নারীর প্রতি সহিংসতা

নারীর প্রতি সহিংসতা
গত ০৬ আগস্ট ২০১৯ পাক্ষিক অনন্যা আয়োজন করে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান ‘অনন্যা এডিটর’স পয়েন্ট’। এবারের বিষয় ছিল ‘নারীর প্রতি সহিংসতা’। অনন্যা স্টুডিওতে আয়োজিত এই আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা আলোচকদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের^ চুম্বকীয় অংশগুলো নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। সঞ্চালক তাসমিমা হোসেন সম্পাদক, পাক্ষিক অনন্যা ও দৈনিক ইত্তেফাক আলোচক ডা. মেখলা সরকার সহকারী অধ্যাপক জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা ড. মোহাম্মদ মুনির হোসাইন প্রোগ্রাম এনালিস্ট, ইউএনএফপিএ, বাংলাদেশ ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন আইনজীবী ড. ফারহানা জামান সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আলোচনায় সুপারিশ
 যৌন সহিংসতায় কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার পাশাপাশি দ্রুত কার্যকর করা এবং সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে জনগণের মাঝে তা প্রকাশ করতে হবে।    
 নারীকে ভোগ্যপণ্য ভেবে নেওয়ার মতো সামাজিক অবক্ষয় রোধে মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করতে হবে।
 গুডটাচ-ব্যাডটাচ সম্পর্কে শিশুকে শেখাতে হবে। এক্ষেত্রে মা-বাবার পাশাপাশি শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। 
 সেক্স নিয়ে সঠিক ধারণা না পেলে ভুল ধারণা তৈরি হবে। বাইর থেকে ভুল ধারণা পাওয়ার আগে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মূল ভূমিকা পালন করতে পারেন।   
 
 
আ লো চ না
 
তাসমিমা হোসেন
 
এখন প্রতিদিনই খবরের কাগজে দুই তিনটি করে ধর্ষণের খবর থাকছেই। সন্দেহ নেই যে, এই সময়ে দেশে ধর্ষণসহ নানাধরনের যৌননির্যাতন ভয়াবহ একটি সমস্যা। নারী ও পুরুষ সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক কিছু ধারণা যৌনসহিংসতার অন্যতম কারণ। আমাদের দেশে নারীনির্যাতন সহ্য করার একটি সংস্কৃতি রয়েছে। এছাড়া একজন নারী যৌনসহিংসতার স্বীকার হলে সেখানে নারীকেই খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়। ধর্ষক পুরুষটিকে আমরা যতটা না খারাপ বলি, তারচেয়েও অনেকবেশি সমালোচনায় মাতি যৌনসহিংসতার শিকার নারীকে নিয়েই। তাকে শুনতে হয়, চরিত্র খারাপ ছিল, খোলামেলা চলাফেরা করত, এত রাতে কেন বের হলো, কেন ওই জায়গায় গেল, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। এ নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গেলে পুলিশি জেরা, মামলা,  বারবার আদালতে আসাযাওয়ায় সেই একবার ধর্ষিত হওয়া নারীকে বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে বার বার ধর্ষণের মতো লজ্জায় পড়তে হয়।  
মূলত যৌননির্যাতন ঘটে একধরনের মানসিক অবস্থা থেকে, যা পুরুষের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে যৌনতা তাদের অধিকার। যে-কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীদের অবমূল্যায়ন এবং নারীদের অর্জনকে শ্রদ্ধা না করে বরং তাদের উত্ত্যক্ত করার মানসিকতা থেকেও আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যায়। বর্তমানে আমাদের নারীরা ঘরে, বাইরে এমনি কী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নিরাপদ নয়।  
অন্য নারীর প্রতি দৃষ্টির ক্ষেত্রে ধর্মে বলা হয়েছে, ‘তোমার দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করো, কুদৃষ্টি যেন না হয়, দ্বিতীয়বারে তোমার দৃষ্টিকে অবনত করো।’ সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে বড়ো সৃষ্টি মানুষের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি যদি খারাপ হয়, সেটাই হবে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধ।   
আমাদের এবারের আলোচনার বিষয় হচ্ছে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা’। এ বিষয়ে শুরুতেই আলোচনা করবেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফারহানা জামান।
 
ব্যারিস্টার সুমন
 
ধর্ষকের শাস্তি কী? আমি একজন আইনজীবী হিসেবে চাই সরাসরি মৃত্যুদ-। শাস্তিতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে যত শক্ত শাস্তির বিধানই করা হোক না কেন, মানুষ তাতে ভয় পাচ্ছে না। কেননা কালক্ষেপণের কারণে শেষপর্যন্ত বেশির ভাগ মামলা শাস্তির মুখই দেখছে না। আমি ছোটবেলায় পাগল বলতে মনে করতাম শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় এমন একজন, যার ব্যবহার অস্বাভাবিক। আমি যখন বড়ো হলাম, লন্ডনে গেলাম পড়তে, সেখানে দেখলাম বর্ডারলাইন ডিসঅর্ডার কোনো ব্যক্তিকেই পাগল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  উনি সম্পূর্র্ণ পাগল না, কিন্তু উনার আচরণটা পাগল হওয়ার নির্দিষ্ট বর্ডার লাইনের উপরে আছে যে-কোনো সময় পেরিয়ে যেতে পারে। অথচ আমাদের দেশে এমন মানসিক সমস্যার চিকিৎসা তো দূরের কথা, ভাবনাতেও আনি না। নারীর প্রতি যে- কোনো সহিংসতাই এমন বর্ডার লাইন ক্রস করা মারাত্মক মেন্টাল ডিসঅর্ডার। যার কারণে ২ বছরের শিশু থেকে ৭০ বছরের নারী অবধি ধর্ষিত হচ্ছে। আমাদের দেশে গ্রামে একটা সিস্টেম আছে, যিনি ধর্ষণ করেন তার সাথে কাবিন করে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দাও। যারা রেপ করার মানসিকতায় আছে তারা মনে করে বিয়ে তো একটা অপশন। এখানে মেয়েটাকে ভেবে নেওয়া হয়। নুসরাতের ঘটনায় পুরো প্রক্রিয়াটাতেই মেয়েটা ভোগ্যপণ্য। কারণ এখানে বিভিন্ন ভূমিকায় বিভিন্নজন ছিলেন। ওখানে আমি যদি সাবেক ওসির নামে মামলাটা না করতাম তাহলে উনি কিন্তু অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যেতেন এবং হাজারো নুসরাতের জন্ম দিতেন। 
 
ড. মুহাম্মদ মনির হোসেন
 
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে-কোনো ব্যবস্থাপনায় সবাই নারীকে অবজেক্ট চিন্তা করে তাকে ভুক্তভোগী করে তুলেছে করেছে। অনেক নারীও এই চিন্তাটা ধারণ করে। আমরা যতই শিক্ষিত হই না কেন, আমাদের বেড়ে উঠায় নারী ও পুরুষ সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক কিছু ধারণা আমাদের মনে অনেক আগেই গেঁথে গেছে, যা যৌনসহিংসতার অন্যতম কারণ। বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, পুরুষরা তুলনামূলক বেশি ক্ষমতাশালী। তাই যৌন সম্পর্ককেও তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। যেন জোর খাটানো তাদের অধিকার। ক্ষমতার অসমতা নারীকে পুরুষের অধস্তন করে রেখেছে এবং পুরুষদের আধিপত্য বজায় রাখতে সহায়তা করছে। অনেক মেয়ে বাইরে যাচ্ছে, কাজ করছে, যার কারণে বর্তমানে নারী-পুরুষের সহাবস্থানের কথা আমরা চিন্তা করছি, কিন্তু আমাদের নিষ্ঠুর মানসিকতা সেখানেও আঘাত করছে। আমাদের সমাজে আমরা সেক্স এডুকেশনকে শারীরিক দৃষ্টি থেকে দেখি। কিন্তু এটাকে দেখতে হবে সামাজিক দিক থেকে। এজন্য আমাদের সম্পূর্ণ বিষয়টা জানতে হবে। স্কুলের মাধ্যমে জেনারেশন ব্রেকথ্রু’র উপর আরও কাজ করা উচিত, ভালো স্পর্শ-খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে জানতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। 
 
ফারহানা জামান
 
আমাদের দেশে প্রথাগত যে ভুল ধারণাগুলো আছে এবং তা প্রতি মুহূর্তে বেড়ে চলছে।  প্রতিদিন প্রায় ১৩জন নারী ও শিশু নির্যাতিত হচ্ছে।  যার মধ্যে ২/৩ বছরের বাচ্চাও আছে। আসলে জেন্ডার এডুকেশনটা যেভাবে দরকার তা বাস্তব উদাহরণগুলোর সাথে পরিসংখ্যানসহ বুঝাতে পারলে ভালো হয়। ধর্ষণ যখন হয় তখন ওই নারীর চরিত্র ভালো না খারাপ, যেখানে ধর্ষণ হচ্ছে, সেই জায়গা কেমন, এসব নিয়ে আমরা যে এনালাইসিস করি, মূলত এগুলোই হচ্ছে আমাদের সামাজিক ভ্রান্ত ধারণা।  শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে তো পোশাক কোনোভাবেই গুরুত্ব বহন করে না। এক্ষেত্রে আপনি কি বলবেন। ছয় বছরের একটা বাচ্চা ছাদে খেলতে গেল, অন্য ভাড়াটিয়া তাকে ধরে নিয়ে গেল। এখানে আমরা এটা চিন্তা করি না, তার খেলতে যাওয়ার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে পারলাম না কেন। আমরা সমালোচনা করি, কেন সেখানে তাকে পাঠানো হলো। আমরা কিন্তু কিছু স্থানকে নিদিষ্ট করে ফেলছি যে, এই জায়গায় মেয়েদের যাওয়া উচিত না এবং এটা মেয়েদের কাজ না। এ চিন্তা-ভাবনা থেকে আমাদের বের হয়ে আসা দরকার। নারীর প্রতি সহিংসতায় এই মুহূর্তে দরকার কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সেটা মানুষকে জানানো। সেই সাথে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা।
 
ডা. মেখলা সরকার
 
মানসিক রোগের সাথে ধর্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্ষণ মানুষের ত্রুটির সাথে সম্পর্কিত। আমাদের যে রাগ, ক্ষোভ এগুলো সব মানসিক ত্রুটির সাথে রিলেটেড।  আমাদের বিবেক, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে আমরা ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করি। ব্যক্তিত্বের মধ্যে মূল্যবোধ, নৈতিকতাও আছে। আমরা ছোটবেলা থেকে যদি শিক্ষা পাই যে, একজন নারীকে যতই ভালো লাগুক কিন্তু তাকে কীভাবে স€§ান করতে হবে, তার খারাপ লাগে এমন কিছু করা যাবে না। তাহলে এমন সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি হতো না।  এক্ষেত্রে পরিবারই মূলভরসা। সন্তানদের সে শিক্ষা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে স্কুলগুলোতে হেলথ ক্যা€ú অনেক কাজে আসতে পারে। নারীর প্রতি এই নোংরা আচরণের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি নিজের নৈতিক বাধার এবং কঠোর শাস্তির ভয়ে নিজেকে সামলে রাখে। এক্ষেত্রে শাস্তি যদি অবিলম্বে কার্যকর করা হয় তাহলেই সামাজিকভাবে এর কার্যকারিতা বেশি হবে। শুধু রাষ্ট্র থেকে না, যদি সামাজিক দিক থেকেও এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তবেই সম্ভব হবে। আর নৈতিক জায়গাটি তৈরি হয় শৈশবের বিকাশ থেকে। শৈশব থেকেই কৈশোরে যখন উপনীত হয় তখন তার যৌনচাহিদা কাজ করে। সুতরাং ওই সময়তেই নৈতিকতার পাঠ বেশি দরকার। সেক্স নিয়ে সঠিক ধারণা না পেলে ভুল ধারণা তৈরি হবে। পরিবার থেকে শিক্ষা দিতে হবে যে, অন্যের সাথে এমন কিছু করা যাবে না, যেটায় অন্যেরা কষ্ট পায়। এক্ষেত্রে যতবেশি সম্ভব সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই।