Skip to content

১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গণপরিবহনে নারী-হয়রানির জন্য পুরুষের মানসিকতাকে দুষলেন তারা

গণপরিবহনে নারী-হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। গণপরিবহনে যাতায়াত যাত্রীদের অভিযোগ, বাসে উঠতে-নামতে যেমন তারা অযাচিত স্পর্শের শিকার হচ্ছেন, তেমনি সিটে বসলেও স্বস্তির সঙ্গে, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। কখনো তাদের শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় হেলপারের হাতের স্পর্শ, কখনো পুরুষ সহযাত্রীর অশালীন আচরণের শিকার হচ্ছেন। মঙ্গলবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ‘সেভ দ্য রোড’-এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘গত দুই বছর আগে আমাদের এক জরিপের মাধ্যমে দেখা গেছে, গণপরিবহনে ৮২ শতাংশের মতো নারী হয়রানির শিকার হন। গণপরিবহনে নারী হয়রানির জন্য পুরুষতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনের নজরদারির অভাব হিসেবে দেখছেন দেশের শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও লেখকরা।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে কবি, গবেষক ও শিক্ষাবিদ দিলারা হাফিজ বলেন, ‘যত্রতত্র নারীর যৌন-হয়রানির জন্যে দায়ী মূলত,আমাদের পরিবার, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাকৌশল, নৈতিকতার অভাব ও আজন্ম নারীর প্রতি পুরুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব সময় একটা কথা বলে আসছি, পৃথিবীতে ধর্মে ধর্মে যত না বিরোধ-হানাহানি, তার চেয়ে অধিক বিরোধী মনোভাব থাকে নারী-পুরুষের সম্পর্কে।’

এই প্রবীণ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘নারীকে সর্বত্র ছোট করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। পুরুষতন্ত্র নারীর অবদান অস্বীকার করে, এটা তাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা—নারীদের সম্পর্কে এই ধরনের মন্তব্য পুরুষেরাই করে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হয়রানি বন্ধের জন্যে ফাঁক-ফোঁকরহীন আইনের প্রয়োগ জরুরি। সন্তান বেড়ে ওঠার সময় মা-বাবার মাধ্যমে নৈতিকতার শিক্ষাদানও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

দিলারা হাফিজ

আইনজীবী দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অন্যতম কারণ পুরুষের বিকৃত মানসিকতা। আমাদের সমাজে নারীদের দেখলেই পুরুষদের কোনো না কোনোভাবে হয়রানি করতে ইচ্ছে করে। নারীরা গণপরিবহনে উঠতে গেলেই ড্রাইভার দ্রুত গতিতে বাস টান দেন, এতে করে নারীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। তা দেখেও পুরুষ যাত্রীরা আনন্দ পান। অনেক সময় নারীদের সিট দখল করে রাখে পুরুষ। কিছু বললে সেখানে উঠে আসে সম অধিকারসহ নানারকম বাজে মন্তব্য। আবার যদি নারীর পাশে পুরুষ বসে তবে গোটা সিট দখলের জোর দেখা যায়। মূলত ইচ্ছে করেই নারীর শরীরের সঙ্গে শরীর লাগিয়ে তারা বিকৃত রুচির প্রকাশ ঘটায়। গণপরিবহন থেকে শুরু করে যেকোনো পযায়ে নারীকে যৌন হয়রানির শিকার করে তোলাটা মূলত পুরুষের বিকৃত রুচি, শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব। দৃষ্টি, আচরণ, কথা সংযত না করার ফল ছাড়া কিছু নয়। ’

দিলরুবা শরমিন আরও বলেন, ‘এই সমস্যা দূর করতে হলে ঘরে-বাইরে শিক্ষার দরকার। পরিবার থেকে নারীদের সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে। বিদ্যালয়ে শুধু পুথিগত শিক্ষা নয়, বরং মোরাল শিক্ষা দিতে হবে। বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে বিচারিক কাজ করতে দিতে হবে। ম্যাজিট্রেটের সার্বক্ষণিক পাওয়ার দিতে হবে। গণপরিবহনে ইমারজেন্সি নম্বর রাখতে হবে। যেন নারীরা দ্রুত বিচার পান। গণপরিবহনে সোশ্যাল ওয়ার্কার দিতে হবে। সাদা পোশাকে গণপরিবহনে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি রাখতে হবে। এতে অনেকটা সমস্যাগুলোকে কমিয়ে আনা যাবে।’

দিলরুবা শরমিন

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘নারীদের শুধু আর্থিক উন্নতি দেখালেই হবে না; বরং আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জীবনের অভয় দিতে হবে। বাইরে যাতে কোনো প্রকার সমস্যা না হয় সে জন্য পুলিশ-প্রশাসনকে সচেতন করতে হবে। গণপরিবহনের লোকদের সচেতন করতে হবে। স্যোশাল অ্যাডভোকেট নিযুক্ত করতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘নারীদের এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, যদি শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নে মন না দিয়ে সামাজিক, মানবিক, নৈতিক উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া হয়।’

দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘‘গণপরিবহনে এই স্টিকারই ছেপে মেরে দিক, ‘যৌন হয়রানি শাস্তি যোগ্য অপরাধ। নারী-শিশুকে যৌনহয়রানি করা থেকে বিরত থাকুন।’ এটা তো ছোট একটা কাজ। সরকার ইচ্ছে করলেই পারে।’

শেখ কানিজ ফাতেমা

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও লেখক শেখ কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘এ জন্য দায়ী আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তাদের নোংরা মানসিকতা। তারা একজন নারীকে নরম মাংসস্তূপ ছাড়া কখনো মানুষ ভাবতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘‘আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, একজন কর্মজীবী নারী যখন সকালে কাজের জন্য রাস্তায় বের হন, তখন অনেক সময় তাকে গণপরিবহনে উঠতে দেওয়া হয় না। বলা হয় সিট নেই। অথচ নারীদের জন্য যে সংরক্ষিত আসন থাকে, সেখানে পুরুষ যাত্রী বসে থাকে। আবার সন্ধ্যার সময় যখন আমরা বাসায় ফিরি তখনো শুনতে হয়, ‘অই এগ্লারে তুলিস না, খালি ভেজাল।’ নারী তখন হয়ে যায় ‘এগ্লা’। আজ যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী, পুলিশ ফোর্স, আর্মি ফোর্স, আইন-আদালতসহ দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীর সফল পদচারণা তখন কত নোংরা কথা আমাদের শুনতে হয় রাস্তায় বের হলে!’

শেখ কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘ভিড়ের মধ্যে নারীর শরীর ছুঁয়ে কিছু পশুরূপী নরপিশাচ পৈশাচিক আনন্দ পায়। আমার মতে, এরা মানসিকভাবে অসুস্থ। নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ অন্যান্য হয়রানি আমাদের সমাজে ক্যান্সারের মতো বিরাজ করছে। এই হয়রানি বন্ধ করতে হলে আমাদের সবার আগে মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে। নারীকে শুধু নারী হিসেবে নয় মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন ঘটাতে হবে।’

খাদিজা ইভ

জানতে চাইলে কবি খাদিজা ইভ বলেন, ‘‘গণপরিবহন কিংবা ফুটপাত যেখানেই নারীর বিচরণ আছে, সব জায়গাতেই একটা বিষয় প্রতিলক্ষিত হয় ‘যৌন-হয়রানি’। নারীদের বেলায় এ এক কমন সাবজেক্ট।’’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি নারীর যৌন-হয়রানির জন্য পুরুষের মানসিকতা দায়ী। নারীরা সব পুরুষের কাছে হয়রানির শিকার হন না। অনেক পুরুষ আছে, যারা নারীদের পাশে থাকেন প্রতিনিয়ত বটবৃক্ষ হয়ে। কিছু পুরুষের মানসিকতা এমন যেন নারীর শরীর স্পর্শেই তাদের আনন্দ।’

খাদিজা ইভ বলেন, ‘এই হয়রানি বন্ধে একমাত্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে পুরুষ নিজেই। কেননা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে শত আইন সামনে এলেও তারা তাদের মানসিকতায় অটল থাকবে।’