নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় সম্মেলন ২০২১

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় সম্মেলন ২০২১
ছবিঃ সংগৃহীত
স্বাগত বক্তব্যে একটি নির্যাতন মুক্ত পরিবেশ কামনা করে আমরাই পারি জোটের কো চেয়ারপারসন শাহীন আনাম জানান, “স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও নারীর প্রতি নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার খর্ব হয়েছে। ভিন্নতা গ্রহণ না করার প্রবণতার ফলশ্রুতিতে বৈষম্য এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা যদি নিজেদের পরিবর্তন না আনি তাহলে পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা দিয়ে কোন কিছুর পরিবর্তন করা সম্ভব না”।

নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা, নারী-শিশুদের জন্য নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে  আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট “নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও একসাথে” স্লোগান সামনে রেখে “জাতীয় সম্মেলন ২০২১” আয়োজন করেছেন। 


গতকাল ২৭ নভেম্বর ২০২১, ঢাকাস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে সকাল ১০.৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৫.০০টা পর্যন্ত এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সহযোগিতায় ছিলেন অক্সফাম এবং গ্লোবাল এফেয়ার্স কানাডা। আলোচ্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন এম এ মান্নান, এমপি, মাননীয় মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন অ্যারোমা দত্ত, মাননীয় সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এবং মোঃ গোলাম কিবরিয়া, সিনিয়র জেলা জজ ও পরিচালক (প্রশিক্ষণ), বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। জাতীয় সম্মেলনের সভাপ্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকারকর্মী এবং আমরাই পারি জোটের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল। এছাড়াও আমরাই পারি জোটের কো চেয়ারপারসন শাহীন আনাম,অক্সফামের হেড অফ জেন্ডার জাস্টিস এন্ড সোশ্যাল ইনক্লুশেন মাহমুদা সুলতানাসহ দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক, নারী অধিকারকর্মী, প্রায় দেড় শতাধিক চেঞ্জমেকার উপস্থিত ছিলেন এই সম্মেলনে।

 

জাতীয় সম্মেলনের প্রথম পর্বে আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট কর্তৃক সম্পাদিত নারীর প্রতি সহিংসতা: আইনের প্রয়োগ, শিখন ও প্রতিবন্ধকতা এবং বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ: আর্থ-সামাজিক চালিকাশক্তি ও আইনের সীমাবদ্ধতা এই ০২টি গবেষণা ও অধ্যয়ন বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রবন্ধ উপস্থাপনে মুল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. পারভীন জলি, সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ড. সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ফরিদা ইয়াসমীন, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। এছাড়াও প্যানেলিস্ট হিসেবে উক্ত সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন শেহেলা পারভিন, এআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ, মোঃ শওকত হোসেন, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, ঝিনাইদহ, রুমানা খান, জিবিভি ক্লাস্টার কোঅর্ডিনেটর, ইউএনএফপিএ, দিব্যা মুকুন্দ, সিনিয়র অফিসার ফর এশিয়া, গার্লস নট ব্রাইডস: দি গ্লোবাল পার্টনারশিপ টু এন্ড চাইল্ড ম্যারেজ, কাশফিয়া ফিরোজ, ডিরেক্টর গার্লস রাইট্স, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং তাকবির হুদা, অ্যাডভোকেসি লিড, ব্র্যাক।

 

এরপর বিকাল তিনটায় শুরু হয় জাতীয় সম্মেলনের মুল পর্ব। আমরাই পারি জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক মূল পর্বের সঞ্চালনা করে। সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করে অক্সফামের হেড অফ জেন্ডার জাস্টিস এন্ড সোশ্যাল ইনক্লুশেন মাহমুদা সুলতানা। স্বাগত বক্তব্যে একটি নির্যাতন মুক্ত পরিবেশ কামনা করে আমরাই পারি জোটের কো চেয়ারপারসন শাহীন আনাম জানান, “স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও নারীর প্রতি নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার খর্ব হয়েছে। ভিন্নতা গ্রহণ না করার প্রবণতার ফলশ্রুতিতে বৈষম্য এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা যদি নিজেদের পরিবর্তন না আনি তাহলে পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা দিয়ে কোন কিছুর পরিবর্তন করা সম্ভব না”।

 

সম্মেলনের বিশেষ অতিথি মাননীয় সংসদ সদস্য অ্যারোমা দত্ত মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি নারীদেরকে জন্মগতভাবে চ্যালেঞ্জ টেকার বলে আখায়িত করেন। আশির দশকে রংপুরের প্রান্তিক নারীরা অ্যারোমা দত্তকে বলেছিলেন যে গ্রামের স্কুলগুলো ঠিক করতে, মেয়েদের শিক্ষিত করতে। কেননা নারীরা শিক্ষিত হলে নিজেদের সবকিছু থেকে রক্ষা করতে পারবে। আলোচ্য সম্মেলনে তিনি সেইসব নারীদের এই বক্তব্যটি স্মরণ করেন।

 

সিনিয়র জেলা জজ ও বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট পরিচালক (প্রশিক্ষণ) গোলাম কিবরিয়া বলেন যে, প্রতিবাদী নারী হলে সমাজ থেকে তাকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়, কটু কথা বলা হয়। তাই আমাদের সামাজিক কাঠামোতে ধর্ষণের কথা লুকাতে চায় যার ফলে অভিযোগ আসতে অনেক দেরী হয়ে যায়। এই দৃষ্টিভংগি পরিবর্তন করার জন্য সামাজিক কাঠামোতে কাজ করতে হবে। মামলায় তদন্তকর্মকর্তাদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা প্রতি জোর দিয়ে তিনি নারী ও শিশু সম্পর্কিত আইনগুলো কার্যকরিতা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করার আহবান জানান। কোন মামলার ক্ষতিপূরণ রায় দেওয়া হলে, ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র থেকে সেই নির্যাতিতা নারীর দায়িত্ব যেন নেওয়া হয় সে বিষয়ে মতামত প্রদান করেন তিনি।

 

সম্মেলনের প্রধান অতিথি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, দারিদ্রতা এবং নিরক্ষরতা নির্মুলের মতো আমরা নির্যাতনকে নির্মুল করতে পারিনি। সমাজের সকল নির্যাতন এবং অন্যায় দূর করতে সামাজিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তিনি জানান, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসকল বিষয়ের প্রতি অনেক কাজ করতে চান কিন্তু নানা ধরণের বাঁধা ও প্রতিকুলতার জন্য সকল কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন না। তিনি বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে কাজ করার আহবান জানান।

 

সম্মেলনের শেষে সভাপ্রধান এবং আমরাই পারি জোটের চেয়ারপারসন মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামলা বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে কিন্তু নারীর সম অবস্থান এখনও তৈরি হয়নি। সভায় উপস্থিত চেঞ্জমেকারদের দেশ গড়ার কাজে যুক্ত থাকতে আহবান জানান তিনি। তিনি চেঞ্জমেকারদের উদ্দেশ্যে বলেন, অন্যান্য দেশের সাথে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের পার্থক্য হচ্ছে আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তাই একটি অসাম্প্রদায়িক, নির্যাতনমুক্ত, সহিংসতাহীন, সভ্য, সব মানুষের জন্য সমমর্যাদার দেশ গড়ে তোলার কাজ আমাদেরকে করতে হবে।

 

সম্মেলনে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করার জন্য সারা দেশ থেকে নির্বাচিত ৫ জন ‘আমরাই পারি চেঞ্জমেকারকে’ পুরস্কৃত করা হয়।