Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

যা ইচ্ছে তাই হতে পারো: পেগি হুইটসন

মহাকাশ ভ্রমণের স্বপ্ন থাকে অনেকের। কিন্তু বাস্তবে কি মহাকাশ ভ্রমণ এতটাই সহজ? মহাকাশে পৌঁছনোর সময় মাইক্রোগ্র্যাভিটি, কসমিক রেডিয়েশনসহ আরো নানাবিধ বিষয় শরীরের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একটু বয়স হলেই সচরাচর মহাকাশ ভ্রমণের সাহস অনেকেই করে উঠতে পারেনা। যারা করতে পারেন, তারা ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লিখে ফেলেন। এই তালিকায় কোনো নারী কখনো নাম লেখাতে পারবেন এ নিয়ে সন্দেহবাতিক মানুষের অভাব ছিলোনা। তাদের সন্দেহকে ভেঙে চুরমার করে দেন পেগি উইলসন। যিনি কিনা ৫৬ বছর বয়সে পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক নারী এস্ট্রোনট হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন। আর পেগির গল্প সকলের সামনে চলে আসে ২০১৬ সালেই। ৬৬৫ দিনের বিশ্ব পরিভ্রমণের এই গল্পের পেছনের পেগির কথা অনেকেরই হয়তো জানা নেই। সেই গল্পই একবার ফিরে দেখা যাক।

 

২০১৬ সাল থেকে পাঁচ দশক আগের গল্প। ১৯৬০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আইওয়ার এক ফার্মে পেগির জন্ম। সামান্য ফার্মে যেমনটা দিন কাটে তেমনই কেটে যায় পেগির দিন। ধূসর পটভূমির মাঝে ক্ষুদ্র খামারে পেগির একমাত্র সাথি বিজ্ঞান। ততদিনে আমেরিকায় বিজ্ঞানের হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। আর পেগির চোখে চমক লাগিয়েছিলো সর্বপ্রথম নিল আর্মস্ট্রং। ১৯৬৯ সালে পেগি তখন নয় বছর বয়সী এক বালিকা। নিল আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটলেন, তা দেখে পেগি মুগ্ধ। পরবর্তীতে বহুবার জানিয়েছেন ওই স্মৃতি তার স্মৃতিপট থেকে কখনো মুছে যায়নি। বাবা-মা তখন বেশ তড়িঘড়ি করে ঘুম দিতে পাঠাতেন। কিন্তু এমন ইতিহাসের সাক্ষী না হয়ে পারা যায়? পেগিকেও ডেকে তোলা হলো। সম্ভবত এই অসময়ের ডাকের জন্যেই পেগি এস্ট্রনট হওয়ার স্বপ্নে থিতু হতে পেরেছিলেন। 

 

পেগি নিজের স্বপ্নের কথা মাকে জানালেন। জানালেন সে একজন এয়ারলাইন পাইলট হতে চায়। আটপৌরে মা মুচকি হেসে মেয়ের এই স্বপ্নের ইচ্ছেকে স্বাগত জানালেন। মা সবসময় পেগিকে সাপোর্ট করতেন। এদিকে বোন খোঁচা দিয়ে বললো, "তুমি বড়জোর ফ্লাইট এটেনডেন্ট হতে পারো।" কিন্তু মা বললেন, "কে বলেছে? তুমি যা ইচ্ছে তাই হতে পারো।" 'যা ইচ্ছে তাই' কথাটার মধ্যে প্রাণ ছিলো। 

 

বাড়ির পর স্কুলেও পেগি শিক্ষকদের সহায়তা পেয়েছেন। স্কুলে তার বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ দেখে সবাই খুশি। যে যেভাবে পারে তাকে সাহায্য করে। কলেজের পাট চুকিয়ে তিনি গ্র্যাজুয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে বায়োক্যামিস্ট্রি বেছে নিলেন। ১৯৮৯ সালেই পেগি নাসাতে যোগ দিলেন। ততদিনে পেগির জীবনে সাফল্য হাত বাড়িয়ে রেখেছে। নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল রেসিডেন্ট রিসার্চ এসোসিয়েট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে এডজাঙ্কট এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নাসাতে যোগ দেয়াটা ছিলো এই সাফল্যে একটি অনন্য সংযোজন মাত্র। নাসাতে যোগ দেয়ার ঠিক ১৩ বছর পরই পেগির সামনে মহাকাশ ভ্রমণের সুযোগ আসবে।

 

২০০২ সালের ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে পাঁচ সদস্যের একটি এক্সপিডিশন দল প্রেরণ করে। সেখানে তাদের ছয় মাস কাটাতে হয়। পেগি এই অভিযানে ফার্স্ট নাসা সায়েন্স অফিসার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে হিউম্যান লাইফ সায়েন্স এবং মাইক্রোগ্র্যাভিটি সায়েন্স নিয়ে কাজ করেন। ১৮৪ দিন, ২২ ঘণ্টা এবং ১৪ মিনিট মহাকাশে থাকার পর পেগি পৃথিবীতে ফিরে আসেন। ২০০৮ সালে তিনি প্রথম মহিলা স্টেশন কমান্ডার হিসেবে আরেকটি অভিযানে যান। সে বছর কোনো মহিলা হিসেবে মহাকাশে সবচেয়ে বেশিক্ষণ মহাকাশে থাকার রেকর্ড গড়েন। শুধু নারী নয়, যেকোনো আমেরিকানদের মধ্যে তার রেকর্ডই এখনো সবার প্রথমে। এমনকি এই যাত্রায় তিনি সুনিতা উইলিয়ামসের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক স্পেসওয়াকের রেকর্ড ভাঙেন।

 

এই অভিযানগুলো কি সহজ ছিলো? নাসার শেষ যে অভিযানটি তাকে অবিস্মরণীয় করে রাখবে, সেই ট্রিপে ১৮ টি পদের জন্যে প্রায় ১২০০০ আবেদনপত্র জমা হয়েছিলো। সেখানে ৫৬ বছর বয়স্ক পেগি হুইটসনের জায়গা কোথায়? তবু এই অভিযানে সবচেয়ে বয়স্ক নারী হিসেবে স্পেস স্টেশন যাত্রা করেন তিনি। পেগি তার অভিযানের সমাপ্তি সেবারই ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু তবু মঙ্গল কিংবা চাঁদে ভ্রমণের ইচ্ছে বহুবার জানিয়েছেন। তবে তার শেষ কীর্তিটিই যেন সবচেয়ে বেশি মুগ্ধকর। তুমি যা ইচ্ছে তাই হতে পারো – বয়স বা অন্যকিছু কোনো ব্যাপার না।