Skip to content

১৪ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সুন্দরী প্রতিযোগিতা বনাম পুরুষতন্ত্র

আধুনিক যুগে এসে নারীকে বাজারজাত করণের নতুন কৌশল শুরু হয়েছে। সব নারী যে রূপসী নয় বা তার মধ্যে রূপ নেই, এই ব্যাপারে আমরা অনেকটা ছাপ মেরে দেওয়ার পক্ষপাতি। শুধু যে পুরুষরাই এই মানসিকতায় বিশ্বাসী এমন নয়, বরং কিছু নারীও এমন চিন্তার ধারক-বাহক।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পক্ষে হলেও নিজেদের হীন-মানসিকতার পরিচয় তুলে ধরতে প্রস্তুত ‘সুন্দরী’ তকমাধারী হয়ে। আচ্ছা আমরা কি কখনো ভেবে দেখতে চেষ্টা করেছি যে, নারীদের ক্ষেত্রেই কেন বারবার সৌন্দর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়? শুধু সুন্দরী খেতাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, নারীদের নিয়ে নানারকম প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। সহজ বাংলায় বলা হয়, সুন্দরী প্রতিযোগিতা। আশেপাশে আরও কিছুও সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু নারীদের মধ্যে কি কখনো এই বোধ জেগেছে যে, তারা যেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে, সেটা নিতান্তই একটি মানসিক দীনতা! তাহলে কি কিছুসংখ্যক নারী বাদে আর সবাই তবে অসুন্দর? যদি নাই হবে, তবে কেন এ ধরনের অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা?

আসলে সুন্দর আর অসুন্দরের পার্থক্য কী? নারীর ক্ষেত্রে কেন নিজেকে সুন্দরী প্রমাণ করার বাসনা? আধুনিকতার যুগে নারীদের মধ্যে একধরনের মানসিকতা গড়ে উঠেছে নিজেকে কতটা সুন্দরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়! কিন্তু সৌন্দর্যের দৌড়ে নিজকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নারীরা কি আদৌ নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখেছে, নিজেকে কতটা হীন করে তুলছে? পারিবার, সমাজ নানারকমভাবে নারীকে সুন্দরী-অসুন্দরী হিসেবে গড়ে তোলে। অর্থাৎ তাদের ভূমিকায় মুখ্য। সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া কন্যাশিশুর মুখ দর্শনেই নানারকম মন্তব্য ভাসতে হয় তার পরিবারের সদস্যদের। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠতে গিয়ে কন্যাসন্তানটিকে শুনতে হয় নানারকম মন্তব্য। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বোঝা, সুন্দরী-অসুন্দরী।

এর প্রমাণ মেলে প্রতিনিয়তই। পাত্রী দেখতে গেলে আমাদের সমাজে আজও নারীকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কারও চুল দেখা হয়, কাউকে হাঁটতে বলা হয়, কার গায়ের রঙ চাপা, কে ফর্সা; এমন হাজারো মন্তব্য শুনতে হয়। নারীকে সর্বদা এসব মন্তব্যের ভেতর দিয়ে একটা জালে আবদ্ধ করে রাখা হয়। যেন তারা মানসিকভাবে শক্তিশালী না হয়ে দীনতায় ভোগে। এর বাহক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। নারীদের এমন খেতাবে নারীরা নিজেদের কমজোরি ভাবতে শুরু করছে। ফলে নিজেদের সুন্দর করতে দৌড়াচ্ছে বিউটি পার্লারে।

পুরুষতান্ত্রিক হীন-মানসিকতাকে পরিহার করতে হবে। নারীকে নিজ মেধা-মননের পরিচর্যা করতে হবে। পুরুষতন্ত্রের গোঁড়ামি ভেঙে নারীকেই সেই শক্তির পরীক্ষা দিতে হবে।

কেউ কেউ কিনছে নানারকমের প্রসাধনী। শুধু নারীর মানসিকতা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাদের মনোবল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চলছে নানারকম কনটেস্ট। যাকে সুন্দরী প্রতিযোগিতা বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। আর এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় অসংখ্য নারী। তবে কি ফাস্ট, সেকেন্ড, থার্ডের মধ্যে না আসা নারীরা অসুন্দর?

সুন্দরীর সংজ্ঞা কি শুধু মুখশ্রীর মধ্যে লুকিয়ে থাকে? নারীদের এ ধরনের মানসিকতা গড়ে ওঠার পিছনে কোন অপশক্তি কাজ করছে? নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা, যোগ্যতার চর্চাকে লালিত না করে নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যে মোহিত করা কি পুরুষতন্ত্রের বিছানো ফাঁদ নয়?

সৃষ্টি চিরসুন্দর। প্রত্যেকেই তার নিজের মতোই সুন্দর। কিন্তু নারীকে কেন সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে? আর সৌন্দর্য নির্ধারণ কে করে? পরিবার-সমাজ? তবে কি নারীর সৌন্দর্য শুধু বহিরাবরণে? দক্ষতা, যোগ্যতা, নিজ গুণাবলির কোনোই মূল্য নেই পুরুষতন্ত্রের কাছে?

পুরুষতান্ত্রিক হীন-মানসিকতাকে পরিহার করতে হবে। নারীকে নিজ মেধা-মননের পরিচর্যা করতে হবে। পুরুষতন্ত্রের গোঁড়ামি ভেঙে নারীকেই সেই শক্তির পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ, পুরুষতন্ত্র সীতার সতীত্বের পরীক্ষা নিয়েও তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। নারীর নিজের সম্মান-মর্যদা নিজেকেই গড়ে তুলতে হবে। প্রাগ্রসর মনের অধিকারী হতে হবে। জীবনে সঠিক গন্তব্য নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। পুরুষতন্ত্রের ফাঁদে না আটকে জীবনকে ইতিবাচক করে তুলতে হবে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ