জাপানের বিস্ময়কর 'সাউন্ড প্রুফ হাইওয়ে'

জাপানের বিস্ময়কর 'সাউন্ড প্রুফ হাইওয়ে'
জাপানের বিস্ময়কর 'সাউন্ড প্রুফ হাইওয়ে'
সাউন্ড প্রুফ দেয়াল কাচের মতো কোন পদার্থ দিয়ে তৈরি। যাতে সৌন্দর্যও দেখা যাবে শব্দ দুষণও ঠেকাবে। বর্তমানে জাপানের  আবাসিক এরিয়াগুলোর হাইওয়েতে যে সাদা স্বচ্ছ একধরনের দেয়াল দেখা যায় তাই হল সাউন্ড প্রুফ দেয়াল। প্রযুক্তির জয়টা আসলে এখানেই। আর বরাবরই জাপান প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে করেছে নতুন নতুন উদ্ভাবন। 

হাইওয়ে বা বাংলায় মহাসড়ক। শব্দটি কল্পনা করতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল এক রাস্তা আর তার উপর দিয়ে সুপার স্পিডে চলমান গাড়ির দৃশ্য। আর এসব দৃশ্যের সাথে উচ্চহারে গাড়ির আওয়াজ তো ফ্রিতে রয়েছেই।  এমন দৃশ্যের সাথে আমরা খুবই পরিচিত তবে জাপানিদের হাইওয়ের চিত্র কিছুটা ভিন্নই বটে। এদের হাইওয়ে নিয়ে রয়েছে  মজাদার কাহিনীও। 


জাপানের অধিকাংশ হাইওয়ে গুলো তৈরি হয় ১৯৫৬ সালে। হাইওয়ের যা বৈশিষ্ট্য তা মেনেই শুরু হল এর যাত্রা। নেই ট্রাফিক সিগন্যাল, রাস্তার মধ্যে সাই সাই করে চলছে সব গাড়ি । গাড়ি তো চলছে, যাত্রীরাও গন্তব্যে পৌঁছচ্ছে। তবে এদিকে ঘোর বিপাকে  রাস্তার দুপাশের অধিবাসীরা। গাড়ির উচ্চ শব্দে চোখের ঘুম হারাম তাদের। 


বাধ্য হয়ে সরকারের কাছে নালিশ দিলেন হাইওয়ের পাশের অধিবাসীরা। তাদের আবদার, 'আওয়াজের জালায় ঘুমাতে পারিনা, রাস্তা সরান' ৷ কিন্তু রাস্তা সরানো কি আর মুখের কথা? তবে উপায়? বাধ্য হয়ে তড়িঘড়ি করে সরকার বুদ্ধিজীবীদের ডাকলেন এবং পরামর্শ চাইলেন। বুদ্ধিজীবীরা সরকারকে বুদ্ধি দিলেন। 

 

প্রথমেই শিশু থেকে বৃদ্ধ বিভিন্ন বয়সের ২০০ জন অধিবাসীদের উপর সমীক্ষা চালানো হল। শব্দহীন রুমের ভেতর দিনে রাতে বিভিন্ন সময় তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হল। তারপর ৩০ ডেসিবল থেকে ১০০ ডেসিবল পর্যন্ত কৃত্রিম  গাড়ির শব্দ বাজিয়ে দেখা হল এবং কার কতো ডেসিবেলে ঘুম ভাঙলো তা রেকর্ড করা হল। 


এরপর সরকার এ ফলাফলের ভিত্তিতে নতুন রাস্তা আওয়াজ আইন জারি করলেন। সে আইন অনুসারে কোন বাড়িতে যদি দুপুরে ৭৫ ডেসিবল ও রাতে ৬৫ ডেসিবেলের বেশি আওয়াজ পাওয়া যায় তাহলে তারা জরিমানার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এর নাম ঘুম ভাঙা জরিমানা। সরকারের নির্দেশে আওয়াজ মাপা শুরু হল। 


অন্যদিকে নাগরিকদের সুবিধার্থে দেয়া হল একটি ফোন নাম্বার। বলা হল যদি গাড়ির শব্দের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে তাহলে যেন এই নাম্বারে ফোন করা হয়। এখানেও রয়েছে একটি মজার ব্যাপার। ফোন নাম্বারের শুরুতেই ০১২০ থাকা মানেই এই ফোন নাম্বারটি একদম ফ্রি। যিনি কল করবেন তার কোন টাকা কাটা যাবেনা বরং যাকে ফোন করা হবে তিনিই টাকা দিবেন।


এরপর শুরু হল সেই নাম্বারে ফোন কল আসা। এদিকে জরিমানা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন জাপানের হাইওয়ে অপারেটর নেক্সকো কোম্পানি। ৮ হাজার ৫০০ কিলোমিটার রাস্তার মালিক তারা। জরিমানার টাকা গুনতে রীতিমতো  মাথায় হাত তাদের। এবার তারা আবার  বুদ্ধিজীবীদের ডাকলেন। শব্দ এবং মানুষের কষ্ট দুটোই কমানোর জন্য প্রযুক্তিগত বুদ্ধি চাইলেন তারা। 


নানা বিশ্লেষণের পর দুটো প্রযুক্তি কাজে লাগানো হল। তার মধ্যে প্রথমটি হল, যেহেতু ইঞ্জিনের সমস্যা না থাকলে আওয়াজ তৈরি হয় টায়ার আর রাস্তার ঘর্ষণ থেকে। তাই নতুন উপাদান দিয়ে রাস্তার উপর প্রলেপ বসানো হল। গাড়ি কোম্পানিগুলোকেও ডেকে বসালেন কম আওয়াজের টাওয়ার আর গাড়ির শব্দ কমানোর জন্য। দ্বিতীয় সমাধানটি ছিল, রাস্তার ২ ধারে বসানো হল শব্দ প্রতিরোধী বেড়া। এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হলেও ঘুম ভাঙার জন্য যে জরিমানা গুনতে হতো তার থেকে বেজায় সস্তা। 


এতো কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে হাইওয়ের পাশের  অধিবাসীদের শান্তি মিললো। এবার আর আওয়াজে তাদের ঘুম ভাঙার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সবাই যখন শান্তির নিশ্বাস ফেলছিল এবার বোধহয় সব ঝামেলা মিটেই গেলো, ঠিক তখনই শুরু হল নতুন ঝামেলা। 

 

আবারও আসলো নালিশ। তবে এবার অধিবাসীদের থেকে নয় বরং যারা গাড়ি চালান এবার নালিশ আসলো তাদের পক্ষ থেকে। যদিও আমাদের দেশে রাস্তায় চলতে কোন টোল দিতে হয় না যদিনা আপনি কোন সেতু কিংবা ফেরী পার হন। তবে জাপানে কিন্তু প্রাইভেট যানবাহনের মালিককে প্রতি কিলোমিটার রাস্তা চলাচলের জন্য গুনতে হয় প্রায় ২৫ টাকার মতো৷ অর্থাৎ  যদি ঢাকা থেকে আপনি চট্টগ্রাম যেতে চান আপনাকে টোল দিতে হবে ৬ হাজর ২৫০ টাকা। 

 

তাই এবার গাড়ির মালিকদের আক্ষেপ আমরা এতো টাকা টোল দিয়ে হাইওয়েতে যাবো আর চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখবোনা? আবারও বিপাকে পরলেন রাস্তার মালিকরা। এবার তাদের চিন্তা এমন কোন ব্যবস্থা করা যাতে দু'পক্ষই শান্তিতে থাকতে পারে। যেমন কথা তেমন কাজ। রাস্তার মালিকরা আবার বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি চাইলেন। আর নানা কসরত করে সমাধান বেরোলো সাউন্ড প্রুভ স্বচ্ছ দেয়াল।


সাউন্ড প্রুফ দেয়াল কাচের মতো কোন পদার্থ দিয়ে তৈরি। যাতে সৌন্দর্যও দেখা যাবে শব্দ দুষণও ঠেকাবে। বর্তমানে জাপানের  আবাসিক এরিয়াগুলোর হাইওয়েতে যে সাদা স্বচ্ছ একধরনের দেয়াল দেখা যায় তাই হল সাউন্ড প্রুফ দেয়াল। প্রযুক্তির জয়টা আসলে এখানেই। আর বরাবরই জাপান প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে করেছে নতুন নতুন উদ্ভাবন। 


অন্যদিকে আমাদের ঢাকা শহরের কথা যদি বলি এখানে গড়ে শব্দ দূষনের পরিমাণ ৯০ ডেসিবলের কাছাকাছি। এর বেশিটাই আসে গাড়ির হর্ণ থেকে। যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক  ক্ষতিকর তো বটেই। কিন্তু জাপানের মতো প্রযুক্তির আশীর্বাদ কাজে লাগিয়ে কোন উদ্ভাবন করতে এখনো আমরা অনেকটা অপারগ। তবে শুধু বাংলাদেশই নয় বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশেরই উচিত শব্দ দূষণ রোধ করার এমন বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা।