Skip to content

১লা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অরুন্ধতী রায়: সাহিত্যিকিই নন, আদর্শ বুদ্ধিজীবী নারীও বটে

সাহিত্যে নোবেল পাওয়া যেকোনো সাহিত্যিকের জন্যই অনেক বড় সম্মাননা। কিন্তু সাহিত্যে নোবেল পাওয়া নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। কিন্তু ম্যান বুকার নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই। প্রথম ভারতীয় নারী লেখক হিসেবে ১৯৯৭ সালে ম্যান বুকার  পেয়ে আলোচনায় আসেন অরুন্ধতী রায়। এখন এক কথায় সবাই তাঁকে 'দ্য গড অব স্মল থিংস'-এর লেখিকা বলে চিনে থাকেন। তবে তিনি শুধু লেখিকা হিসেবেই নিজের প্রতিভার স্ফূরণ ঘটিয়েছেন, এমন নয়। বরং নোংরা রাজনীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় স্বর তুলেছেন। মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর গভীর ধারণাই ভারতীয় নারীদের সামনে একজন আদর্শ বুদ্ধিজীবী নারী হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

কিন্তু কে এই অরুন্ধতী রায়? সাহিত্যিকের বাইরেও বুদ্ধিজীবী নারী হিসেবে তাঁর পরিচয় কিভাবে গড়ে উঠল?  সেই কথাই না হয় জানা যাক:

 

১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে অরুন্ধতী রায়ের জন্ম। বাবা রাজীব রায় ছিলেন বাঙালি। অন্য দিকে, মা মেরি রায় কেরালায় বেড়ে ওঠা ক্রিশ্চান পরিবারের মেয়ে। বাবা টি-এস্টেটের ম্যানেজার আর মা নারী অধিকার রক্ষাকর্মী। দুজনের জগত একদম ভিন্ন। তাই দুই বছরের মাথাতেই তাঁদের বিয়েবিচ্ছেদ হয়ে যায়। অরুন্ধতীর বয়স তখন মাত্র দুই।

মা-বাবা আলাদা হয়ে গেল। এবার অরুন্ধতী কার সাথে থাকবেন? মায়ের সাথে অরুন্ধতীকে কেরালায় চলে আসতে হলো। সম্ভবত, মায়ের সাথে থাকার ফলেই অন্যায়ের সাথে আপোষহীন মনোভাব গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। যদিও মাঝে কিছু দিন নানার বাড়িতে তিনি কাটান। কিন্তু পাঁচ বছর বয়সেই তিনি আবার কেরালায় ফিরে আসেন। মা মেরি রায় একটি স্কুল চালু করেন। এভাবেই সাদামাটাভাবে দুজনের সংসার। কেরালার অপার্থিব সৌন্দর্য এবং প্রাকৃতিক রূপ-মাধুর্য তার মনকেও বিস্তৃত করে তুলতে শুরু করে।

 

কোয়াট্টামে 'করপাস ক্রিস্টি' স্কুলেই তিনি পড়ালেখা শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তামিলনাড়ুর নীলগিরিতে লাভডেল লরেন্স স্কুলে শিক্ষা শেষে দিল্লির স্কুল অব প্লানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার থেকে আর্কিটেকচার নিয়ে তিনি পড়াশোনা শুরু করেন। এখানেই আর্কিটেক্ট জেরার্ড দা কানহার সাথে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। দুজন দিল্লি ও গোয়াতে কিছু দিন একত্রে থাকার পর দুজনের বিচ্ছেদ হয়।

এবার দিল্লিতে 'ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট আরবান অ্যাফেয়ার্স'-এ তিনি কাজ শুরু করেন। ১৯৮৪ সালেই আবার চিত্রনির্মাতা প্রদীপ কৃষাণের সাথে পরিচয়। তখন তিনি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করছিলেন। অরুন্ধতীকে সেখানে একটি ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ দেন। 'ম্যাসেই সাহিব' নামে এই ফিল্ম  অনেকগুলো পুরস্কার বাগিয়ে নেয়। সম্ভবত, এখানেই দুজনের বোঝাপড়া হয়েছিল। মন দেয়া নেয়া তো বহু আগেই হয়ে গেছে। দ্রুতই দুজন বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। দুজনের চেষ্টায় 'ইন হুয়িচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ (১৯৮৯) ও 'ইলেকট্রিক মুন' (১৯৯২) নির্মিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত এই দুটি চলচ্চিত্র ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। বিশেষত, প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য অরুন্ধতী সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার পান।

 

কিন্তু সিনেমার জগতে কেন যেন তাঁর মন বসেনি। এবার নিজের ঠাঁই খুঁজে পাওয়ার জন্যই তিনি বিভিন্ন কাজে আত্মনিয়োগ করতে শুরু করেন। লেখালেখিটাই ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সিনেমার জগতের সাথে বন্ধন ত্যাগ করার পর প্রদীপের সাথেও দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। দুজনের বিয়েবিচ্ছেদ হয়ে যেতেও দেরি হয় না।

এবার লেখালেখিতে তাঁর সব মনোযোগ। ১৯৯৭ সালেই তিনি অনেকটা আত্মজৈবনিক ধাঁচের উপন্যাস 'দ্য গড অব স্মল থিংস' প্রকাশ করেন। এই উপন্যাসটি তাঁকে তুমুল জনপ্রিয়তা এবং আর্থিক সচ্ছলতা এনে দেয়। যেহেতু তিনি ইংরেজিতেই উপন্যাসটি লিখেছিলেন। গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস, টরন্টো স্টারের মতো অনেক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন উপন্যাসটির উদার প্রশংসা করে। কিন্তু নিজ দেশেই তাঁকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। কেরালার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ই কে নয়নজার অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনেন। তাঁর অভিযোগ, এই উপন্যাসে অনবদমিত যৌনতার ব্যবহার হয়েছে।

 

অনেকের ধারণা এই অভূতপূর্ব সাফল্য প্রথম বইয়ের ক্ষেত্রেই হয়েছিল। এ-ছাড়া, তিনি 'দ্য ব্যানিয়ান ট্রি' নামে একটি সিরিয়াল এবং 'ড্যাম/এজ:  অ্যা ফিল্ম উইথ অরুন্ধতী' নামে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন। প্রথম উপন্যাস প্রকাশ হওয়ার পরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ বাড়তে শুরু করে। এ সময় তিনি সামাজিক বিষয়াবলির ওপর অনেকগুলো প্রবন্ধ লেখেন। বিশেষত, ১৯৯৮ সালের ভারত সরকারের নিউক্লিয়ার পলিসির সমালোচনা করে তিনি তাঁর কূটনৈতিকতার পরিচয় দেন। তাঁর একটি বক্তব্য অনেকের নজর কাড়ে:

'আপনি ধার্মিক হয়ে থাকলে মনে রাখুন, এই বোমা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের চ্যালেঞ্জ। বেশ সহজ ভাষায় বলা যায়, তুমি যা-কিছু সৃষ্টি করেছ, সে-সব ধ্বংসের ক্ষমতা আমরা রাখি। আর যদি আপনি ধার্মিক না হন, তাহলে এ-ভাবে ভাবুন, আমাদের ৪৬০ কোটি বছরের পুরোনো এই পৃথিবী এক বিকেলেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।' 

২০০৮ সালেই কাশ্মীরের স্বাধীনতার স্বপক্ষে তাঁর নিজস্ব মতামত একটি সাক্ষাৎকার দেন। তিনি কাশ্মীরের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ঠিকই বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসনেতা মালবিয়া এই বক্তব্যকে দ্বায়িত্বহীন বলে আখ্যা দেন। এমনকি নর্মদা ড্যাম যে পরিবেশ এবং প্রান্তিক মানুষের ক্ষতি করবে এবং সে-জন্য কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হবে না সে মত্ও ব্যক্ত করেন। ম্যান বুকার থেকে পাওয়া অর্থ তিনি নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে প্রদান করেন। কিন্তু এই বক্তব্যের জন্যেও তাঁকে অনেকে সমালোচনা করেন।

লেখাকেই তিনি একটি ক্ষুরধার অস্ত্র হিসেবে শাণিয়ে নেন। 'দ্য অ্যান্ড অব ইমাজিনেশন' বইটিতে রাজস্থানের পোখরানে ভারত সরকারের পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্তকে তিনি কটাক্ষ করেন। এমনকি ২০১৩ সালেই নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থিতাকে তিনি কোনোমতেই ভালো চোখে দেখেননি। সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিরুদ্ধে অরুন্ধতী সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি সব সময় কথা বলেছেন।

 

লেখালেখিকেই অরুন্ধতী রায় এ মতামত ব্যক্ত করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনি বহু পুরস্কারে মনোনীত হয়েছেন। ২০০৬ সালেই 'দি অ্যালজেবরা অব ইনফিনিট জাস্টিস' প্রবন্ধগ্রন্থের জন্যে তিনি 'সাহিত্য আকাদেমি' পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর লেখালেখি কিছুটা ভিন্ন ধরনের ছিল। সে-জন্যই ২০১১ সালে 'নরমান মেইলার' পুরস্কার অর্জন করেন। কিন্তু সব চেয়ে বড় চমক আসে যখন টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালি ব্যক্তির তালিকায় অরুন্ধতীর নাম চলে আসে।

এই দীর্ঘ সময়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উপন্যাস আর লিখেননি তিনি। প্রবন্ধ আর রাজনৈতিক লেখাই ছিল প্রধান। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের ২০ বছর পর অরুন্ধতী 'দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস' নামে আরেকটি বই প্রকাশ করেন।

অরুন্ধতী মানবাধিকার রক্ষার কণ্ঠস্বর হিসেবে সমাদৃত। বিশেষত, ভারতীয় বহু নারীর কাছেই অরুন্ধতী একটি অনুপ্রেরণার নাম। নারী লেখকদের মধ্যে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী এবং উপন্যাসেও মুন্সিয়ানা দেখানোর ক্ষমতা থেকে বোঝা-ই যায়, বুদ্ধিজীবী হিসেবে নারীরা কখনোই পিছিয়ে না।

 

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ