দেশে ইতিহাস গড়ার পথে নিশার উই

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে নাসিমা আক্তার নিশা
নারীদের যেখানে আগে বোঝা মনে করা হতো সংসারে, সেখানে এই গ্রুপের মাধ্যমে বাসায় বসেই একেকজন নারী প্রতিমাসে বিক্রি করছেন লাখ টাকার পণ্য। বাংলাদেশের আইটি খাতে নারীর এ অগ্রযাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে যে কয়েকজন মানুষের কারণে খুব চোখে পড়ছে নাসিমা আক্তার নিশা তাদেরই একজন।

যেকোনো সাধারণ ফেসবুক গ্রুপের গন্ডি ছাপিয়ে বিশাল এক কমিউনিটিতে পরিণত হয়েছে আড়াই লক্ষ মানুষের গ্রুপ 'ওমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম' (উই)। সব বয়স আর শ্রেণি পেশার নারীদের উপস্থিতি এটিকে করেছে একদম আলাদা। ষোল শেষ করা ডানপিঠে তরুণী যেমন উইতে জামদানী পণ্যের ব্যবসায় নিয়ে হাজির, তেমনি জীবনের মধ্যগগনে পা দেয়া নারীও তার বানানো আচার নিয়ে হাজির। দুজনের মধ্যে সম্পর্কের বিকাশটা করেছে এই প্লাটফর্ম। বলা হয়ে থাকে, উই এর গ্রুপে একটিভ থাকলেই মিলে পুরষ্কার।

 

উইতে কোনো সরাসরি সেল পোস্ট করা যায়না। এর জন্য রয়েছে সুন্দর কিছু নিয়ম, যা এই প্লাটফর্মটিকে করেছে অনন্য। নারীদের যেখানে আগে বোঝা মনে করা হতো সংসারে, সেখানে এই গ্রুপের মাধ্যমে বাসায় বসেই একেকজন নারী প্রতিমাসে বিক্রি করছেন লাখ টাকার পণ্য। বাংলাদেশের আইটি খাতে নারীর এ অগ্রযাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে যে কয়েকজন মানুষের কারণে খুব চোখে পড়ছে নাসিমা আক্তার নিশা তাদেরই একজন। বর্তমানে ই-ক্যাবের জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছেন দেশজুড়ে, এই মানুষটির স্বপ্নের প্লাটফর্ম উই।  

 

নিশার ছোটবেলা কেটেছে বনানীতে, বাবা হাজী সাহাব উদ্দিনের অনেক আদরের মেয়ে নাসিমার সবকিছুই বাবা হতে শেখা। বাবা প্রচণ্ড দান করতেন, ছোট্ট নিশা যেন তখন থেকেই শিখতেন সবকিছু। বনানীতেই স্কুলের গণ্ডি পেড়িয়ে ভর্তি হলে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে, এরপর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। দু-এক বছরের মাথায়ই বাবার ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যবসায় দেখতে শুরু করলেন পুরোদমে, কাজকে করে নিতে লাগলেন আপন করে। এরপর এভাবেই চলছিলো কিছুদিন। ২০০৬ সালের শেষে দানা বাঁধে এক রোগ, যা তাকে ভুগিয়েছে চার বছর। দেশের বাইরে ট্রিটমেন্টে যাবা আগেই, বাংলাদেশে যৌথভাবে একটা গেমিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ভাগ্য খারাপ! যখন ফিরে আসলেন, প্রতিষ্ঠানটি নানা কারণে এগোলো না।

 

খুব কষ্ট পেয়েছিলেন সেদিন। হাল ছাড়েননি, নিজের আইটি নলেজ না থাকলেও গেমিং ইন্ড্রাস্টির প্রতি প্রচ্ছন্ন একটা ভালোবাসা ছিলোই। নর্থসাউথের বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন 'রিভারি করপোরেশন'। বনানীতে বর্তমানে ১৬ জনের টিম কাজ করছে গেম ডেভেলপমেন্ট, অ্যাপসসহ বিভিন্ন কাজে। এরমাঝেই মহাখালীতে সম্পূর্ন নিজের তত্ত্বাবধানে গার্মেন্টস চালিয়েছেন নিজে কিনে, পরে অবশ্য সময়স্বল্পতা, ই-ক্যাব নিয়ে ব্যস্ততায় গার্মেন্টসটি বন্ধ করে দেন।

 

আগে থেকেই বেসিস এর সদস্য ছিলেন, ই-ক্যাবের মূল প্লাটফর্মে যুক্ত হলেন। ফলাফলও দ্রুত এসেছে, ই-ক্যাবের ইসিতে আসেন তিনি। বর্তমানে টানা ২য় বার জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

 

নিশা এরমধ্যেই এদেশীয় মেয়েদের ই-কমার্সে ব্যবসায়ে সাফল্য দেখে প্রতিষ্ঠা করলেন 'ওমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম- উই'। যেখান থেকে তিনি নারী উদ্যোক্তাদের নানাভাবে প্রস্তুত করছেন ব্যবসায় দাঁড় করাতে। সাফল্য নিয়ে এসেছেন বড় একটি। উই এর সদস্যদের দাবি ছিলো, তারা বছরজুড়ে চলা মেলায় স্টল দিতে পারেন না অনেক বুকিং মানি হওয়ায়।এ কথাটা শুনেই ই-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট অভিনেত্রী শমী কায়সার বললেন, 'নিশা তুমি করো। আমি আছি।।

 

মাত্র ১৫ দিনের মাথায় খুব বড় আঙ্গিকে মেলার আয়োজন করলেন নিশা, চারদিনের মেলায় দর্শনার্থী আনার জন্য কোনোদিন - মেকাপ আর্টিস্ট ফ্রি, কোনোদিন মেহেদী করানো ফ্রি, একদিন তার বাবার নামে স্মৃতি-বৃত্তির পুরষ্কারের আয়োজন করেন, যার কারণে দর্শনার্থীও প্রচুর আসেন। এরকম নানা আয়োজনে উইকে করছিলেন চাঙ্গা, করছিলেন সমৃদ্ধ। ঠিক এসময় তার উদ্যোগকে পূর্ণতা দিতে আসেন একজন সাক্ষাত মহান মানুষ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উই এর সাথে রয়েছেন দেশের ই-কমার্স ইন্ড্রাস্টির পথিকৃৎ, সার্চ ইংলিশের ফাউন্ডার রাজিব আহমেদ। তার নানান অবদানের ফলেই ক্রমেই বদলাতে থাকে গ্রুপটি, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত যার জয়রথ চলছেই।

 

 

এর মধ্যে জীবনে নেমে আসে দুঃস্বপ্নের মত সকল কাজের সঙ্গী স্বামীকে হারানো, স্বামীর মৃত্যুর পর দুনিয়াটা নতুন করে চিনলেও স্বামীর অনুপ্রেরণাকে আগলে গত কয়েকমাসে পুরো বদলে নিয়েছেন নিজের আর মানুষের জন্য করার কাজগুলোকে, এখন নিশা পুরোপুরি মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তার সুবিশাল মডারেটর টিম, ওয়ার্কিং কমিটি সহ।

 

আজ সিলেটি ওয়েব তো কাল কুমিল্লার খাদি প্রোডাক্ট নিয়ে আড্ডা। ফ্রি নানা ট্রেনিং আর সুন্দর সব আয়োজন উই কে করেছে গণমানুষের ফোরামে। এদিকে নিশার যুদ্ধ চলছেই, নিশা বললেন,  আসলে পরিবার, ব্যবসায়, ই-ক্যাব সবকিছু মিলিয়েই এগিয়ে চলছি। উই আর আমার সন্তান আয়ানকে নিয়েই আমার বেঁচে থাকা। আমি দেশের ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের জীবনমান উন্নয়নে সারাজীবন কাজ করে যাবো।