মৃত সাগরের সন্ধানে

মৃত সাগরের সন্ধানে
মৃত সাগরের সন্ধানে
চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্য মৃত সাগর অঞ্চলটি গবেষণাস্থল হয়ে উঠেছে। এর মূলে রয়েছে হ্রদের পানিতে খনিজ দ্রব্যাদির বিপুল উপস্থিতি, বাতাসে এলার্জি উৎপাদক দ্রব্য এবং পরাগরেণুর স্বল্পতা, উচ্চ ভূ-মণ্ডলীয় চাপ, সৌর বিকিরণে অতি বেগুনি উপাদানের কম উপস্থিতি। উচ্চ বায়ুমন্ডলীয় চাপ , শ্বাসকষ্ট  এছাড়াও চর্মরোগীদের জন্য দীর্ঘসময় সূর্যস্নান বেশ উপকারী।     

বৈচিত্র্যময় আমাদের এই পৃথিবীতে রহস্যের যেন, কোন শেষ নেই। এসব রহস্য আমাদের মনকে উৎসাহিত ও উৎফুল্ল করে তোলে। পৃথিবীর এমন অনেক রহস্যই আছে যার এখনো কোন হদিস মেলে নাই। আবার এমন রহস্যও আছে যার মধ্যে লুকিয়ে আছে , প্রাকৃতিক ইতিহাস, বিজ্ঞানের ছোঁয়া কিংবা আঞ্চলিক লোকের কল্পকথা। পৃথিবীর অন্যতম এক বিস্ময়কর সাগর যার নাম মৃত সাগর।

 

ডেড সী বা মৃত সাগর নাম শুনে কি ভাবছেন, এটি একটি সাগর। তবে এটি কোন সাগর নয় মূলত একটি হ্রদ। পৃথিবীর অন্যান্য সব সাগরের তুলনায় মৃত সাগরের পানি  ১০গুন বেশি লবণাক্ত হওয়ার কারণে এ পানিতে কোন ধরণের উদ্ভিদ বা মাছ বাঁচতে পারে না। তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে ডেড সী বা মৃত সাগর। 

 

 

এশিয়া মহাদেশের মধ্যপ্রাচ্যের জর্ডান এবং ইসরায়েল দেশের মধ্যবর্তী স্থানে মৃত সাগরের অবস্থান অর্থাৎ মৃত সাগরের পূর্ব সীমান্তে জর্ডান এবং পশ্চিম সীমান্তে ইসরায়েল রয়েছে । মৃত সাগরের পৃষ্ঠভাগ স্বাভাবিক সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪২০ মিটার নিচে অবস্থিত। তাই একে ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে নিম্ন ভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে এ হ্রদের সর্বোচ্চ গভীরতা ৩৩০ মিটার(১০৮৩ ফিট) এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৭ কি.মি ও প্রস্থ সর্বোচ্চ ১৫ কি.মি। পানির আয়তন ১৪৭ কি.মি।

 

প্রায় তিন মিলিয়ন বছর পূর্বে বর্তমান জর্ডান নদী, মৃত সাগর এবং ওয়াদি আরাবাহ অঞ্চল লোহিত সাগরের পানিতে বারবার প্লাবিত হত। এর ফলে একটি সরু উপসাগরের সৃষ্টি হয়। উপসাগরটি জেজরিল উপত্যকায় একটি সরু সংযোগের মাধ্যমে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত ছিল। প্রাকৃতিক তত্ত্ব অনুযায়ী প্রায় ২ মিলিয়ন বছর পূর্বে জেজরিল উপত্যকা এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী স্থলভাগ ধীরে ধীরে উঁচু হতে থাকে। এক পর্যায়ে উপসাগরটি চারদিকে ভূমি দ্বারা বেষ্টিত হয়ে এক বিশাল হ্রদ পরিণত হয়।

 

 

মৃত সাগরের পানিতে  ভেসে থাকার জন্য আপনাকে কিছুই করতে হবে না। যারা সাতার জানেন না তারাও এখানে নিশ্চিন্তে ভেসে থাকতে পারবেন। এমনকি ইচ্ছা করেও ডুবতে পারবেন না। এখন ভাবছেন তো কিভাবে, অতিরিক্ত  লবণের কারণে মৃত সাগরের পানিতে প্লবতা অনেক বেশি। প্লবতা হল পানিতে ভাসমান বস্তুর উপর পানির ঊর্ধ্বমুখী বল। কোন বস্তুকে পানিতে ছেড়ে দেওয়া হলে বস্তুর ওজন নিচের দিকে বল প্রয়োগ করে, সে সাথে পানি বস্তুকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। যদি বস্তুর ওজন বেশি হয় তবে বস্তু ডুবে যায়। আর পানির ঊর্ধ্বমুখী বল বেশি হলে তবুও বস্তু পানিতে ভেসে থাকে। অর্থাৎ পানিতে ভাসমান কোন বস্তুর উপর প্রযুক্ত পানির ঊর্ধ্বমুখী বলই হল প্লাবতা। 

 

মৃত সাগরের পানির প্লবতা বেশি হওয়ার কারণ হল এর পানিতে অস্বাভাবিক লবণাক্ততা। এ পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ৩৪.২% অর্থাৎ এ সাগরের ১০০ গ্রাম পানিতে প্রায় ৩৪ গ্রাম লবণ। যা সাধারণ সমুদ্রের পানির চেয়ে ১০ গুণ বেশি লবণাক্ত। অন্যান্য মহা সাগরের পানি মৃত সাগরের পানিতে মিশে থাকা খনিজ উপাদান এর  মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মৃত সাগরের পানিতে বিদ্যমান লবণে  রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড ৫০%,  সোডিয়াম ক্লোরাইড ৩০%, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ১৪% এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইড ৪%। 

 

 

চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্য মৃত সাগর অঞ্চলটি গবেষণাস্থল হয়ে উঠেছে। এর মূলে রয়েছে হ্রদের পানিতে খনিজ দ্রব্যাদির বিপুল উপস্থিতি, বাতাসে এলার্জি উৎপাদক দ্রব্য এবং পরাগরেণুর স্বল্পতা, উচ্চ ভূ-মণ্ডলীয় চাপ, সৌর বিকিরণে অতি বেগুনি উপাদানের কম উপস্থিতি। উচ্চ বায়ুমন্ডলীয় চাপ , শ্বাসকষ্ট  এছাড়াও চর্মরোগীদের জন্য দীর্ঘসময় সূর্যস্নান বেশ উপকারী।     

 

এ অঞ্চলে অতি বেগুনি রশ্মির স্বল্পতা সূর্যস্নানের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে বেশ সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া মৃত সাগরের লবণাক্ত কাদা ঔষধি ও প্রসাধনীর কারণে প্রসিদ্ধ। নানা ধরনের চর্ম চিকিৎসায় কাদা ব্যবহার হয়। পর্যটকরা এ প্রাকৃতিক প্রসাধনী হিসেবে এই কাদা গায়ে মেখে সূর্য স্নান করে। এ অঞ্চলে সূর্যের আলোতে অতিবেগুনি রশ্মি স্বল্পতা উপযুক্ত সৃষ্টি করে।

 

 

এ হ্রদে কোন উদ্ভিদ বা মাছ বাঁচে না বলেই মূলত একে মৃত সাগর বলা হয়ে থাকে। কেবল সামান্য কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক অণুজীবের সন্ধান পাওয়া যায়, মৃত সাগর তীরবর্তী পাহাড়ী অঞ্চলে উট, খরগোশ, খেকশিয়াল এমনকি চিতাবাঘ দেখতে পাওয়া যায়। অতীতে জর্ডান নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে প্যাপিরাস এবং পাম গাছে সমৃদ্ধ বনভূমির অবস্থান ছিল।

 

বিগত কয়েক শতাব্দীতে মৃত সাগরের আয়তন পরিবর্তিত  হয়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে। বর্তমানে এ সাগরের গভীরতা সবচেয়ে কম। অতীতে বহুবার মৃত সাগরের গভীরতা কমে গেলেও পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি অনুযায়ী এ সাগরের বৃদ্ধির কোন সুযোগ নেই। কারণ ১৯৬০ এর দশকে ইসরায়েল মৃত সাগরে পতিত জর্ডান নদীর গতি পথ পরিবর্তন করে দেয়।  তারপর জর্ডানে ইয়ারমুখ নদীর গতি পথ পরিবর্তন করে দেয়। ফলে মৃত সাগর আবদ্ধ হয়ে পরে। এরপর থেকে বাইরের কোন প্রাকৃতিক পানির উৎস মৃত সাগরে গিয়ে পতিত হয়নি। বিগত ৫০ বছরে মৃত সাগর সমুদ্র পৃষ্ঠে থেকে  প্রায় ৪২০ মিটার বেশি নিচে নেমে গেছে।

 

 

সমুদ্রের পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে বেড়ে গেছে এ জলের লবণাক্ততার পরিমাণ। মৃত সাগরের কোন শাখা প্রশাখার না থাকায় শুধুমাত্র সূর্যের তাপে এর পানি বাষ্পীভূত হয়ে  যাচ্ছে। পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে গেলেও এতে দ্রবীভূত লবণ তলানি হয়ে পড়ে থাকে, ফলে দিন দিন লবণাক্তে পরিণত হচ্ছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫ মিটার করে এই সাগরের জলের স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।


ইসরায়েল ও জর্ডান মৃত সাগরের সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত একত্রিত হয়ে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে নাই। বরং মৃত সাগরের পাড়ে প্রতিযোগিতা মূলক ভাবে দালানকোঠা, শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এখানকার  খনিজ সম্পদ গুলো ব্যবহার করছে এই দুই দেশ। খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য গড়ে উঠেছে অসংখ্য কারখানা। এগুলো কারখানার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে মৃত সাগরের পানি, আবার পানি বাষ্প করে দিচ্ছে। দুই দেশের জন্যই এটা অনেক লাভজনক ব্যবসা। এসব  শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য  দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে মৃত সাগর এমনকি মৃত সাগর কে মেরে ফেলার জন্য দায়ী তারাই। মৃত সাগরের খনিজ সম্পদ অস্বাভাবিক ভাবে আহরণের কারণে ধীরে ধীরে  ধ্বংস করার জন্য সবচেয়ে জঘন্য ভূমিকা পালন করছে। 

 

 

খনিজ উপাদান এর ভরপুর ভৌগোলিকভাবে অনুপম মৃতসাগর নিজেই বর্তমানে মৃতপ্রায়। এ সাগর কে কেন্দ্র করে পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নেই। যে যেভাবে খুশি গড়ে তুলছে বিলাসবহুল হোটেল, আবাসিক, রেস্তোরাঁ।