গল্প

দ্রুতযান

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

  তাহমিনা কোরাইশী

ভালোবাসা ইদানীং পদার্থ, যার আকার আছে ওজন আছে। সেও জায়গা দখল করে। মানুষের মনের ওপর রাজত্ব বিস্তার করে চলেছে। কখনও উদাসীন রাজা, কখনও রূঢ় রাজা, নীলচাষীদের পিঠে চাবুকের দগদগে ঘা। জটিল অংকের মতো ভালোবাসা। মন থেকে মাথায় করে মাকড়সার জাল বিস্তার। নিরীহ পতঙ্গ যায় ফেসে যখন-তখন। একটি নির্দিষ্ট গতি বা ধারাপাত কোনো কিছুই মেনে চলে না। দিক পরিবর্তনে দিকভ্রম হয়ে ওঠে কখনও। 
এমনই একজটিল জীবনে তিন্নি পা পিছলে পড়ে যায়। ইচ্ছাকৃত নাকি বিধিবাম ঠিক বুঝতে পারে না। মামুন-তিন্নির কতদিনের ভালোবাসা পরিণতি বিয়ের বন্ধনে গড়িয়েছিল। দু’জনেই চাকরিজীবী। ব্যস্ত জীবন। আজকাল কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। সবে একটি বছর বিবাহিত জীবনের সম্পর্ক। বেসুরো কাঁসার ঘণ্টা বেজেই চলেছে। এক বছরের মাথায় আলাদা হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে চলে আসে। সংসারের গূঢ়ত্বটুকু বুঝবার আগেই ভাসমান কচুরিপানায় আটকে যায় প্রায়। ব্যস্ত সময়ের ব্যস্ততায় সবই উপরি উপরি ভেতরে ঢোকার সময় যেন কারো নেই। মানবমনের মনস্তত্বের গভীরতা মাপার যন্ত্রটি পড়ে আছে সমাজের চিলেকোঠায়। হাই এমবিশন তাড়া করে ফেরে ঘরে ঘরে। 


তিন্নি এখন মামুনের কাছ থেকে তার আশপাশের মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়া স্বপ্নে অধীর। কাছেপিঠে নয় অন্য কোথাও দূরে বহু দূরে। পাসপোর্ট-ভিসা-স্থান সবই ঠিক হয়ে যায়। বিয়ে বিচ্ছেদও যথারীতি ঘটে। স্বপ্নের রাজ্যে আমেরিকায় উড়াল ডানায় একদিন উড়ে যায়। আশ্রয় পেয়ে যায় কুইনসে এক বান্ধবীর বাসায়। কপাল ভালো সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ালেখা করেছে। চাকরিও জুটে যায়। জীবন আর ঘোড়ার গাড়িতে নেই। দ্রুতগতির যানে। ভুলে যেতে চায় অতীত। অতীত এককল্পরাজ্য। তিন্নি কারো সাথেই সম্পর্ক রাখতে চায় না। যারা তার অতীতের সাথে ছিল জড়িয়ে। নতুন আশালতা লকলক করে বেড়ে উঠে। সে ফর্মে ওর চাকরি হয়েছে। সেখানে এক ভিনদেশি ভিন্নধর্মী মানুষের সাথে দেখা। সে ঐ ফার্মে বেশ কয় বছর কাজ করছে। দেবাশিষ তিন্নির প্রতি বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তিন্নি ভেবে পায় না। মোহঘোর কাটিয়ে দেশান্তরি হয়েছে সবে। এখনই কোনো জালে জড়াবে, তা কি করে হয়। সময় নেয় তিন্নি। এই বয়সটাতো আর কৈশোর যৌবনের রোমান্টিকতায় পূর্ণ আধার নয়। দেবাশিষও সময় দেয়। কোনো কিছুতেই কারো বাড়াবাড়ি নেই। নেই আদিখ্যেতা। দেবাশিষের বিশ্বস্ততা নির্ভরশীলতা তিন্নিকে আকৃষ্ট করে। হাতে হাত ধরে চলবার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হতে সময় লাগে না। ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। দেবাশিষ রশি ডিঙিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। অতীত নিয়ে বিব্রতকর অবস্থা নেই। চাওয়াপাওয়ার হিসেব-নিকেশ নেই। কেবল দুটি আত্মার মেলবন্ধন। 


মামুনকে ছাড়তে তেমন কষ্ট হয়নি তিন্নির। তবে কি দেবাশিষ ওর অপেক্ষায় বসেছিল সাতসমুদ্দুর তের নদীর পাড়ে? এই বন্ধনটি তিন্নির মনঃপূত হয়েছে! ওর মন সায় দিয়েছে। দেবাশিষ কেবল ওরই। টেলিপ্যাথি তিন্নির অপেক্ষায় দেবাশিষ। দেবাশিষের জীবনে এর আগে কেউ কি আসেনি? নিজেকে নিজে গড়তে গড়তে কখন যে সময় পাড় হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। যখন তিন্নি সামনে এসে দাঁড়ায়। সেও ভেবেছে তিন্নি দেবাশিষের জন্য আজ ওর সামনে। বিয়ের পর কুইনসেই এপার্টমেন্ট নিয়ে নেয় ওরা। ঐ বান্ধবীর পাশেই। যোগাযোগ কেবল বন্ধু-বান্ধব কলিগ। সময় গড়িয়ে যায় পাঁচ বছর। এর মাঝে দু’বছরে     মাথায় অয়ন এল ঘরে। দুর্লভ মুহূর্তগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে যায়। কখনও তিন্নির মাথায় উঁকি দেয় দেবাশিষের অতীত। কি ছিল তার অতীত। তবে কি সে একলাই? শর্ত যখন নিজেই দিয়েছে নিজে ভাঙবে কি করে? কেউ কারো অতীত সামনে আনবে না। অসতর্ক মুহূর্তে কত কিছুই ভাবনায় ডুবিয়ে দেয় তিন্নিকে। দেবাশিষকে জিজ্ঞেস করতে পারে না। 


মনোরাজ্য দখল তো নিজের হাতে। ইদানীং কত কিছুই দোলা দিয়ে যায়। এখনও মামুন একটি আসন গেড়ে বসে আছে ঠায় মনের কোণে। অজান্তেই চোখের জলে ভিজে যায় মনের আঙিনা উঠোন। ফিরে যেতে চায়, একপলক দেখে আসতে চায় রক্তবুননে সমষ্টির সংসার। পরক্ষণে নিয়মনীতির বেড়াজালে থমকে যায়। মাড়ায় না ঐ পথ আর।
কাণায় কাণায় উপড়ে পড়া সম্ভার। ভালোবাসার  জীবনে উঁকি দেয় পরজীবী কীট। বাসা বাঁধে সৌম্যকান্তি দেবাশিষের দেহে। দিন দিন নিজের অবস্থান দৃঢ় করে চলে। ক্যান্সার তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির। 
তিন্নির এত শ্রমসাধনা ভালোবাসা চেষ্টা সবই বিফলে যায়। 
নিজেই জয়ী হতে চায়। বিধির বিধান নাকি অভিশাপ তিন্নির দেবালয়ে আঘাত করে তিন্নি মূর্চ্ছা যায়। 
তিন্নি দেখে ওর বাড়ির সামনে বিশাল লন, সবুজঘাসের আচ্ছাদনে সেখানে দাঁড়িয়ে মামুন। তিন্নি আর দেবাশিষের ঠিকানা খোঁজে। তিন্নি চোখ মেলে মামুনকে দেখে। চেয়ে দেখে একি ওর গায়ে সাদা চাদরে ঢাকা কেন? দু’হাত বাড়িয়ে মামুন তিন্নি দেবাশিষকে ধরার চেষ্টা করে। ছুঁতে পারে না মামুন। 
হঠাৎ পিছন থেকে কারো স্পর্শে তিন্নি ঘাড় ফিরায়, বলে, ‘কে দেবাশিষ?’ আনন্দোল্লাসে উথলে ওঠে তিন্নি। দেবাশিষকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তুমি কোথায় ছিলে? এই তো আমি তোমার কাছেই। তোমার পাশেই। তোমাকে ছেড়ে কোথায় যাবো আমি?’
তিন্নি পিছন ফিরে চায় সবুজ লনের দিকে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারির মাঝে শ্বেত বসনায় মামুন। দুটো ডানায় ভর করে উড়াল দিল শূন্যে।