প্রকৃতির নিসর্গ হাজারি খিল

প্রকৃতির নিসর্গ হাজারি খিল
প্রকৃতির নিসর্গ হাজারি খিল
হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় চা বাগান পিছনে ফেলে, ঢুকে গেলাম অবারিত বুনো সবুজের গালিচায় মোড়ানো ঝিরি পথে। মূল হাইকিং-ট্র্যাকিং এবার শুরু। সবার চোখে-মুখে এবার আনন্দের ঝিলিক। কারণ জঙ্গলি পথের ভ্রমণ অভিযানগুলো, দে-ছুটের বন্ধুদের বেশিই বেশি টানে। ছোটবড়ো, পাহাড়, ঝিরি, খুম পেরিয়ে ছুটছি বনমানুষের গুহার দিকে। হাঁটছি আর দেখছি। পুরোই বুনো পরিবেশ। কোনো কোনো গাছের ডালগুলো দূর থেকে দেখে মনে হয়, যেন সাপ পেচিঁয়ে রয়েছে। অদ্ভুত সব ব্যাপার-স্যাপার। মাঝেমধ্যে ঘনজঙ্গলে সূর্যের আলো মুখ লুকায়। আমরা ছাড়া আর কোনো পর্যটকের দেখা নেই। কিছু কিছু পাথরের আকৃতি এমন, যেন বনমানুষের পায়ের ছাপ পাথরে বসেছে। এরকম রোমাঞ্চকর পথে, সুইটবয় শাকিলের জীবনের প্রথম অ্যাডভেঞ্জার ট্যুর। কিন্তু তাকে দেখে বুঝা মুশকিল। পুরো টিমের খাবারের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটছে একাই।

গেল ঈদের ছুটিতে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরা ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম যে, কোন দিকটায় যাব। পাহাড়, সমুদ্র নাকি হাওর। এদিকে সংগঠনের অপেক্ষাকৃত নবীনরা বেশ প্যারা দিতে থাকল। চিফ অর্গানাইজার হিসেবে আমার হয়েছে যত জ্বালা। যদি ভ্রমণ সার্থক হয় তাহলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বখিলতা। আর যদি নিরাশ হয়, তাহলে আগেপিছে ফুচুরফাচুর করতেÑথাকে না কোনো দ্বিধা। যদিও দে-ছুট কোনো কমার্শিয়াল গ্রুপ না। তবু কথা থেকে যায়। এসব কিছু বিবেচনা করেই ঈদের রাতে ছুটলাম, হাজারিখিল অভয়ারণ্যের গহিনে থাকা বনমানুষের গুহা দেখতে। সঙ্গীরা তখনো কেউ জানে না, কোথায় যাচ্ছি। স্থান নির্ধারণে আমি পুরোই স্বাধীন। যারফলে উপভোগ্য একটা ভ্রমণ উপহার দেওয়ার জন্য, বাড়তি একটা মানসিক চাপ থেকেই যায়। আমি আর চালক শুধু দুজনেই জানি, মাইক্রো যাচ্ছে ফটিকছড়ি। ঈদের রাত, তাই সড়কে নেই কোনো যানজট। নানান গল্পে সবাই মেতে রয়েছে। কিন্তু কেউ তেমন সাহস পাচ্ছে না জিজ্ঞাসা করতে। আসলে যাচ্ছিটা কোথায়। রাত প্রায় সাড়ে তিনটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে।

আমার ফোন পেয়ে হাজারিখিল ইকো ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিষ দাদার কানখাড়া। এত রাতে কেমনে আসলেন দাদা। আরে দাদা দে-ছুট বলে কথা। তিনি আর দেরি না করে, সিকুইরিটি গার্ডকে যা বলার বলে দিলেন। শেষরাতে তাঁবু টানানোর সুযোগ নেই। তাই আমাদের ঠাঁই হলো অফিস রুমে। যে-যার মতো বেডিং বিছিয়ে চিৎপটাং। চোখটা লাগতে না লাগতেই ভিন্নরকমের স্বরের অনবরত মোরগের ডাক। ঘুম ঘুম চিত্তে ভাবলাম, হবে কোনো পাহাড়ি মোরগের ডাক। কিন্তু নাহ, একটা সময় ভালো লাগবে তো দূরে থাক, বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লাম। দেখলাম কমবেশি সবাই বিরক্ত। বড়ো গলায় পরিচয় দেয়া, চৌধুরী বংশের রাকিবও বিরক্ত। কিন্তু কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। সবাই যখন বিরক্ত হয়ে ডাকের উৎস খোঁজায় ব্যস্ত, তখন সারাদিন ভালো-মন্দ মানুষের ভিড়ে থাকা মেহেদি উকিল আবিষ্কার করল,আওয়াজটা রাকিবের ব্যাগ হতেই আসা। অথচ সেই জানে না। তখন ওর সঙ্গে হাসব নাকি রাগ করব বুঝে উঠার আগেই বলল, তার মেয়ে বাপের টাইম মতো ঘুম ভাঙানোর জন্য এই অর্গানিক এ্যালার্মটা দিয়েছে। ওর কথায় সবার রাগের পারদ নিচে নেমে, হাসির ঢেউ খেলালো। আবারো ঘুমানোর চেষ্টা। কিন্তু ঘুম আসার আগেই গাইড মান্নানের হাঁকডাক। ত্বরিত গতিতে ফ্রেস হয়ে ছুটলাম নাশতা খেতে। ভরপুর নাশতা করল সবাই। কারণ সারাদিন আর তেমন দানাপানি পড়বে না পেটে।


বেলা প্রায় সাড়ে নয়টা। ছুটলাম এবার মূল অভিযান বনমানুষের গুহা’র পথে। নয়ন জুড়ানো চা বাগান ঘেরা মেঠোপথে হেঁটে চলছি। গাছে গাছে পাকা কঠাল ঝুলে আছে। কোনো কোনো গাছে কাঠাল পেকে নষ্ট হচ্ছে। তবু খাওয়ার জন্য যেন কোনো মানুষ নেই। কিন্তু শহুরে দামালরা, দেখতে দেখতে আর লোভ সামলাতে পারল না। ছোঁচার মতো অনুমতি নিয়ে কাঠাল খেয়েই ছাড়ল।ওরা কাঠাল ভাঙার পর আমিও আদেখলার মতো কয়েক কোয়া খেয়ে ফেললাম। আহ্ কি রসালো টেস্ট। পুরো সিজনে যা খেতাম তা আজ একবসাতেই সাবাড়। খেয়েদেয়ে চেটেপুটে আবারো হাঁটা। এরই মধ্যে রফিক ভাইর ফুচুরফাচুর শুরু হয়ে গেছে। ‘ও জাভেদ ভাই, আমরা কি এই চা বাগানের ভিত্তরে দিয়াই হাঁটুম। তাকে বললাম হ ভাই।’ কিন্তু আমি ত জানি যাচ্ছিটা কোথায়। যাওয়ার পর তখন জোঁকের কামড় খেয়ে, থাকবে সব দৌড়ের উপরে।


হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় চা বাগান পিছনে ফেলে, ঢুকে গেলাম অবারিত বুনো সবুজের গালিচায় মোড়ানো ঝিরি পথে। মূল হাইকিং-ট্র্যাকিং এবার শুরু। সবার চোখে-মুখে এবার আনন্দের ঝিলিক। কারণ জঙ্গলি পথের ভ্রমণ অভিযানগুলো, দে-ছুটের বন্ধুদের বেশিই বেশি টানে। ছোটবড়ো, পাহাড়, ঝিরি, খুম পেরিয়ে ছুটছি বনমানুষের গুহার দিকে। হাঁটছি  আর দেখছি। পুরোই বুনো পরিবেশ। কোনো কোনো গাছের ডালগুলো দূর থেকে দেখে মনে হয়, যেন সাপ পেচিঁয়ে রয়েছে। অদ্ভুত সব ব্যাপার-স্যাপার। মাঝেমধ্যে ঘনজঙ্গলে সূর্যের আলো মুখ লুকায়। আমরা ছাড়া আর কোনো পর্যটকের দেখা নেই। কিছু কিছু পাথরের আকৃতি এমন, যেন বনমানুষের পায়ের ছাপ পাথরে বসেছে। এরকম রোমাঞ্চকর পথে, সুইটবয় শাকিলের জীবনের প্রথম অ্যাডভেঞ্জার ট্যুর। কিন্তু তাকে দেখে বুঝা মুশকিল। পুরো টিমের খাবারের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটছে একাই। ভাবখানা এমন মনে হয়, সে যেন কিলিমানজারো পর্বত ফেরৎ। যাক বাবা, প্যানপ্যানানো রোগীদের চাইতেÑ তাও ভালো। এই বনটি হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যর আওতাধীন। এখানে রয়েছে ২৫০ প্রজাতির গাছ ও ১৫০ প্রজাতির পাখি। এই বনে দেশের বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচুবৃক্ষ হিসেবে পরিচিত, বিরল প্রজাতির বইলাম গাছও রয়েছে। প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বনকুকুর, বনমোরগ, তক্ষক, গিরগিটি, মুখপোড়া হনুমান, বানর, গুইসাপ, বড়ো অজগর, হরিণ, মেছোবাঘ, বন্যশূকর ইত্যাদি। ২০১০ সালে ২ হাজার ৯০৮ হেক্টর পাহাড়ি অঞ্চল ঘিরে সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয় এই অভয়ারণ্য। নানান গাছগাছালির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর, টালি, বাশঁপাতা, সিভিট, জারুল, লোহাকাঠ, ছাতিয়ান, গুটগুটিয়ান, লটকন ইত্যাদি। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় তিনঘণ্টা পর, বন মানুষের গুহার ভাব দেখতে পেলাম। চরম উদ্দীপনায় আগাতে থাকলাম। এখনকার পথটা যেন আসলেই বনমানুষের চলাচল উপযোগী। দুপাশের পাহাড় সরু হয়ে এসেছে। কখনো কোমর কখনোবা আবার প্রায় বুক সমান পানি কেটে এগিয়ে গেলাম। আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে ধরা দিল অজস্র পাথরের বোল্ডার। খুবই পিচ্ছিল পাথুরে পথ। কত বছর কে জানে, এ পথ মাড়ায় না কোনো মানবের দল। পা’ পিছলালেই নিশ্চিত ভাঙবে কোমর। একে একে সবাই খুব সাবধানে এগিয়ে যাই। টগবগে তারুণ্যের প্রতীক হাসিবের কল্যাণে, আমার মাত্রাতিরিক্ত ওজনের দেহটাও এগিয়ে যায়। একটা সময় পৌঁছে যাই সেই কাক্সিক্ষত বন মানুষের গুহায়। ওয়াও-পুরোই গা ছমছম করা বন্য পরিবেশ। রয়েছে নানান আকৃতির পাথরের ছড়াছড়ি। পাহাড়ের গায়ে ছোট-বড়ো গর্ত। বিষাক্ত চেলার অবাধ বিচরণ। রিমঝিম ছন্দতোলা ঝরনা। মাথার উপর দিগন্ত ছোঁয়া গাছের সারি। দু’পাশের পাহাড় চেপে আসায়, মধ্যদুপুরেও ভরসন্ধ্যা পরিবেশ। সব মিলিয়ে অসাধারণ মুহূতের্, ভালো লাগার মতো জায়গাÑবনমানুষের গুহা। কেন কী কারণে এর নাম এরকম হয়েছে, তা এই জনমানব শূন্য স্থানে কারো কাছে জিজ্ঞাসা করে জানার সুযোগ ছিল না। তবে জায়গাটা বনমানুষের গুহা নামকরণের যথেষ্ট সার্থকতা রয়েছে।  


যাই চলে যাই, এবার ভান্ডারিয়া ঝরনা। জানতাম তেমন পানি পাব না। তবু আগালাম মায়াবী বুনোপথের জঙ্গলী ফুলের সুবাস নিতে। এই অভয়ারণ্যে দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির পাখ-পাখালিসহ মথুরা, দোয়েল, শালিক, টিয়া, ঘুঘু, বক, চড়–ই, ময়না ইত্যাদি পাখির দেখা মিলে। ঝিরি ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর যেতেই চোখ চড়কগাছ। বড়োসড়ো কোনো এক প্রাণীর পায়ের ছাপ। গাইড জানাল এটা বড়ো কোনো ভালুকের। উত্তেজনার মাত্রা আরো বেড়ে গেল। তারপরেও আরো শিওর হতে, বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা অপু নজরুলকে পায়ের ছাপ দেখানোর পর, উনি নিশ্চিত করলেন এটা বিপন্ন প্রজাতির বিরল প্রাণী এশিয়ান ব্লাক বেয়ার। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গাইড লিস্টের উল্লেখ নাই। যাক সেসব তাত্ত্বিক কথাবার্তা। বেশ খোশ মেজাজে এগিয়ে যাই। বুনো পথের ট্রেইলগুলোর প্রতিটাই ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য নিয়ে চোখে ধরা দেয়। যা কাগজে কলমে শত পৃষ্ঠা লিখেও বোঝানো দায়। প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাই ভান্ডারিয়ার প্রান্তে। বেলা প্রায় তিনটা। সবার পেটেই কমবেশি চো-চো। তাই চটজলদি সঙ্গে নেওয়া নুডলস রান্নার জন্য, গরম পানি বসিয়ে দেয়া হলো। এই ফাঁকে ঝরনার জলাশয়ে নিজেদের পুকুর ভেবে, জলকেলিতে মেতে উঠলাম মহানন্দে। গোসল শেষে নুডলস চেটে-পুটে খেয়েদেয়ে ছুটলাম পাহাড়চূড়া বেয়ে, নতুন এক ট্র্যাকিং রুটের সন্ধানে। গাইডের ভাষায় গাড়ির রাস্তা। কিন্তু আমরা দেখলাম চরম এক জঙ্গলিপথ। পথ বললে ভুল হবে। হরেককিসিমের জোঁকের রাজত্ব। অল্প সময়ের ব্যবধানেই কম-বেশি সবার দেহ রক্তে লালে লাল। ছোট্ট বেলার সেই ডায়ালগটা মনে পড়ে গেল, লালে লাল শাহজালাল। তবু দেহের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। একটা জোঁক ছাড়াতে গেলে আরো কয়েকটায় জড়িয়ে ধরে। দেহে জোঁকের তেলেসমাতি নিয়েই রাত প্রায় নয়টা পর্যন্ত ট্র্যাকিং করে ফিরতে হলো বাংলোতে। এবার টের পাচ্ছি কারে কয় রক্ত। বহু কষ্ট করে স্কচটেপ লাগিয়ে, রক্ত থামিয়েই শুরু হলো বার-বী-কীউ। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র ভ্রমণে বার-বী-কীউ নাহলে যেন চলেই না। আজ থাক এই পর্যন্তই। আগামী কোনো সংখ্যার জন্য তুলে রাখলাম, পরদিন সকালে অংশ নেওয়া অ্যাডভেঞ্চা ট্রি’র গল্প।

 


মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
ছবির ছৈয়াল : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ