স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তা জুঁই

স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তা জুঁই
জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁই
জুঁই চাকরি-বাকরি নয়, বরং পুরোদমে ব্যবসার কাজে মনোনিবেশ করতে চান। পাশাপাশি শখের মডেলিংও করে থাকেন। ভবিষ্যতে এই ব্যবসার প্রসারের পাশাপাশি খাবারের ব্যবসা ও ডিজাইন কালেকশনেও তিনি নিজের যাত্রা শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

একজন নারী বিনিয়োগকারীর তার পড়াশোনারত অবস্থায় সামান্য পুঁজি নিয়ে গড়ে তোলা অনলাইন বিপণী কেন্দ্র 'জুঁইরিশা ডোর', এখন মূল্যমানের দিক থেকে ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। নাহ স্বপ্ন নয়, বরং সত্যিটাই করে দেখিয়েছেন 'জুঁইরিশা ডোর' এর কর্ণধার জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁই। সদ্য স্নাতক পাশ করা এই নারীর কাছে যা ছিল বছর দুই আগেও অধরা, আজ একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে আলো ছড়াচ্ছেন তিনি অন্য নারীদের মাঝে। আশা দেখাচ্ছেন চাকরির বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা অনলাইন শপিং কেন্দ্রিক ব্যবসার প্রসারে।

 

জুঁই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে মাস কয়েক হল ইংরেজি বিভাগ হতে স্নাতক পাশ করেছেন। কিন্তু তার অনলাইন শপিং ব্যবসার যাত্রা ঘটে পড়াশোনারত অবস্থাতেই। ২০১৮ সালে প্রথম 'ক্লোথিং ডোর' নামক ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তিনি অনলাইন শপিং ব্যবসায় পা রাখেন। কিন্তু সফলতার মুখ দেখার পাশাপাশি নানা প্রযুক্তিগত ও সামাজিক প্রতিকূলতার সম্মুখীনও হতে হয় তাকে। তাই 'ক্লোথিং ডোর' তার আলো ছড়ানোর আগেই দমে যায় জুঁই, থেমে যায় 'ক্লোথিং ডোর'- এর যাত্রা।

 

যে মেয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই নিজেকে স্বাবলম্বী করতে করেছেন একাধিক অফিসে চাকরি, জীবনযুদ্ধে নিজে থেকে হতে চেয়েছেন প্রতিষ্ঠিত; তার ইচ্ছার কাছে কোন বাঁধা-বিপত্তি টিকবে না সেটাই তো স্বাভাবিক। ২০হাজার সদস্য বিশিষ্ট প্রথম গ্রুপ ও পেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, জুঁই 'জুঁইরিশা ডোর'-এর যাত্রা শুরুর মাধ্যমে তার মনোবলের পরিচয় দেন। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে 'জুঁইরিশা ডোর', যখন জুঁই এর ব্যবসায়িক অবলম্বন ছিল বাবা-মার দোয়া আর নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি। সেই ব্যবসাই আজকে দেশ থেকে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। 'জুঁইরিশা ডোর' এর প্রোডাক্ট এবং ক্রেতা দেশ এবং দেশের বাইরে এর সুনাম ছড়াচ্ছেন।

 

কোভিড সংক্রমণের এই নাজুক সময়ে জুঁই হারিয়েছেন তার পিতাকে। একদিকে পিতা হারানোর শোক, অপর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা। তার পাশাপাশি সাহসিকতার সাথে  চালিয়েছেন 'জুঁইরিশা ডোর' এর যাত্রা। এজন্য তিনি বারংবার শুকরিয়া জ্ঞাপন করেছেন সৃষ্টিকর্তার নিকট। ছোট ভাই ও মা নিয়ে তার বর্তমানে সাজানো পরিবারের প্রধান, মা নাছিমা আক্তার একজন সমাজকর্মী এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার সাথেও জড়িত। তাই মেয়েকে সাহস জোগানোর পাশাপাশি, একজন নারী হিসেবে সামাজিক সম্মান প্রতিষ্ঠায় দিয়ে যাচ্ছেন সব ধরনের সহযোগিতা। 

 

জুঁই জানান, 'আমাদের সমাজে নারীদের স্বাবলম্বী হতে গেলে নানা কাঠ খড়ি পোড়াতে হয়। কিন্তু নারী স্বাবলম্বী হলে তা আমাদের পরিবার ও সমাজের জন্য কতটা উপকার বয়ে নিয়ে আসতে পারে তা চিন্তা করার অবকাশ নেই কারো। আমার মা, আমাকে সবসময়ই পরামর্শ ও সামগ্রিক যে কোন বিষয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন, বাবা বেঁচে থাকতেও করেছেন। সুতরাং মেয়ে সন্তানদের স্বাবলম্বী করতে তাদের অভিভাবকদের আরো বেশি মনোযোগ থাকা দরকার, যার কোন বিকল্প হতে পারে না।'

 

অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ও দোষারোপ ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে দেখা যায়। এই ধরনের সমস্যা নিরসনে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবহারের প্রসার চান জুঁই। তিনি জানান, 'বর্তমানে অধিকাংশ অভিযোগ বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে, কিন্তু অধিকাংশ প্রোডাক্ট ডেলিভারির সময় আমাদেরকেও অনেক হেনস্থার শিকার হতে হয়। অনলাইন শপিং এর ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে। যে সকল প্রতারণামূলক পেজ বা সাইট আছে তাদের বিরুদ্ধে যেমন আইনের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি সুস্থধারার অনলাইন ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিক্রেতারা যখন হেনস্থার শিকার হয় তখনও সহজ উপায়ে আইনি সহযোগিতা লাভ খুব জরুরি।'

 

'জুঁইরিশা ডোর' গত দেড় বছরে প্রায় ৪৫ হাজার ফেসবুক একাউন্টের লাইকে সমৃদ্ধ। এর কর্ণধার জান্নাতুল ফেরদৌস জুঁই জানান, 'আমি মূলত নারীদের পোশাক ও প্রোডাক্ট বিক্রি করি আমার পেজে। নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্রেতা ও প্রোডাক্ট নিয়ে এখন পর্যন্ত আমার আনাগোনা। তাই পেজ বুস্ট করা বা টাকা দিয়ে প্রচারণা চালানোরও প্রয়োজন মনে করিনি কখনো।'

 

জুঁই চাকরি-বাকরি নয়, বরং পুরোদমে ব্যবসার কাজে মনোনিবেশ করতে চান। পাশাপাশি শখের মডেলিংও করে থাকেন। ভবিষ্যতে এই ব্যবসার প্রসারের পাশাপাশি খাবারের ব্যবসা ও ডিজাইন কালেকশনেও তিনি নিজের যাত্রা শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে, আপাতত 'জুঁইরিশা ডোর'কে ঘিরে তার কর্মপরিকল্পনায় তিনি পুরোদস্তুর ব্যস্ত।