টেক সমস্যা

টেক ফোবিয়া প্রযুক্তিবিষয়ক যত ভয়ভীতি

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:০০ | অনলাইন সংস্করণ

  সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

‘ফোবিয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ভয় বা আতঙ্ক। অর্থাৎ  কোনো বিশেষ বস্তু, বিষয় বা ঘটনায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়া, এবং সেজন্য সেই ব্যাপারগুলোকে এড়িয়ে চলার প্রবণতাকে বলা হয়ে থাকে ফোবিয়া। যেমন- কারো উচ্চতাভীতি আছে, কারো বা আবার জলের ভীতি আছে। এমন অজস্র মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে, যাদের এক বা একাধিক ফোবিয়া রয়েছে।

মানুষের ফোবিয়ার বিষয়বস্তু থেকে বাদ পড়েনি হাল আমলের প্রযুক্তিও। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের জীবন সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে, অসংখ্য অসম্ভবকে সম্ভব করা যাচ্ছে, এমনকি অদূর ভবিষ্যতে গোটা বিশ্বকেই নিজের আঙুলের ডগায় নিয়ে আসতে পারার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেই প্রযুক্তির ব্যাপারেও কিছু মানুষের ভয় ও আতঙ্কের শেষ নেই। মানুষের প্রযুক্তিবিষয়ক এসকল ভীতির নামই হলো ‘টেক ফোবিয়া’। টেক ফোবিয়া’র প্রকারভেদ রয়েছে অনেকরকমের। এর মধ্যে বিশেষত্ব থাকা ফোবিয়াগুলো যেমন : সাইবার ফোবিয়া, সেলফিফোবিয়া, এক্সপেন্সিভটেকফোবিয়া,
ফরমাসপাসফোবিয়া,নোমোফোবিয়া। চলুন, এবার জানা যাক, উল্লিখিত টেক ফোবিয়াগুলোর সম্বন্ধে।


সাইবার ফোবিয়া


কম্পিউটার ব্যবহারের ব্যাপারেও অনেকের মনে অহেতুক ভয় কাজ করে, যার নাম হলো সাইবারফোবিয়া। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষের মনে করে, যেহেতু তারা ইতোপূর্বে কখনো কম্পিউটার ব্যবহার করেনি, তাই এখনো তারা এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারবে না। এজন্য তারা সবসময় চেষ্টা করে কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ দেওয়া হলে সেটি এড়িয়ে যেতে। আর কেউ যদি নিতান্ত বাধ্য হয়ে কম্পিউটারে কাজ করতে শুরু করেও, তার মধ্য মাথাব্যথা, দুর্বল অনুভব করা, মানসিক উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া, মৃত্যুভীতি সৃষ্টি হওয়া, প্রচুর ঘাম হওয়া, মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। অর্থাৎ, যতক্ষণ তারা কম্পিউটারে কাজ করে, ক্রমাগত তাদের দেহ ও মনে অস্বস্তি খেলা করতে থাকে, এবং কারো কারো ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ফেলে যায়।


সেলফি ফোবিয়া


বর্তমান সময়ে যার হাতেই একটি স্মার্টফোন আছে, তাকেই দেখা যায় সেলফি তথা নিজের ছবি নিজে তোলার চেষ্টা করতে। সেলফি তোলার এমন প্রবণতা রীতিমতো মহামারী আকার ধারণ করেছে। তবে মুদ্রার অপর পিঠে ভিন্ন চিত্রও কিন্তু রয়েছে। অনেকেই চায় সেলফির মাধ্যমে নিজের খুব সুন্দর কোনো ছবি তুলতে। কিন্তু যখন তাদের ছবি ভালো আসে না, কিংবা তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়, তখন সেলফির প্রতি তাদের মনে একধরনের বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। তাই পরবর্তীসময় আর কখনো তারা সেলফি তুলতে চায় না।


এক্সপেন্সিভ টেক ফোবিয়া


এর অর্থ হলো, কোনো প্রযুক্তির পেছনে অতিরিক্ত অর্থ খরচের ভীতি। বিশেষ করে সেই প্রযুক্তিটি যদি কেউ ভালোভাবে ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে সেটির মাধ্যমে পয়সা উসুল হবে না বরং টাকাগুলো জলে যাবে, এমন রক্ষণশীল চিন্তা করতে দেখা যায় অনেককেই। যেমনÑ শুরুতে অনেকেই কম্পিউটার বা মোবাইল ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এমন ফোবিয়ার কারণে অনেকের পক্ষেই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও খুব দামি কোনো প্রযুক্তির মালিকানা লাভ করা সম্ভব হয় না।


ফরমাসপাস ফোবিয়া


পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়াটা নতুন কিছু নয়। প্রায়ই আমরা নিজেদের বিভিন্ন আইডির পাসওয়ার্ড ভুলে ফেলি, এবং তারপর ফরগেট পাসওয়ার্ড দিয়ে, নতুন করে একটি পাসওয়ার্ড সেট করে দিই। কিন্তু যদি এমন হয় যে আমরা আমাদের মাস্টার পাসওয়ার্ডটিই হারিয়ে ফেলি? হতে পারে সেটি মোবাইলের লক পাসওয়ার্ড, মূল মেইল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড, কিংবা ঘরের দরজা খোলার পাসওয়ার্ড। এসব পাসওয়ার্ড একবার হারিয়ে ফেললে নিশ্চিতভাবেই আমাদেরকে প্রচুর বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। প্রযুক্তির সাথে যাদের নিত্য বসবাস, তাদেরকে সবসময় মাস্টার পাসওয়ার্ড স্মরণে রাখার চ্যালেঞ্জও জয় করতে হয়। আর যারা সহজেই ভয় পায় বা উদ্বিগ্ন হয়, তারা ফরমাসপাস ফোবিয়ার শিকার হয়।


নোমো ফোবিয়া


এটি হলো নিজের মোবাইল ফোন ছেড়ে থাকার ভয়। ‘নোমো’ শব্দটি মূলত ‘নো মোবাইল’ শব্দদ্বয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের পোস্ট অফিস এই বিশেষ ফোবিয়াটির নামকরণ করে। সেখানে কর্মরতদের মধ্যে যারা মোবাইল ব্যবহার করত, তাদের মধ্যে বিভিন্ন উদ্বেগে ভোগার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছিল। এবং শেষমেষ পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পর দেখা যায়, তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি আসলে মোবাইল ফোন হারানো নিয়েই। সাইকোলজি টুডের এক প্রতিবেদন মতে, আজকাল কলেজ শিক্ষার্থীদের মাঝে গোসল করতেও মোবাইল নিয়ে ঢোকার প্রবণতা      বৃদ্ধি পাচ্ছে!
এই ফোবিয়াগুলো শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতিসাধন করে। প্রযুক্তি মানবকল্যাণে আশীর্বাদ, নিয়মতান্ত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার আধুনিক জীবনযাপনে এখন অত্যাবশ্যক। তাই প্রযুক্তিকেন্দ্রিক ফোবিয়াগুলোর হাত থেকে মুক্তি পেতে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই হতে পারে উৎকৃষ্ট পন্থা।