Skip to content

৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস: নারীর ক্ষমতায়নে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বদলাবে

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দেশটির কনজারভেটিভ পার্টির নেতা লিজ ট্রাস। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মিত্র-অনুগতদের নিয়ে গঠন করে তার মন্ত্রিসভা। অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কোয়াসি কোয়ার্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসিবে দায়িত্ব পেয়েছেন জেমস ক্লেভারলি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সুয়েলা ব্র্যাভারম্যানকে। আর বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন কামি বেইডেনক। স্বাস্থ্য ও উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন টেরিজ কফি, কর্মসংস্থান ও পেনশন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ক্লোয়ি স্মিথ, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন কিট ম্যাল্টহাউজ। উল্লেখ্য, মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র দুজন নারী রয়েছেন। যা হিসেবে এক-তৃতীয়াংশেরও কম। ব্রিটেনের মতো রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী নারী হওয়ার পরও মন্ত্রিসভায় নারী প্রতিনিধিত্ব কম হওয়ার কারণ সম্পর্ক মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশের সচেতন নারীসমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, নারীর ক্ষমতায়ন শুনতে ভালো শোনালেও বিষয়টি আপেক্ষিক। তাই নারী ক্ষমতায় গেলেই নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হবে না বলেও তারা মনে করেন।

লিজ ট্রাস

এই প্রসঙ্গে সাহিত্যিক ও চিকিৎসক ফরিদা ইয়াসমিন সুমি বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়টা আপেক্ষিক। কারণ সমাজ মনে করে, নারীকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। বাস্তবতা হলো, অন্যের দেওয়া কোনো কিছু দিয়েই আর একজন ক্ষমতার সিঁড়িতে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন না। তাই আমার কাছে নারীর ক্ষমতায়ন আলাদাভাবে কোনো অর্থ বহন করে না। বরং এর মাধ্যমে নারীকেই যেন বোঝানো হয়, তারা নিজে ক্ষমতা পাওয়ার সক্ষমতার চেয়ে পুরুষের দয়ায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয় বেশি। তাই আমার মনে হয়, কেউ বিশেষত কোনো নারী ক্ষমতায় গেলেই যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যাবে, তা কখনো হবে না।’

এই সাহিত্যিক আরও বলেন, ‘ক্ষমতা বা যেকোনো প্রাপ্তি নিজেকেই অর্জন করতে হয়। সারা বিশ্বেই নারীরা সব ক্ষেত্রে পুরুষ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।’ লিজ ট্রাসের মন্ত্রিসভায় নারীর সংখ্যা কম হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সুযোগ, যোগ্যতা ও সক্ষমতা; এই তিনের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের পরিবার থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা; সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় পুরুষকেই সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সমান যোগ্যতাসম্পন্ন একজন ছেলে ও একজন মেয়ে সমানভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হয় না। আর এক্ষেত্রেও তাই হয়। অর্থাৎ কোনো একজন নারী নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান হলেও আর একজন নারী সবসময় পাওয়া সম্ভব নয়।’

ফরিদা ইয়াসমিন সুমি

নারীর ক্ষমতায়নের ফলেও নারী সমাজের প্রতি পুরুষতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মিলু শামস বলেন, ‘না। এ ধরনের ঘটনা প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে তেমন কোনো প্রভাব রাখে না। আর এভাবে ক্ষমতায়িত নারীরাও প্রকৃতপক্ষে নারীদের সার্বিক সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্যভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন না। কেননা লৈঙ্গিকভাবে তিনি নারী হলেও সিস্টেমটি পুরুষতান্ত্রিক। ফলে তার জায়গায় একজন পুরুষ হলে যা করতেন, তিনিও তাই করবেন। শাসনতান্ত্রিক সিস্টেম বা সামাজিক পরিবর্তন না হলে সত্যিকারের পরিবর্তন সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘‘মার্গারেট থ‍্যাচারকে আমরা দেখেছি, ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি কি নারীদের সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনে বড় কোনো পদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন? নেননি। বরং ওই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ‍্যানের সহযোগী হয়ে বাজার অর্থনীতিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তাই করেছেন, যা একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী করতেন। বাজার অর্থনীতি মানুষসহ সব কিছুকেই পণ্যে পরিণত করে।’’

মিলু শামস বলেন, ‘যুক্তরাজ‍্য বলুন, যুক্তরাষ্ট্র বলুন, রাষ্ট্রীয় পলিসির বাইরে যায় না। সুতরাং রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান নারী হওয়ায় নারীদের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না।’

মিলু শামস

লিজ ট্রাসের মন্ত্রিসভায় নারী সদস্য কম হওয়ার প্রসঙ্গে এই সাংবাদিক বলেন, ‘সিস্টেমের বাইরে তারা যান না,যেতে পারেন না। তিনি চাইলেই মন্ত্রিসভায় নারী সদস‍্য বাড়াতে পারেন না। উপরন্তু লিজ ট্রাস এসেছেন রক্ষণশীল দল থেকে। তার কাছে প্রগতিশীল পদক্ষেপ আশা করা খুব একটা বাস্তবসম্মত হবে বলে আমার মনে হয় না।’

মিলু শামস বলেন, ‘রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান একটি রাজনৈতিক ব‍্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসেন। তিনি ওই দলের ম‍্যানিফেস্টোর প্রতি অনুগত। দলটির দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষতান্ত্রিক হলে তার পক্ষে এর বাইরে যাওয়া খুব বেশি সম্ভব হয় না। যেসব দেশে রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান নারী, সেসব দেশে আমরা কি তাই দেখছি না?’

কবি ও কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা বলেন, ‘নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না। এর কারণ বহুবিধ। কারণ নারী নিজেও বদল কতখানি চায়, সেটা একটা বড় ফ্যাক্ট। আসলে বিষয়টি শাশ্বত। নারী আজও মাতৃত্ব আর সেবায় অনন্য থাকতে চান অধিকাংশ ক্ষেত্রে। ’ নারী সরকার প্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান হলেও মন্ত্রিসভায় নারী সদস্য কম থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এর কারণ বহুযুগ ধরে চলে আসা বঞ্চনা। এই সমাজের অধিকাংশ নারী পুরুষতান্ত্রিক। নারীর ক্ষমতায়ন নারীই আগে চায় না। নারী নির্যাতনও নারীর হাতেই বেশি হয়। অন্তত রিমোট অঞ্চলে তো বটেই। তবে এক্ষেত্রে পুরুষ আরও এগিয়ে এলেই সার্বিক পরিবর্তন সম্ভব।’

নুসরাত সুলতানা

এই লেখক বলেন, ‘আজও একুশ শতকের অনেক মা তার মেয়ের থালায় মুরগির রানটি দিতে পছন্দ করেন না। মেয়ে উপার্জন করে খাওয়ালেও না। ছেলে বখাটে হলেও ছেলেকেই দিতে চান। তবে শুধু নারী বলেই ক্ষমতায়নে আমিও বিশ্বাসী না। কিন্তু নারী তার মেধার মূল্যায়ন পাক, এটা গভীরভাবেই চাই।’

সাংবাদিক জিমি আমির বলেন, ‘ব্রিটেনে কিন্তু একজন রানী ছিলেন। যিনি ৭০ বছর ধরে শাসন করেছেন। সেই রানীর পুত্রবধূ হিসেবে প্রিন্সেস ডায়ানা স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারেননি। নিয়মের বেড়াজালে ডায়ানাকে থাকতে হয়েছে। সেখানে লিজ ট্রাস্ট প্রধানমন্ত্রী হলেও পরিস্থিতি বদলানোর মতো এখনো কিছু ঘটেনি। তবে, একজন নারী যখন ক্ষমতার শীর্ষে যান, তখন অবশ্যই তার মেধা, পরিশ্রমের জোরেই তাকে যেতে হয়। সমাজ বা পুরুষতন্ত্র তাকে কখনো সুযোগ করে দেয় না।’

জিমি আমির আরও বলেন, ‘যেসব নারী সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন, তাদের অনেকেই রাজনৈতিক পরিবার থেকেও উত্তরাধিকার সূত্রে সেই জায়গাগুলোতে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে, সুযোগ এখানে কিছুটা সমর্থন দিলেও সেই নারীকে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে। সেই অর্থে এই কথাটি খুব পরিষ্কার যে, নারী-পুরুষ বলে কথা নয়, যিনি যোগ্য তিনি যথার্থ জায়গাতেই যাবেন। আবেগ দিয়ে সব কিছু বিচার করার সুযোগ নেই।’

জিমি আমির

এই সাংবাদিক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের উদাহরণে বলা যায়, দুই জন সরকার প্রধান, সংসদ নেতা, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন জায়গায় নারী প্রতিনিধিত্ব করছেন যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে। এর মাঝে আমরা খেয়াল করেছি অনেককে সুযোগ দিয়েও তারা কিছু করতে পারেনি। সুতরাং ক্ষমতায়নের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলার আগে, দেখতে হবে যোগ্যতা থাকলে তিনি তার জায়গায় যাবেনই।’

কবি খাদিজা ইভ বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের বলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। তবে খুব ধীর গতিতে। সমাজে অনেক ধরনের মানুষ বিলং করে। এর মধ্যে পজিটিভ চিন্তার মানুষের চেয়ে নেগেটিভ চিন্তার মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই নারীর ক্ষমতায়নে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পজিটিভ দিকে এগিয়ে যায় তবে কচ্ছপের গতিতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথটা খুব বন্ধুর। তাই এই পথে এগিয়ে যেতে নারীদের অনেক বেগ পোহাতে হয়। তবে আমার মনে হয় নরীরা পিছিয়ে থাকার পেছনে তাদের ইচ্ছাশক্তির অভাব বেশি। আবার সমাজ-সংসার ঠিক রাখতে চাইলে একজন নারীকে দুর্গার মতো দশ দিকে সমান দৃষ্টি দিতে হয়। আর পিছুটান তো থাকেই। এই সবকিছুর জন্যই মূলত নারীরা পিছিয়ে আছে।’

খাদিজা ইভ

নারীরা রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান হলেও মন্ত্রিসভায় নারীর সংখ্যা কম থাকা প্রসঙ্গে এই কবি বলেন, ‘নারীদের নাই-এর জায়গাটা আসলে এত প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, এই শূন্যতা পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই নারী যখন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হন তখন মন্ত্রিসভায় নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করে যান। খাদ ভরাট করতে যাওয়ার কারণে অগ্রগতি তেমন চোখে পড়ছে না সাধারণ জনগণের চোখে। আর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তো বিরাজ করেই একটা রাষ্ট্রে। তবে আমি আশা করি অদূর ভবিষ্যতে নারী আরও এগিয়ে যাবে তাদের নিজেদের ইচ্চাশক্তির জোরে।’