রায় বংশের ছড়াকার

বাংলায় 'ননসেন্স ছড়া'র প্রবর্তন করেন যিনি
ছবি: সংগৃহীত
সুকুমার রায়ের লেখায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি সুকুমারের বাল্য-বয়স থেকে সাহিত্যে সরাসরি প্রভাবিত করেছিলেন। এ ছাড়াও রায় পরিবারের সাথে জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখের সম্পর্ক ছিল। ফলে একই সাথে শিক্ষা ও সাহিত্যে বয়স বাড়ার সাথে প্রচণ্ড অনুরাগী হয়ে উঠেন সুকুমার। তাঁর হাস্যরসের ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতাগুলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকেও মুগ্ধ করেছিল।

"শুনেছ কি ব’লে গেল সীতানাথ বন্দ্যো?
আকাশের গায়ে নাকি টক্‌টক্ গন্ধ?
টক্‌টক্ থাকে নাকো হ’লে পরে বৃষ্টি—
তখন দেখেছি চেটে একেবারে মিষ্টি।"


সুকুমার রায়ের লেখা এই ধরনের ছড়াগুচ্ছকে বলা হয় 'ননসেন্স ছড়া' বা 'ননসেন্স রাইম' অর্থাৎ যে ছড়া সাধারণত শুধু কৌতুক পরিবেশনের জন্য লেখা হয় এবং তাতে ছন্দ ও অন্তমিলের চমৎকার বিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজি সাহিত্যে এডওয়ার্ড লিয়ার, লুইস ক্যারল, মারভিন পিক, এডওয়ার্ড গোরি, কলিন ওয়েস্ট, ডক্টর সেউস, ও স্পাইক মিলিগান- এর মতো কবিরা ননসেন্স রাইমের জন্য ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছেন। তবে, বাংলা সাহিত্যে সুকুমার রায়-ই প্রথম এই ননসেন্স রাইমের প্রবর্তন করে বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব লাভ করেন। 

 

সুকুমার রায়ের জন্ম ছিল বাংলা নবজাগরণের যুগে। ১৮৮৭ সালের ৩০ শে অক্টোবর একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও সম্পাদক সুকুমার রায় কলকাতা শহরে ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যানুরাগী, যার ফলে শিক্ষা ও সাহিত্যে তার বিচরণ ছিল চমৎকার। খ্যাতনামা এই 'রায় বংশ' বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যুগ যুগ ধরে অমলিন রয়ে গেছে তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে। তার পিতা উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন শিশুতোষ গল্প ও জনপ্রিয়-বিজ্ঞান লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার ও শৌখিন জ্যোতির্বিদ। আর তার পুত্রকে বাংলার এই প্রজন্মের কে বা না চিনে! বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে একজন, অস্কার বিজয়ী সত্যজিত রায় তার একমাত্র সন্তান ছিলেন। তার মা বিধুমুখী দেবীর আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলায়।

 

সুকুমার রায় কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার উপর বি.এস.সি. করা শেষে বিলেতে আলোকচিত্র ও মুদ্রণ প্রযুক্তির উপর উচ্চতর শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে তিনি ভারতের অন্যতম আলোকচিত্রী ও লিথোগ্রাফার হিসেবে পরিচিতি পান। দেশে এসে তিনি বাবা উপেন্দ্রকিশোর-এর পত্রিকা 'সন্দেশ'- এর সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। 'সন্দেশ' পত্রিকার হাত ধরেই আজকের বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের উত্থান ঘটে।

 

সুকুমারের ছড়া পড়ে বড় হয়নি বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে এমন বাঙালি পাওয়া দুষ্কর। ছোট বেলায় মা'র মুখের বুলিতেও শেখা ছন্দগুলোর মধ্যে সুকুমার রায়ের লেখা রয়েছে, যা শিশুদের মধ্যে সাহিত্যের গাঁথুনি তৈরি করে দেয়। মজার ছলে এসব অদ্ভুত ছড়া গুলো মানুষের মুখে মুখে এখনো ঘুরে ছন্দে ছন্দে নেচে বেড়ায়।


"বাবুরাম সাপুড়ে, কোথা যাস্ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা, দুটো সাপ রেখে যা—
যে সাপের চোখ্ নেই, শিং নেই, নোখ্ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস্‌ফাঁস্, মারে নাকো ঢুঁশ্‌ঢাঁশ,
নেই কোনো উৎপাত, খায় শুধু দুধ ভাত—
সেই সাপ জ্যান্ত গোটা দুই আন্ তো!
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা ক’রে দিই ঠাণ্ডা।"


এই ধরনের চমৎকার সব 'ননসেন্স রাইম'-এর হাতে খড়ি হয় তার বিলেত থেকে। তার প্রথম ও একমাত্র ননসেন্স ছড়ার বই 'আবোল তাবোল' শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে নিজস্ব জায়গার দাবিদার। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি 'ননসেন্স ক্লাব' নামে একটি সংঘ গড়ে তুলেছিলেন। এর মুখপাত্র ছিল ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ নামের একটি পত্রিকা। সেখানেই তার ‘আবোল তাবোল’ ছড়ার চর্চা শুরু। পরবর্তীতে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর ‘মন্ডে ক্লাব’ নামে একই ধরনের আরেকটি ক্লাব খুলেছিলেন। মন্ডে ক্লাবের সাপ্তাহিক সমাবেশে সদস্যরা জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত সব বিষয়েই আলোচনা করতেন।

 

সুকুমার রায়ের লেখায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি সুকুমারের বাল্য-বয়স থেকে সাহিত্যে সরাসরি প্রভাবিত করেছিলেন। এ ছাড়াও রায় পরিবারের সাথে জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখের সম্পর্ক ছিল। ফলে একই সাথে শিক্ষা ও সাহিত্যে বয়স বাড়ার সাথে প্রচণ্ড অনুরাগী হয়ে উঠেন সুকুমার। তাঁর হাস্যরসের ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতাগুলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকেও মুগ্ধ করেছিল। তিনি সুকুমারের লেখা 'পাগলা দাশু' পড়ে বলেছিলেন, 'সুকুমারের লেখনী থেকে যে অবিমিশ্র হাস্যরসের উৎসধারা বাংলা সাহিত্যকে অভিষিক্ত করেছে তা অতুলনীয়। তার সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র ও সচল গতি, তার ভাবসমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমৎকৃতি আনে।'

 

শিশু বয়স হতেই পিতার অনুকরণে ও ঠাকুর পরিবারের প্রভাবে তাঁর লেখালেখির ডানা মেলে। ১৮৯৫ সালে মাত্র আট বছর বয়সে সুকুমারের প্রথম কবিতা 'নদী' প্রকাশিত হয় ‘মুকুল’ পত্রিকায়। পরবর্তীতে বিলেত ফেরত সুকুমার পুরোদমে শিশুসাহিত্য চর্চা করেন। তার ছোট বেলার একটি ননসেন্স রাইম খানিকটা এরকম-
"মাসি গো মাসি, পাচ্ছে হাসি
    নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্—
হাতির মাথায় ব্যাঙের ছাতা
    কাগের বাসায় বগের ডিম॥"

 

সুকুমার রায়ের প্রধান অবদান শিশু-কিশোর উপযোগী বিচিত্র সাহিত্যকর্ম। কবিতা, নাটক, গল্প, ছবি সবকিছুতেই তিনি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ ও কৌতুকরস সঞ্চার করতে পারতেন। বাংলা সাহিত্যে তার মতো স্বকীয় ও ছন্দময়তায় সাথে কৌতুক কবিতা আর কেউ এতোটা সফলতা দেখায়নি।  তার লেখা কবিতার বই আবোল-তাবোল(১৯২৩), গল্প হ-য-ব-র-ল(১৯২৪), গল্প সংকলন পাগলা দাশু, এবং নাটক চলচ্চিত্তচঞ্চরী বিশ্বসাহিত্যে সর্বযুগের সেরা "ননসেন্স" ধরনের ব্যঙ্গাত্মক শিশুসাহিত্যের অন্যতম বলে মনে করা হয়। এছাড়া বহুরূপী, খাইখাই, অবাক জলপান, শব্দকল্পদ্রুম, ঝালাপালা ইত্যাদিও ব্যাপক রকমের সফল লেখনি তিনি বাংলা সাহিত্যে উপহার দিয়ে এখনো জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক হিসেবে অমর হয়ে রয়েছেন। ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে কালাজ্বরে আক্রান্ত  হয়ে এই বাংলার 'ননসেন্স রাইম'-এর প্রবর্তকের মৃত্যু ঘটে।