঁতে বাবার একটা ছোট্ট স্টেশনারি দোকান ছিল l সেই দোকানও বন্ধ হয়ে গেল l নাইন টেন থেকেই আমি বালিতে টিউশন পড়িয়ে নিজের খরচ সামলে নিতাম l ইলেভেন থেকে দেড়শো টাকা ভাড়াতে এক বন্ধুর বাড়ির ছোট্ট বেড়ার গুদামঘরটাতে একা থাকি l রান্না করে খাওয়া, ঘর ভাড়া, পড়ার খরচ সবই নিজের টিউশনির পয়সাতে l বছরে একবার করে আসামে যায়, মা জমানো কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দেয় l

মায়ের সামান্য কটি গয়না বিক্রি করা আর জমানো টাকা মিলে তিরিশ হাজার টাকা হলো l ৯৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার বছরে বালি আনন্দনগরে আমার স্কুলের কাছে দুকাঠা নিচু চাষের জমি পনেরো হাজার টাকা কাঠা দরে কিনে রাখলাম আমি l হাজার পাঁচেক টাকা রেজিস্ট্রি খরচ এবং অন্যান্য খরচ কিছুটা ধার করে জোগাড় করা হলো l

আসাম থেকে গোটা পরিবার আমার সেই ছোট্ট ভাড়া ঘরটিতে উঠে এল l মায়ের মধ্যে তখন থেকে দেখলাম মানসিক অসুস্থতা দেখা দিতে শুরু করেছে l এই ছোট্ট ঘরটা বাড়িওয়ালা ছেড়ে দিতে বললো l অন্য এক জায়গায় গিয়ে ঘর ভাড়া নিলাম, মায়ের অসুস্থটা বেড়ে চলেছে, হঠাৎ হঠাৎ চটে যায়, চিৎকার চেঁচামেচি, বাবার সাথে তুমুল ঝগড়া, কখনো কখনো ভিত্তিহীন কিছু কথাবার্তা বলে l আমি তখন ফাস্ট ইয়ারে পড়াশোনা ছেড়ে ngo তে চাকরি নিয়েছি l বাবা হাওড়া স্টেশনের বাইরে ষাট টাকা মজুরিতে ব্যাগ বিক্রি করে l এই বাড়িওয়ালাও বলছে ঘর ছেড়ে দাও l এদিকে মানসিক অসুস্থতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়াতে পাড়াতে কেউ আর ঘর ভাড়াও দেয় না l

মানকুণ্ডু মানসিক হাসপাতালে গিয়ে যোগাযোগ করি l কিন্তু ওরা ওখানে রেখে চিকিৎসা করার যে খরচ বলে, দেখলাম তা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব l একদিন গাড়ি ভাড়া করে কলকাতা নীলরতন হাসপাতালে সাইক্রিয়াটিক বিভাগে নিয়ে এলাম l চিকিৎসা শুরু হলো l ওষুধ খেয়ে সারাদিন শুধু ঘুমিয়ে থাকে, ঝিমিয়ে পড়ে l

এবার অন্য জায়গায় ঘর ভাড়া পাওয়া গেল l অবস্থা যা বুঝলাম, কেনা জমিতে বাড়ি করে না যেতে পারা পর্যন্ত সমস্যা মিটবে না l এই অসুস্থ অবস্থার মধ্যেও মা দেখতাম বালিশের ভেতরে লুকিয়ে লুকিয়ে টাকা জমাতো l আমাদের পরিবারে কখনো কারো কোনো ব্যাংক একাউন্ট ছিল না l বাবা যাতে না দেখতে পায়, বালিশের ভেতরে টাকা লুকিয়ে রাখাটা হয়ে উঠতো মায়ের ব্যাংক l

আমার মায়ের রান্নার হাত খুবই ভালো l তবে এই সামান্য টাকা দিন আনি দিন খায় পরিবারে ভালোমন্দ রান্নার কোনো উপায় ছিল না l মা রোজই জল জঙ্গল থেকে শাক লতা কচু তুলে এনে রান্না করতো l একটা ডিমকে চার ফালি করা হতো l মাছের মধ্যে আট দশ টাকাতে একটা সিলভার কাপ কিনে আনতাম l ওটাই হতো আমাদের ইলিশ l

মা এমনভাবে মাছটা কাটতো, আমাদের বাবা আর দুই ভাই একটু বড় টুকরো পেলেও, মা আর বোনের জন্য চিলতে টুকরো থাকতো l বোনকে কেন ছোট দেওয়া হবে, প্রতিবাদ করেও লাভ হতো না l চালের মধ্যে একেবারে মোটা দানার কম দামের চাল আনা হতো l

বাড়িওয়ালা আবার ঘর ছেড়ে দিতে বলছে, এবার তাই কেনা জমিতে ঘর করার সিদ্বান্ত নিলাম l মা কিছু জমানো টাকা বার করে দিল l এককাঠা জমিতে ছোট্ট একটা ভিত তৈরী করে, বাকি এক কাঠা থেকে মাটি কেটে কেটে উঁচু করা হলো l মাটি কাটার লোকেদের সাথে মা নিজেও এসে হাত লাগাতো l দুটো কুঁয়ো কোড়া হলো একটা জলের, অন্যটা পায়খানার l দুটোর কুঁয়োর মাটিও,ঘরের ভিত উঁচু করতে কাজে লাগলো l এরপর বেড়া লাগিয়ে ওপরে টালি l ঘর থেকে পায়খানা আর জলের কুঁয়ো পর্যন্ত দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো তৈরী হলো l বড় রাস্তা থেকে ঘর অব্দি যেতেও বাঁশের সাঁকো l

বাড়ি ভাড়া থেকে মুক্তি পেলাম l লোকের কথা শোনা থেকেও l মা এখানেও চিৎকার চেঁচামেচি করে,তবে চারদিক ফাঁকা থাকাতে অসুবিধা হয় না l মায়ের চট্টগ্রামের ভাষার কথা আশেপাশের অনেকে বুঝতেও পারে না l এতে একটা সুবিধা হলো, কথায় কথায় কারো সাথে ঝগড়া লাগে না l আমি গম্ভীর প্রকৃতির ছেলে, পাড়ার গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের কুড়ি তিরিশ টাকাতে পড়ায়, আমাকেও সকলে মাস্টারদা বলে ডাকে l যতদিন ঘনবসতি হয়ে ওঠেনি, মা কে নিয়ে তেমন সমস্যা হয়নি l

মানসিক সমস্যা থাকলেও গাছেদের সাথে মায়ের সখ্যতা বরাবরের l শীতকালে শিম গাছ, পুঁই গাছ লতিয়ে চাল ছেয়ে যেত l অন্য সময় লাউ আর কুমড়ো, মা নিজেই মাচা তৈরী করতো l এত লাউ কুমড়ো খেতে বিরক্তি ধরে যেত l কিন্তু মায়ের রান্নার হাত ভালো l মাত্র একশো গ্রাম সর্ষের তেলে পনেরো কুড়ি দিন চালিয়ে দিত l

বাকি এক কাঠা জমি থেকে মাটি কাটাতে সেই জায়গাতে গভীর ডোবা তৈরী হয়েছে l সারাবছর জলে ডোবা থাকে l মা সেই ডোবাতে নেমে মাছ ধরতো l খুব একটা মাছও তাই কেনা হতো না l একবার লম্বা একটা জ্বাল কিনে আনলাম l প্রথম দিনে তুলতেই দেখি পনেরো ষোলটা কই মাছ, সাথে বড় বড় দুটো সাপ l সাপের ভয়ে পালিয়ে এলাম, মা দেখি হাতে মোটা প্লাস্টিক বেঁধে গিয়ে সাপ দুটোকে ছাড়িয়ে জলে ছেড়ে দিল l বিষধর সাপ অবশ্য ছিল না l মা সাপ চিনতো l ঘরে কতবার সাপ ঢুকতো l লঙ্কা পুড়িয়ে, কার্বলিক অ্যাসিড ঢেলে বার করতে হতো l তবু মা কখনো সাপ মারতে দিত না l

গুল কয়লার থেকেও গুঁড়ো কয়লার দাম কম l বাবা সেই গুঁড়ো কয়লা এনে দিত , মা ভাতের ফ্যানের সাথে মিশিয়ে, ডালের বড়ি পাতার মতো পেতে,রোদে শুকোতে দিত l সেই কয়লা দিয়ে উনুন জ্বলতো l গোটা পাড়াতে এত জল রাস্তায় প্রায় কোমর, ঘরের ভেতরেও হাঁটুর ওপরে, ছোট্ট চৌকির ওপরে বসে তখন রান্নাও হতো l পাড়াতে ইলেকট্রিক আসেনি l ঘরে জল থই থই, হ্যারিকেনের আলোতে রাত্রি যাপন l

যখন আসামে থাকতো l বালি থেকে শীতে আমি অসুস্থ হয়ে আসামে গেলাম l মা তখনো চটের ওপরে ছিন্ন কাপড় মুড়ে আমাকে একটা কাঁথা সেলাই করে দিয়েছিল l এই নিজের বাড়িতে আসার পরেও এভাবে চট দিয়ে লেপ তোষক তৈরী করতো মা l ঘরে কাপড়ের এতই অভাব, রাস্তায় বেরুলে কোথাও ঝান্ডা পড়ে থাকতে দেখলে,সেটাও কুড়িয়ে নিয়ে আসতো l লাল ঝান্ডা সেলাই করে মা নিজের জন্য একটা বালিশও তৈরী করেছিল l

ভাইকে কলেজস্ট্রিটে কম্পিউটার শেখাতে নিয়ে যাব, ভর্তির টাকা বার করে দিচ্ছে মা l দুদিন বাদে বাদে পরিবারের কেউ না কেউ অসুস্থ l অ্যাম্বুলেন্স ডেকে এনে নিয়ে যাওয়ার টাকা বার করে দিচ্ছে মা l এদিকে মা কে তখন নীলরতনের পর পিজিতে নিয়মিত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাচ্ছি l ভাগ্যিস মানসিক অসুখের এক দেড় মাসের ওষুধ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে একসাথে দিয়ে দেয় l কখনো নিয়ে যেতে না পেরে,বাইরে ফার্মাসি থেকে কিনি l পরিচিত ওষুধের দোকানদার বলে, গরিবের ঘরে এতো রাজার অসুখ ! কোনোদিন ভালো হবে না l যতদিন বাঁচবে ওষুধ খেয়ে যেতে হবে l

নিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্য এরপর হাওড়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করলাম l কখনো খুব বাড়াবাড়ি অবস্থা হতো, বাড়ি ফিরে দেখছি ভাঙচুর শুরু করেছে l গাড়ি ডেকে এনে রাত দুটোর সময়ও জোর করে হাওড়া হাসপাতালে তুলে নিয়ে গেছি l ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে l দিনে সেই পরিচিত মানসিক অসুখের ডাক্তারবাবু এসে,যা ওষুধ দেওয়ার দিয়েছেন l হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরেও কখনো সকলের চোখে আড়াল করে চুপচাপ বেরিয়ে আসতো l আমি জানতাম, হাসপাতালের ওরা সামলাতে পারবে না l সিঁড়ির কাছে তাই বসে থাকতাম l আবার ধরে নিয়ে গিয়ে বেডে শুইয়ে দিতাম l

একসময় এতদিন যে ওষুধ খেত, সেই ওষুধগুলিও আর খেতে চায়তো না l বাড়িতে আনলে ছুঁড়ে ফেলে দিত l প্রেসক্রিপশান ছিঁড়ে ফেলতো l বাধ্য হয়ে খাবারে ওষুধ মিশিয়ে দিতাম l ফ্রুটিটে ওষুধ মিশিয়ে দিতাম l গন্ধ পেলে তাও ছুঁড়ে ফেলে দিত l সারাদিন আর কিছু খাওয়ানো যেত না l

ওষুধ খেতে খেতে একসময় নার্ভ দূর্বল হয়ে পড়লো l চলা ফেরার ক্ষমতা হারালো l একেবারে শয্যাশায়ী l সেই অবস্থায় পড়ে গিয়ে দুবার হাত ভেঙে ফেলে l বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করাতে হয় l জ্ঞান ফেরার পড়ে আবার অ্যাম্বুলেন্স এ বাড়ি নিয়ে আসতে হয় l কারণ মানসিক রুগীকে হাসপাতাল ভর্তি রাখবে না l আসলে হয়তো রাখবে, বিনিময়ে আরো কিছু টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ধান্দা l

এরকম কত সমস্যায় মাকে নিয়ে পড়তে হয়েছে l সরকারি আইডি হাসপাতালে ফিমেল ওয়ার্ডে না রেখে মেল ওয়ার্ডে রেখেছে l অসংখ্য আক্রান্ত পুরুষের ভিড়ে সারারাত আমি জেগে রয়েছি l মানসিক রুগীর ভিন্ন এসব যেকোনো অসুখেও আমার পক্ষে কী মাকে বালি থেকে পাভলভে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল !

১১ ডিসেম্বর ২০২২, জীবন থেকে মা হারিয়ে গেল l বেশ কিছুদিন ধরে ইউরিনের সমস্যায়ও ভুগছিল l ওষুধ চলছিল l দশ তারিখ রাত থেকে হঠাৎ ইউরিন বন্ধ, প্রচন্ড পেট ব্যথা l ভোরে বেলুড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াতে হাওড়াতে রেফার করলো l

আমি একবার ভাবলাম বেলুড় শ্রমজীবীতে নিয়ে যায় l কিন্তু ওখানেও একবার বলেছে, মানসিক রুগীদের ভর্তি রাখা হয় না l হাওড়া জেনারেল হাসপাতালেই তাই নিয়ে গেলাম l কিন্তু ঠিকমত চিকিৎসা হলো না l রাতে কার্ডিয়াক অ্যাটাক l চব্বিশ ঘন্টা প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে মা হারিয়ে গেল l একটা দীর্ঘ লড়াকু জীবনের সমাপ্তি l

আমার মা বড়সড় কোনো মানুষ নয় l জীবনের টুকরো টুকরো লড়াইয়ের কথাগুলো থেকে বুঝে নেওয়া যায়, ব্যক্তি জীবনে কত বড় যোদ্ধা ছিল l আমি কবিতা লিখি l অনেক কষ্টের মধ্যেও টিকে থাকার লড়াই মায়ের কাছে শিখেছি l অনেক লড়াইয়ের মধ্যেও বারবার হেরে গিয়ে বেঁচে থাকা l যাকে হয়তো বেঁচে থাকা বলে না, খাঁচার ভেতরে শ্বাস প্রশ্বাস ধরে রাখা মাত্র l এমন একজন মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছি l দুঃখের দহনেও আলো হয়ে মা ঠিক পথ দেখিয়ে যাবে l

আমার একটা বোন আছে l মানসিক ভাবে কিছুটা জড়, প্রতিবন্ধী l কুড়ি বছর আগেও ঘরের তেমন কোনো কাজ পারতো না l মায়ের দীর্ঘ অসুস্থতা এই মেয়েটিকে রান্না, ঘরের কাজ, বাবা মায়ের দেখাশোনা সবই শিখিয়ে দিল l আমি হয়তো মনের দুঃখ লিখে ওগলাতে পারি l এই মেয়েটা তাও পারে না l মায়ের সর্বক্ষণের দেখাশোনা, রাতে পাশে ঘুমোতো l এখন আমার পাশে ঘুমোয় l ভোরে গিয়ে দেখি মায়ের ঘরে একা ছবির সামনে চুপচাপ বসে আছে l

আমার মা শোভা রাণী চৌধুরী

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ