মৌসুমী হুদা, একজন অপরাজিতা

মৌসুমী হুদা, একজন অপরাজিতা
''চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য''

 

এভাবেই যুগে যুগে নারী বন্দনায় কবির শুদ্ধতম আবেগ থেকে শুরু করে শিল্পীর তুলির আঁচড়ে কিংবা নিতান্তই সাধারণ কোন যুবকের কল্পনায় উঠে এসেছে নারীর দীঘল কালো ঘন কেশের স্তুতি। নানা উপমায়, নানা মহিমায় নারীর সৌন্দর্যের সংজ্ঞার বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে তার কেশের বর্ণনা। একবার ভাবুন তো! চুল নেই অথচ কোন নারী সবাইকে মুগ্ধ করেছেন তার সবলীল স্বাভাবিক সৌন্দর্যে। কি! ভাবতে পারছেন নাতো। এবার তবে ভাবনার লাগামকে ছেড়ে দেবার সময় এসেছে। একবিংশ শতাব্দীতে পা রেখে নারী বদলে দিয়েছে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা। নারীর আÍবিশ্বাস তার দুর্বলতাকে পরিণত করেছে শক্তিতে।

 

বলছি তেমনি এক সাহসী নারীর গল্প। মৌসুমী মৌ, বাংলাদেশের প্রথম নারী মডেল যিনি গতানুগতিক সৌন্দর্যের বেড়াজাল ভেঙ্গে ফ্যাশন মঞ্চ মাত করেছেন। তার মাথায় একটিও চুল নেই এবং এটিই তার শক্তি। যে সমাজ বাহ্যিক সৌন্দর্যের আরাধনার পূজারি, সে সমাজে কেশবিহীন মডেল হয়ে উঠবার গল্প নিতান্তই সহজ ছিলো না।

 

৭০০ টাকা হাতে নিয়ে প্রথমবার ঢাকায় পা রেখেছিলেন মৌসুমী মৌ। পারিপার্শ্বিক নেতিবাচকতার শিকার হয়ে জন্মস্থান থেকে বেরিয়ে নতুন করে জীবনটাকে সাজাতে রাজধানীর অভিমুখে এই যাত্রা। বন্ধু দ¤পতির সহায়তায় পা রাখেন স্বপ্নের অঙ্গনে। ছোটবেলা থেকেই ফ্যাশন কিংবা শোবিজের আলো ঝলমলে জগতের প্রতি তার ভীষণ আকর্ষণ ছিলো। মনোযোগ দিয়ে দেখতেন টিভির প্রতিটি ফ্যাশন শো। রাস্তার পাশে বড় বড় বিলবোর্ডগুলোতে লজুক মুখে মনে মনে নিজেকে আঁকতে ভালোবাসতেন তিনি। যদিও এসব অবাস্তব কল্পনাগুলোকে যত্ন করে সন্তর্পণে লুকিয়ে রাখতেন নিজের কাছেই।

 

রাজশাহীর ছোট্ট শহরে জন্ম মৌসুমী মৌয়ের। বাবা আবদুল আলী এবং মা আজরা বেগমের চার সন্তানের মাঝে বড় মৌসুমী মৌ। স্বভাবে যেমন তিনি ডানপিটে ছিলেন, তেমনি লেখাপড়াতেও ছিলেন আগ্রহী। কিন্তু তার দুরন্ত শৈশব ম্লান হয়ে যায় টাইফয়েডের প্রকোপে। পর পর দুবার টাইফয়েডে ভুগে মাথার সব চুল এবং ভ্রু ঝরে যায় তার। বছর পেরুলেও হাজার চেষ্টা করেও তার চুল কিংবা ভ্রু গজায় না বরং চোখের পাপড়ি ঝরে যেতে থাকে। কাঁচা ডিম, পেঁয়াজ, লেবু, রসুন, কবিরাজি তেল থেকে শুরু করে আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি কিছুতেই চুলের কোন উন্নতি হয়না। আতঙ্ক মন খারাপের দিনগুলিতে সৃষ্টিকর্তার সাথে ঝগড়া করেই দিন কাটাতেন তিনি, কেন তাকেই চুলের সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত করা হলো এমন অবুঝ অভিমানে ভরে উঠতো মন। এ নিয়ে তার বাবা মা ভীষণ চিন্তিত ছিলেন স্বাভাবিক ভাবেই।

 

 

স্কুল কলেজের জীবন স্কার্ফে মাথা ঢেকেই কেটেছে মৌসুমির, তেমন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু আত্মীয় স্বজনের বাড়ি, লোক-লৌকিকতায় তাকে পরতে হতো চরম অস্বস্তিতে। তার বাবা তাকে এ অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে কিনে দেন একটি সাধারণ পরচুলা। যেটিতে খুব সহজেই বোঝা যেতো তার মাথায় কোন চুল নেই। ফলশ্র“তিতে বিভিন্ন কটাক্ষ কিংবা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হতো তাকে। আত্মীয় স্বজনেরা সমবেদনা প্রকাশ করে মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে এমন পাত্রের সন্ধান এনে সাহায্য করতে চাইতেন। তার মা বাবাও ভেঙ্গে পরেছিলেন মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে। দিনে দিনে তার পারিপার্শ্বিকতা অপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে বলে তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন শুরুর আহ্বানে জন্মস্থান ছেড়ে রাজধানীতে চলে আসেন।

 

ছেলেবেলার মডেলিং-এর অলীক স্বপ্নটাকে পুঁজি করে নতুন জীবনের পথে পা বাড়ান তিনি। এ সময়ে তাকে সার্বিক ভাবে সহায়তা করেন তার বন্ধু দম্পতি। তাদের থেকেই প্রথম কাজের শুরু, একটি দোকানের উদ্বোধনে তার মডেলিং জীবনের প্রথম আয় এক হাজার টাকা। এরপর অতীতের সকল গ্লানি ঝেরে ফেলে এগিয়ে যান আÍবিশ্বাসে নতুন সম্ভাবনায়। ভর্তি হন বুলবুল টু¤পার গ্র“মিং স্কুলে, তিন মাস ক্লাস করে মডেলিং- এর খুঁটিনাটি শিখে উঠলেও চুল না থাকায় কাজ পাওয়া সহজ হয়নি তার। খুব অল্প সংখ্যক কাজ পেলেও অধৈর্য হয়ে ঝরে যাননি, পরচুলা পরে হেঁটেছেন আলোর জগতে নিষ্ঠায়, অধ্যবসায়ে।

 

 

১৮ জুলাই ২০১৬, তার জীবনে এনে দিয়েছিলো নতুন ভোর। প্রথমবারের মতো তিনি র‌্যাম্পে হেঁটেছিলেন স্বমহিমায়। ইন্টারন্যাশনাল কটন কাউন্সিল (সিসিআই)- এর আয়োজিত ফ্যাশন শোতে পশ্চিমা সাজপোশাকে কোরিওগ্রাফার আসাদ খানের নির্দেশনায় ১০৩ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে ন্যাড়া মাথায়  মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এক ঝাঁক মডেলদের মাঝে নানা রকম ট্যাটুতে রাঙানো এই ন্যাড়া মাথার নবীন মডেলটাই সবার মন জয় করে নিলেন, নতুনত্বের প্রশংসায় ভাসলেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তার। সফলভাবেই শত র‌্যাম্পের গণ্ডি পেরিয়েছেন তিনি। দেশের সবচাইতে বড় ফ্যাশন শো ট্রেসমে বাংলাদেশ ফ্যাশন উইকে প্রতি বছরই হাঁটছেন। প্রতিবন্ধকতাকে পিছনে ফেলে স্বপ্নকে মুঠোয় পুরে এগিয়ে চলেছেন মৌসুমী, নিজেকে দেখতে চান আন্তর্জাতিক মডেল হিসেবে।

 

মডেলিং জীবনের পুরো যাত্রাপথে চরাই উতরাই- এ তিনি পাশে পেয়েছেন তানজিদ-উল-হুদাকে। পরবর্তীতে এ বন্ধুটিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহন করে তিনি হয়ে ওঠেন মৌসুমী মৌ থেকে মৌসুমী হুদা।

 

নেতিবাচকতায় ডুবে না থেকে নিজেকে অনুপ্রাণিত করে ইচ্ছে শক্তিকে কাজে লাগিয়েই সফলতা অর্জন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। মৌসুমী হুদা হেরে যাননি, তার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দুর্বলতাকে শক্তি করে হয়ে উঠেছেন একজন অনন্যা, একজন অপরাজিতার গল্প।