আমি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলাম: আল মাহমুদ

কবি আল মাহমুদ
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যর প্রধানতম কবিদের একজন। তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। কবির মৃত্যুর আগে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কবি শ্যামল চন্দ্র নাথ।

 

 শ্যামল: একজন আল মাহমুদ যাকে কেউই চিনতো না, যিনি একটি খালি ব্রিফকেস নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সাহস করে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছিলেন। সেই আল মাহমুদ আর এখনকার আল মাহমুদের সঙ্গে নিজেকে মেলান কিভাবে?

 

আল মাহমুদ : আমার তেমন কিছু মনে হয় না। গরীব পরিবারে জন্মেছি। নিজের শ্রমে নিজেনিজে উঠে এসেছি। পরিচিত হয়েছি। লেখাই আমাকে পরিচিত করেছে।

 

শ্যামল : আপনার কবিখ্যাতি শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে গিয়েছে। এ যাত্রাটা নিশ্চয় সহজ ছিল না?

 

আল মাহমুদ : আমার শ্রম আছে। লেখা তৈরি করতে হয়। লেখার জন্য প্রচুর পড়তে হয়। সমস্ত অন্তরাত্মা দিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি। ধীরেধীরে লেখার খ্যাতি থেকে প্রতিপত্তি আমার সহায় হয়। এই আর কী! তারপর আস্তে আস্তে আমার লেখা বাংলাদেশেরে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। আমার শ্রম আছে, পরিভ্রমণ আছে। সারা পৃথিবী আমি ঘুরেছি। সমস্ত বড় শহর। ইংল্যান্ড, প্যারিস, নিউইয়র্ক। পৃথিবীর বড় বড় শহরের ফুটপাত ধরে আমি হেঁটেছি। এর পিছনে আমার জানার আগ্রহ ছিল। দেখার আগ্রহ ছিল। সবচেয়ে বেশি ছিল পরিশ্রম।

 

শ্যামল : সমালোচকরা বলেন যে কবি আল মাহমুদ তাঁর আগের চিন্তাচেতনা থেকে অনেকটা সরে এসেছেন।

 

আল মাহমুদ : এটা সত্য না। আমার চিন্তাচেতনার পরিবর্তন এসেছে পড়তে পড়তে। খ্যাতি, প্রতিপত্তি তো আর এমনি এমনি হয়নি। কষ্ট করতে হয়। আল্লাহ খ্যাতি, প্রতিপত্তি মানুষকে দেন। আমাকেও দিয়েছেন।

 

শ্যামল : যখন বাড়ি থেকে চলে এলেন ঢাকায় তখন আপনি কি ধরে নিয়েছিলেন কবিতা লেখাই আপনার কাজ বা কবিতাই আপনার সব?

 

আল মাহমুদ : আমি তো কবি হতেই চেয়েছিলাম। মানুষ তো এখন আমাকে কবি বলেই ডাকে। এটা আমার ভাল লাগে। এর চেয়ে আর বড় প্রাপ্তি কী হতে পারে আমার জীবনে। আমি যা হতে চেয়েছিলাম আমি তাই হয়েছি। কবিতাই তো আমার সব হয়ে গেল।

 

শ্যামল : কিভাবে আপনার ভিতর এই আত্মবিশ্বাস জন্মালো?

 

আল মাহমুদ : আমি দেখেছি। শিখেছি। প্রচুর পড়েছি। যারা বড় বড় কবি আছে তাদের সাথে মেশার চেষ্টা করেছি। আমার বিশ্বাস এক দিনে তৈরি হয়নি।

 

শ্যামল : এক্ষেত্রে বুদ্ধদেব  বসু’র ‘কবিতা’ পত্রিকায় আপনার কবিতা ছাপানোর কথা কি বলবেন? এরপর তো আপনাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

 

আল মাহমুদ : শ্যামল ঠিক বলেছ। বুদ্ধদেব বসু তো আমাদের সময়কালের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। যখন তাঁর কাছ থেকে চিঠি পেলাম: “তোমার একটি বা দুটি কবিতা ছাপা যাবে মনে হচ্ছে।” ব্যস্ আমার তো আনন্দে পাগল হয়ে যাবার অবস্থা। পরের সংখ্যায় আমার তিনটি কবিতাই ছাপা হয়েছিল।

 

শ্যামল : আপনার লেখা কি কোথাও থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে?

 

আল মাহমুদ : না।  আমি যেখানেই কবিতা পাঠিয়েছি, সেখানেই সাদরে গৃহীত হয়েছে। আমি প্রচুর লিখেছি। আমার প্রকাশনা ভাগ্য ভাল বলতে হবে।

 

শ্যামল : আপনি বাংলা কবিতায় তো এক ভিন্ন ধরণের কাব্যভাষা সৃষ্টি করেছেন। পাশাপাশি গদ্যভাষায়ও আপনার অবদান কম নয়। একসাথে কাব্যে ও গদ্যে ঋদ্ধ হওয়া তো সহজকাজ নয়। কিভাবে এটা সম্ভব হলো?

 

আল মাহমুদ : আমার সাধনা ছিল। চর্চা ছিল। আমি সবসময় ভাবতাম আমার কোমরে দুটি তরবারি। একটি কবিতা আর একটি গদ্য। কোথাও থেকে প্রত্যাখ্যাত হইনি।

 

শ্যামল : কবিতায় কিংবা লেখালেখিতে আপনি প্রত্যাখ্যাত হননি। কিন্তু প্রেমে কি কখনো প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন?

 

আল মাহমুদ : আমি যাকে ভালোবাসতাম তাকে কমিউনিকেট করা মাত্র খুব রিয়েক্ট করেছেন। আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলাম। একে তো গরীব ঘরের সন্তান, অন্যদিকে দেখতে তো আর রাজপুত্র নই। কবিতা লিখে কিছু হয়েছে আর কী!

 

 শ্যামল : আপনার সময়ের সমাজ আপনাকে কিভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল?

 

আল মাহমুদ : প্রথম তো ঢাকায় আসলাম। আমাকে আমার পরিচিত লোকজন আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলাম।

 

শ্যামল : এখন পর্যন্ত আপনার সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ বলে ধরা হয় সোনালি কাবিনকে। এটি স্নাতক পর্যায়েও পঠিত হচ্ছে। আপনি পঞ্চাশের দশকে বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। তা হলো লিরিকধর্মিতা, যা আপনার কবিতাকে বিশেষ বৈশিষ্ঠতা দান করেছে।

 

আল মাহমুদ : আমি মনে করি যে, মানুষের জীবন তো লিরিক্যাল মানে গীতিময়তায় আচ্ছাদিত। সেখানে গীতিময়তার যে অভ্যাস বাংলা কবিতার ভিতরে রয়েছে সেটা অব্যাহত থাকবে। কবিতার মধ্যে গীত প্রবণতা, মিল, অন্ত্যমিল এবং অনুপ্রাস এগুলো মানুষ পছন্দ করে। এটা হল বাংলা কবিতার আধুনিক অবস্থান। এটাকে আরো পরিস্রুত করে বইতে দেওয়া উচিত। আমি মনে করি, এতে বাংলা কবিতার উন্নতি হবে।

 

শ্যামল : আপনি একবার বলেছিলেন ‘কবিরা তো প্রকৃতপক্ষে কখনও হার মানে না। যত দিন সে বেঁচে থাকে, ততদিন সে লিখতে চায়।’ আপনি সারা জীবন কবিতা নিয়ে কাটিয়ে দিলেন। যদিও আপনার কবিতার হাতেখড়ি হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা আপনি কিভাবে পেলেন?

 

আল মাহমুদ : আমি তো সব সময়ই বলি, কবি হল বিজয়ী মানুষ। তারা হার মানে না। বা তারা পরাজিত সৈনিক না। কবির আত্মা সব সময় অপরাজিত। এর জ্বলন্ত উদাহরণ কাজী নজরুল ইসলাম। আর আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, ওখানে লালমোহন স্মৃতি পাঠাগার ছিল। এটা পরিচালনা করতো কমিউনিস্ট পার্টি। এটা আমরা তখন জানতাম না। কিন্তু অনেক মূল্যবান বই ওখানে পেয়েছি এবং পড়েছি। কোলকাতায় কোন বই প্রকাশ হলে সেটা একদিন পরই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওই পাঠাগারে পাওয়া যেত। এটা একটা বিরাট ব্যাপার ছিল আমাদের কাছে। আমরা লেখক ছিলাম, কবি ছিলাম। এর জন্য আমরা সারাদিন ওই পাঠাগারে যেতাম।

 

শ্যামল : আপনার সময়কালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি কাকে মনে করেন--এপার ওপার মিলিয়ে?

 

আল মাহমুদ : শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তারা আমার বন্ধু ছিল। আমাদের এখানে শামসুর রাহমানকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। শামসুর রাহমানের কবিতায় রিপিটেশন আছে। 

 

শ্যামল : মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আপনাদের লেখালেখির কী অবস্থা ছিল?

 

আল মাহমুদ : মুক্তিযুদ্ধ এক বিস্ময়কর ঘটনা। আমরা দুঃখ বঞ্চনা অতিক্রম করেছি। সেই সময়ে আমরা লেখাটা বন্ধ করিনি। আমরা কখনো লেখা বন্ধ করিনি। আমরা বন্ধ্যা ছিলাম না।

 

শ্যামল : ১৯৭৫ সালে আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আবু রুশদ মন্তব্য করেছিলেন: “বাংলাদেশে আল মাহমুদের সমতুল্য অন্য কোন কবির হাত থেকে এত কয়টা ভাল গল্প বেরিয়েছে বলে আমার জানা নেই। এটা তার সাহিত্যে ঈর্ষণীয় এক মাত্রা যোগ করবে বলে আমার বিশ্বাস।” এটা আপনার জন্য একটা বড় প্রাপ্তি। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, ‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে আপনি লিখেছেন, ‘নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে আমি সেখানে এক পেশাদার শিকারির মত হাঁটু গেড়ে বাগিয়ে বসলাম।…একটি শ্যামবর্ণ নারীর শরীর নদীর নীলিমায় আপন রক্তের মধ্যে তোলপাড় করছে।’ আপনি কি সত্যি কখনোও শিকার করেছেন এবং আবু রুশদের মন্তব্য সম্পর্কে আপনার কিছু বলার আছে কি?

 

আল মাহমুদ : আমি বন্দুক নিয়ে সে সময় শিকার করতাম। আমার বন্দুকের লাইসেন্স ছিল। আমি বন্দুক চালাতে জানতাম। তবে বেশি দিন নয়, অল্প কয়দিন আমি শিকার করেছিলাম। পরে এই পাখি মারা আমার ভিতর এক ধরণের বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করলো। আমি সেটা আর করলাম না। আমি বন্দুকটা ত্যাগ করলাম। আবু রুশদের এই কথার বিচার তো তোমরা করবে।

 

শ্যামল : আপনার লেখা উপন্যাস ‘উপমহাদেশ’ কিংবা ‘কাবিলের বোন’-কে আপনি সার্থক লেখা বলে মনে করেন?

 

আল মাহমুদ : আমি তো মনে করি। আমি তো মনে করি ‘কাবিলের বোনের’ মতো লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির পরে আমার এই বইটা। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। খুবই উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এর আঙ্গিক, গঠনরীতি এবং ভাষা। এখানে আমাদের মুসলমানদের উত্তরাধিকারের কথা বলা হয়েছে। এরকম একটি বই তো আমি আর দেখতে পাই না।

 

শ্যামল : আপনি একবার বলেছিলেন, ‘কবি হতে গেলে সারা জীবন উৎসর্গ করতে হয়’।

 

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, একটা জীবন দিতে হয়। এটা কোন পার্ট-টাইম জব নয়। একটা পুরো জীবন দিয়ে দিতে হয়। ফিরতে পারে না সে।

 

শ্যামল : আপনি তো এখন ‘ডিকটেশন’ দিয়ে লেখেন। এতে কোন অতৃপ্তি রয়েছে কি? বা আপনার মনে হয় না যে, যদি আমি নিজ হাত দিয়ে লিখতে পারতাম।

 

আল মাহমুদ : আমার খুব মনে হয়। আমি যদি চোখে দেখতে পেতাম! যদি নিজ হাতে লিখতে পারতাম! সেটা তো এখন সম্ভব নয়। মানুষের ইন্দ্রিয় স্বল্পকালীন। কিছুদিন কাজ করে এরপর আর করে না। আমি সারা পৃথিবী ঘুরেছি আমার চোখ দুটো বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমি সেটা পারিনি। তবে আমাকে বলা হয়েছে আপনি পুরো অন্ধ হয়ে যাবেন না। সামান্য দেখতে পাবেন। এই যে, তোমাকে আমি ঝাপসা দেখছি, এইরকম।

 

শ্যামল : আপনি নতুন এক কাব্যচেতনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে, নিজস্ব লেখার ধারা সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলা কবিতায় এক অগ্রপথিক। আপনার বিবেচনায় কবিতা আসলে কি?

 

আল মাহমুদ : আমার ধারণা কবিতা মানুষের এক ধরণের দীর্ঘশ্বাসের মত।