বন্ধ্যত্বের দায় একা নারীর নয়

প্রতীকী ছবি
বংশপরম্পরা কিংবা উত্তরাধিকার রক্ষা বা নিশ্চিত করা যেমন শুধু একজন নারীর দায়িত্ব হতে পারে না, তেমনি বন্ধ্যত্বের দায়ও একা নারীর হতে পারে না।

‘বন্ধ্যত্ব’, পারিবারিক জীবনে একটি চূড়ান্ত হতাশার নাম। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় মাতৃত্বকে নারীর পূর্ণতা হিসেবে দেখা হয়, যা একরকম বাধ্যতামূলকভাবেই অর্জন করতে হয় প্রতিটি নারীকেই। আর এর বিপরীত ঘটলেই যত সমস্যা। ‘বন্ধ্যত্ব’ শব্দটি কোনো পুরুষের জীবন অতটা না পাল্টালেও, বিস্তর প্রভাব ফেলে একজন নারীর জীবনে। বিয়ের পরে সন্তান জন্মদানের সব দায় শুধু তার একার। এক্ষেত্রে পুরুষের কোনো দায় নেই। ‘উত্তরাধিকারের’ দায় মেটানোর বংশপরম্পরার কাজ নারীকেই করে যেতে হচ্ছে।

 

ধরা যাক, মাহমুদুর রহমান এবং তানিয়া রহমান (ছদ্মনাম) দম্পতির কথা। দুইজনই চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পূর্ণ হলো সম্প্রতি। তবে এখনো কোনো সন্তানের মুখ দেখেননি এই দম্পতির। দেশ-বিদেশে চিকিৎসা করানোর পরও মা হতে পারেননি তানিয়া। আর এজন্য তাকে প্রায়ই শুনতে হয় বিভিন্ন ধরনের তির্যক কথা কিংবা মন্তব্য। তানিয়া বলেন, আমি আমার জীবনে আমার অনেক প্রিয় মানুষের কাছে অনেকবার শুনেছি, ‘কেন সন্তান হচ্ছে না? দোষটা কার? সন্তান ছাড়া আমার জীবন পূর্ণ হবে না।’

 

এদিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু নারী নয় পুরুষও সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার ৮ থেকে ১০ শতাংশ দম্পতি কোনো না কোনো রকমের বন্ধ্যত্ব সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশে এর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় এই সংখ্যা বাড়ছে।

 

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের করা ‘বন্ধ্যত্ব নিয়ে জটিলতা’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এদেশের ৪৫ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যত্ব সমস্যায় রয়েছে।

 

অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরীর মতে, নারী-পুরষ উভয়েরই বন্ধ্যত্ব সমস্যা হতে পারে। নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউব, গর্ভাশয় কিংবা ডিম্বাশয়ের সমস্যায় বন্ধ্যত্ব হয়। গর্ভধারণ সময়ে অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের কারণেও গর্ভস্থ কন্যা তার পরিণত বয়সে গর্ভধারণে অক্ষম হতে পারে। পুরুষের বীর্যে শুক্রাণুর স্বল্পতার কারণে হতে পারে বন্ধ্যত্ব।

 

পাশাপাশি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একদল পুরুষের ওপর একটি পরীক্ষা চালিয়েছে। এই পরীক্ষায় ওজন আধিক্যে ভোগা ১৫ জন পুরুষের স্পার্ম নিয়ে পরীক্ষা করেন গবেষকরা। তাতে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের কারণে পুরুষদের শুক্রাণুর জিনে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বেশ দুর্বল হয়। স্পার্ম কাউন্টও কমে যায় পেটের অতিরিক্ত চর্বির কারণে। কমতে কমতে এতই কমতে থাকে যে সন্তান জন্মদানে বাধাগ্রস্ত হয়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ দূষণ, ভেজাল খাবার গ্রহণ, স্ট্রেস, দেরিতে বিয়ে এবং কোলের কাছে রেখে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের মাত্রারিক্ত ব্যবহারে সেখান থেকে নির্গত ক্ষতিকর রশ্মির কারণে নারী ও পুরুষের বন্ধ্যত্বের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়াও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, অপর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম না করা ইত্যাদি কারণেও দিন দিন অবনতি ঘটতে থাকে একজন পুরুষের যৌনস্বাস্থ্যের। তাই বলাই যায়, বংশপরম্পরা কিংবা উত্তরাধিকার রক্ষা বা নিশ্চিত করা যেমন শুধু একজন নারীর দায়িত্ব হতে পারে না, তেমনি বন্ধ্যত্বের দায়ও একা নারীর হতে পারে না।