প্রকৃতিকন্যা তুরং ছড়া’র মায়াবি হাতছানি

তুরং ছড়া’র  মায়াবি হাতছানি
তুরং ছড়া’র মায়াবি হাতছানি
মটর বাইক থেকে নেমেই হই আশ্চর্য! একি মানুষ যতদূর খোঁজ পেয়েছে- তার চাইতেও ছড়িয়ে আছে, অনেক অনেক বেশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। অনেকটা সময় কাটিয়ে যাই এবার তুরং ছড়ার পানে। ভোলাগঞ্জের ফারুক ভাই জায়গাটার খোঁজ দিয়েছেন। হাফিজ ভাইয়ের বাইকে চড়ে ছুটি।

বৃষ্টিভেজা গভীর রাতে সুনসান নিরিবিলি রাজপথে গাড়ি চলছে শাঁ শাঁ করে। ঢাকা ছাড়ার পর বাতিহীন অন্ধকার পথের শুরু। তবে ঘুটঘুটে অন্ধকারেরও আলো আছে। সেই আলোর অনুভূতি ভিন্ন শিহরনের। সকাল ৯টার মধ্যেই সিলেটের বাদাঘাট পৌঁছাই। আগে থেকেই আমাদের জন্য নোঙ্গর করা ছিল বিশাল এক বালুর কার্গো। নয়জনের জন্য কমপক্ষে তিনশজন ধারণ ক্ষমতার কার্গো। এ যেন মশা মারতে কামানের গোলা। বাদাঘাট হতে কার্গো ছেড়ে যখন ডাকাতি হাওড়ে পড়ে তখন প্রকৃতির কি যে অনিন্দ্য রূপ তা বুঝানো যাবে না। একটা জায়গায় তো মনেই হবে আপনি সিলেট নয় সুন্দরবনের কোনো সরু খাল দিয়ে যাচ্ছেন। এক কথায় ওয়াও ! হাওড় শেষে ধলাই নদী। সে আরেক নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের ছড়া কবিতা। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর কোম্পানিগঞ্জের দয়ার বাজার পৌছি। সিলেট টুরিস্ট ক্লাবের সদস্য সজ্জন ব্যক্তি জামান ভাই, আমাদেরকে জায়গা দিলেন তাঁর বাড়িতে। জুম্মার নামাজ পড়ে খেয়ে দেয়ে বিকালটা কাটাই মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ। 


সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। বাজার হতে চাল-ডাল-মুরগি-তেল-মশলা কিনে আশ্রয় পাওয়া বাড়ির বিশাল উঠানেই চলে বার-বি-কিউর প্রস্তুতি। সঙ্গে লেটকা খিচুড়ি। খেয়েদেয়ে যাই এবার ঘুমোতে। পরদিন সকালে ছুটি উৎমা ছড়ার পথে। কিছুটা পথ চলার পরেই চোখ আটকাবে অধরা পাহাড়ের সবুজ গালিচায় মোড়ানো ক্যানভাসে। আরো কিছুটা পথ এগুলে- পাহাড়ের গা বেয়ে অবিরাম ধারায় নেমে আসা ঝরনার অট্টহাসি সঙ্গী করে পৌছে যাবেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের উৎমা ছড়ার বাহুতে। মটর বাইক থেকে নেমেই হই আশ্চর্য! একি মানুষ যতদূর খোঁজ পেয়েছে- তার চাইতেও ছড়িয়ে আছে, অনেক অনেক বেশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। অনেকটা সময় কাটিয়ে যাই এবার তুরং ছড়ার পানে। ভোলাগঞ্জের ফারুক ভাই জায়গাটার খোঁজ দিয়েছেন। হাফিজ ভাইয়ের বাইকে চড়ে ছুটি।

যতই এগিয়ে যাই ততই যেন মুগ্ধতা ভর করে। সে এক অপার্থিব অনুভূতি। নৈঃশব্দ্যের মায়াবী পথের দৃশ্য- আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে থাকা দিগন্ত ছোঁয়া পাহাড়, সেই পাহাড়ে ঘুমিয়ে থাকা শুভ্র মেঘের ভেলা-নীল আসমানের আলোকরশ্মি, বাঁশ বাগানের ছায়া, বিস্তৃত ফসলের মাঠ সব মিলিয়ে অবারিত প্রকৃতির মায়াবি হাতছানি। বাইক ছেড়ে এবার গ্রামের মেঠোপথ ধরে সামান্য কিছু পথ মাড়িয়ে হাজির হই প্রকৃতি কন্যা তুড়ং ছড়ার জমিনে। চারপাশ সুনসান নিরিবিলি। নিঝুম নিস্তব্দতার তুরং ছড়ার একমাত্র সঙ্গী পাথরের গা ভিজিয়ে অবিরাম ধারায় ধেয়ে আসা স্বচ্ছ পানির কলকল শব্দ। এমন নয়ন জুড়ানো প্রকৃতির কাছে হার মেনে আবারো নিজেদের সমর্পণ করি হিমহিম স্ফটিক শীতল স্বচ্ছ পানিতে। তুরং ছড়াকে অনেকে কূলী ছড়া নামেও ডেকে থাকে। দু-চারজন বাসিন্দা যাও দেখলাম- তাঁরাও যেন প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে শান্ত কোমল। অপার সৌন্দর্যের তুরং ছড়ার ধবধবে সাদা পানি, সবুজ বৃক্ষ, লালচে, বাদামিরঙা পাথর সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ। পানির স্বচ্ছতা এতটাই যে, হাটু সমান পানির নিচের পাথরগুলোও স্পষ্ট দেখা যায়। আরো দেখা যাবে উজান থেকে ভাটিতে পানি নামার অভূতপূর্ব দৃশ্য।

তুরং ছড়ার ভৌগোলিক 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অবগাহন কয়েক পাতা লিখেও শেষ হবার নয়। যা শুধু সচক্ষে দেখে অনুভব করা সম্ভব। আমাদের তুরংছড়া ভারতের চেরাপুঞ্জি লাগোয়া। এবার বিদায়ের পালা, পাথর আর মায়াবিনী প্রকৃতির রাজ্য থেকে। কিভাবে যাবেন : ঢাকার  গাবতলী ও সায়েদাবাদ হতে সিলেটে যাবার বিভিন্ন পরিবহনের দিনে রাতে বাস সার্ভিস রয়েছে। এছাড়া ট্রেন ও আকাশপথেও যাবারও সুযোগ রয়েছে। সিলেট শহরের আম্বরখানা হতে সি.এন.জি তে কোম্পানিগঞ্জ দয়ার বাজার। অথবা নদীপথের সৌন্দর্য দেখতে চাইলে, সিলেটের বাদা ঘাট হতে নৌপথে দয়ার বাজার। সেখান থেকে আবারো সিএনজি’তে চড়ে, মাত্র বারো কিলোমিটার দূরবর্তী চড়ার বাজার যেতে হবে। বাজার হতে দশ মিনিট হাঁটলেই মিলে যাবে উৎমা ছড়ার সৌন্দর্য। আর তুরং ছড়া যাবার জন্য ভাড়ায় চালিত মটরবাইক রয়েছে।

 
থাকবেন কোথায়, খাবেন কী :

ঢাকা থেকে আগের দিন রাতে রওনা দিয়ে পরের দিন সারাদিন ঘুরে আবারো ফিরে আসতে হবে সিলেট শহরে। দয়ার বাজারে খাবারের হোটেল পাবেন। রাতে থাকার জন্য সিলেট শহরে মিলবে নানান মানের আবাসিক হোটেল।



ছবি : হাফিজুর রাহমান ও ‘দে-ছুট’