মুমূর্ষু রোগীদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করছে রুমা’স কিচেন

মুমূর্ষু রোগীদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করছে রুমা’স কিচেন
মুমূর্ষু রোগীদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করছে রুমা’স কিচেন
এই সেবা কতদিন চলবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইচ্ছে আছে যতদিন বেঁচে আছি চালিয়ে যাওয়ার। তবে সাধারণ রোগীর লোকজনও চাইছে, না করতে খারাপ লাগে কিন্তু আমারও তো সীমাবদ্ধতা আছে, ফান্ডিং এর ব্যপার আছে। বাবার মৃত্যুর ৪০ দিন পর্যন্ত সবাইকে দিব, তারপর থেকে দিব শুধু অসুস্থ বাবা-মা আর হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীদের।”

২৪ জুলাই। হৃদরোগে আক্রান্ত বৃদ্ধ বাবা হার্ট অ্যাটাক করে চলে যান না ফেরার দেশে। প্রিয়জন হারানোর এমন কঠিন সময়ে যখন মানুষ শোকে পাথর হয়ে যায় ঠিক তখন সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে মানবী থেকে মহামানবী হয়ে উঠেন কানিজ ফাতেমা রুমা। শুরু করেন হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীদের জন্য বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করার এক অসাধারণ উদ্যোগ।

 

গৃহিণী হলেও উদ্যোক্তা হিসেবে ইতোমধ্যেই নিজের ভিন্ন পরিচয় গড়ে তুলেছেন ৪৬ বছর বয়সী রুমা। তার অনলাইন রান্নাঘরের নাম “রুমা’স কিচেন”। সেখানে সাধারণত পাওয়া যায় কেক, স্ন্যাকস ও নানা ধরনের ডেজার্ট।

 

 

মৃত্যুর আগে মুমূর্ষু অবস্থায় রুমার বাবা যখন কিছু খেতে পারছিলেন না তখন নিজ হাতে খিচুড়ি, স্যুপ, সাগু ইত্যাদি নরম খাবার রান্না করে খাইয়েছেন। উপলব্ধি করেছেন মুমূর্ষ রোগীদের কষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে এসব পরিস্থিতিতে স্বজনরাও বুঝতে পারে না কি করা উচিত কিংবা নরম খাবারও ব্যবস্থা করা যায় না।

 

বাবার মৃত্যুর পরেরদিন একটি ফেসবুক পোস্ট চোখে পড়ে তার যেখানে একজন তার করোনা আক্রান্ত শ্বশুর- শাশুড়ির জন্য ঘরে তৈরি স্যুপ কোথায় পাওয়া যাবে জানতে চেয়েছেন। রুমা তাকে নিজ হাতে স্যুপ তৈরি করে খাওয়ান। আর খুঁজে নেন নিজের বাবাকেই খাওয়ানোর আত্মিক শান্তি।

 

সেই থেকে শুরু। তার পেইজ থেকে ঘোষণা করে দেন “কারও যদি কোন অসুস্থ মানুষের জন্য স্যুপের দরকার হয়, প্লিজ, আমাকে নক দেবেন। শুধু নিজ দায়িত্বে নিয়ে যাবেন বা ডেলিভারি চার্জটুকু শুধু দিয়ে দেবেন। স্যুপের দাম নেওয়া হবে না।” পোস্টটি রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে। প্রচুর সাড়া আসতে শুরু করে।

 

বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে রুমা ছিলেন বাবার অত্যন্ত আদরের। মৃত্যুর আগে তার হাতে হাত রাখা একটি মুহূর্ত ভুলতে পারেন না রুমা। ফ্রেমবন্দী করে রাখা সেই মুহূর্ত যেন জীবন্ত।

 


পাক্ষিক অনন্যাকে তিনি বলেন, “এত বেশি সাড়া পাবো বা আমার কাজটা সবাই এতো মূল্যায়ন করবে তা ভাবতেও পারিনি। বাবার জন্য সদকাহ হিসেবে কাজটা শুরু করেছিলাম। বাবার স্মরণে, বাবার প্রতি ভালোবাসা থেকে। তাই এটা বাবার আশীর্বাদ বলে আমি মনে করি।”

 

এই সেবা কতদিন চলবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইচ্ছে আছে যতদিন বেঁচে আছি চালিয়ে যাওয়ার। তবে সাধারণ রোগীর লোকজনও চাইছে, না করতে খারাপ লাগে কিন্তু আমারও তো সীমাবদ্ধতা আছে, ফান্ডিং এর ব্যপার আছে। বাবার মৃত্যুর ৪০ দিন পর্যন্ত সবাইকে দিব, তারপর থেকে দিব শুধু অসুস্থ বাবা-মা আর হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীদের।”

 

দিনরাত পরিশ্রম করছেন তিনি। রান্না করছেন দুই শিফটে। এ পর্যন্ত ১৩০ এর অধিক রোগীর কাছে পৌঁছে গেছে তার রান্না করা খাবার। পরিবারের সমর্থন না পেলে এই কাজ করা সম্ভব হত না বলে মনে করেন রুমা। তার স্বামী সপ্তাহে দুইদিন বাজার করে দিচ্ছেন আর ছেলে দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে এনে দিচ্ছে, এমনকি এলাকার ডেলিভারিও অনেক সময় সে করছে। রুমা কৃতজ্ঞতা জানান ডেলিভারি সেবা প্রতিষ্ঠান অর্ডার বিডি -কে, যারা বলা মাত্রই খাবার নিয়ে ছুটে যাচ্ছে রোগীর কাছে।

 

এই নারী উদ্যোক্তা আরও বলেন, “আমি মানসিকভাবে খুব শান্তি পাচ্ছি কাজটা করে। এই কাজটা আমাকে চালিয়ে যেতেই হবে, এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে গেছে। আমি সকলের দোয়াপ্রার্থী। তবে আমি চাই দেশের আরও উদ্যোক্তারা এভাবে মানুষের পাশে এগিয়ে আসুক।”