একজন সংগ্রামী নেত্রী আয়েশা খানম

একজন সংগ্রামী নেত্রী আয়েশা খানম
আয়েশা খানম
স্বাধীনতার পরও থেমে থাকেনি আয়েশা খানম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন উদ্যমে শুরু করেছিলেন তার যাত্রা। নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, সমান অধিকার ভিত্তিক সমাজ গড়ার কাজে জড়িয়ে রেখেছিলেন এই নারীনেত্রী। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘসময় লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি৷

সাল ১৯৭১। উত্তাল পুরো দেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাকিস্তানের হাতে মুষ্টি বদ্ধ। তখন সামনের সাড়িতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মুক্তির জন্য লড়াই করেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র নেতারা। সে তালিকায় পিছিয়ে ছিলোনা নারীরাও।  তেমনি একজন আয়েশা খানম।  


বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখা এক সংগ্রামী নেত্রী আয়েশা খানম। ১৯৬৬ সাল থেকে পুরোপুরি সক্রিয়ভাবে ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরপর ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনসহ একের পর এক যেসব আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল তার সবগুলোতেই  সামনের সারিতে দেখা মিলতো আয়েশা খানমের৷ 


বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন আয়েশা খানম৷ রোকেয়া হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ যার কারণে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ঢাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব ছিল আয়েশা এবং তাঁর সহকর্মী ছাত্র নেতাদের উপর৷ 
শুধু এসবই নয়,  ছাত্র নেতা হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা ও সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন তিনি৷ 


আগরতলায় গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবাও দিয়েছেন এই নারী ৷ ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় যান তিনি। সেখানে পৌঁছে  কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ক্রাফটস হোস্টেলে উঠেন তিনি৷ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যাঁরা ভারতে গিয়েছিলেন,  তাঁদের মধ্যে অনেকের সাময়িক আবাসস্থল ছিল ক্রাফটস হোস্টেল৷ তিনি আগরতলায় গিয়ে চিকিৎসা সেবার উপর প্রাথমিক একটি প্রশিক্ষণ নেন ৷ এরপর আগরতলার প্রতিটি ক্যাম্পে গিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সহায়তা দিতে আত্মনিয়োগ করেন। 


এর পাশাপাশি সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা, প্রণোদনা দান এবং শরণার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগাতে কাজ করেন আয়েশা এবং তাঁর সহকর্মীরা৷ যুদ্ধ চলাকালীন সময় ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন আয়েশা খানম৷ 


স্বাধীনতার পরও থেমে থাকেনি আয়েশা খানম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন উদ্যমে শুরু করেছিলেন তার যাত্রা।  নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, সমান অধিকার ভিত্তিক সমাজ গড়ার কাজে জড়িয়ে রেখেছিলেন এই নারীনেত্রী।  নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘসময় লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি৷ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। প্রথমে প্রতিষ্ঠাতা সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং এরপর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 


স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজ করেছেন তিনি৷


নেত্রকোনা ও দুর্গাপুরের মাঝখানে গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ই অক্টোবর জন্ম আয়েশা খানমের৷ পিতা গোলাম আলী খান এবং মা জামাতুন্নেসা খানম৷  দীর্ঘদিন ফুসফুস ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে অবশেষে জীবনের কাছে হার মানেন লড়াকু এ নারী । গতকাল শনিবার (২ জানুয়ারি)  শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। যার ফলে বিদায় নিলো বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় জুড়ে থাকা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।