জননী'র গল্প

জননী'র গল্প
জাহানারা ইমাম
রুমীর প্রথম যুদ্ধে যাবার সম্মতি অর্জনের সংকল্পের গল্প, লিখেছেন গেরিলা যুদ্ধের টান টান উত্তেজনার গল্প এবং ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর কথাও। যে রাতে তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তান রুমীকে হানাদার বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যায়, যার পরে আর কোনদিন লেখিকার তাঁর সন্তানের সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি তাঁর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের সবচেয়ে করুণতম মুহূর্তের  মর্মস্পর্শী বেদনা, একজন পুত্রহারা জননীর হাহাকার।

উনিশ শতকের গোঁড়ার দিকের কথা। সেই সময়ে নারীর স্বপ্নের পরিধি সীমাবদ্ধ ছিল চৌকাঠ অবধি। অন্তঃপুরের অবরুদ্ধতাই ছিল তাদের নিয়তি। তবে দুর্গ ভেঙ্গে চুড়ে অবরুদ্ধতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছিলেন এক দুরন্ত কিশোরী। তিনি সাইকেল চালিয়ে চষে বেড়াতেন পুরো শহরজুড়ে, মেতে উঠেছিলেন বাম রাজনীতিতে। তাঁর জগত জুড়ে ছিল টলস্টয়, দস্তোভস্কি,  শেকসপিয়ার। তাঁর নাম ডাক নাম ছিল 'জুডু'। 

 

 

এই দুরন্ত কিশোরী 'জুডু'ই একদিন হয়ে ওঠেন প্রতিটি বাঙালির অনুপ্রেরণা। 'জয় আমাদের হবেই' এটাই ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা এবং মমতার এক অপূর্ব সংমিশ্রন তিনি, যিনি হার মানেননি তীব্র শোক কিংবা শত অসুস্থতায়। দেশকে ভালোবেসে ত্যাগ- তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের মা। তিনি আর কেও নন, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

 

 

আজ এই জননীর আর্বিভাব তিথি। ১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। অত্যন্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক মনস্ক। বাবার আগ্রহেই পড়াশোনায় হাতেখড়ি তাঁর, বাবার সংগ্রহে থাকা দেশি- বিদেশি বই, পত্র পত্রিকায় ডুবে থাকতেন তিনি। তাঁর বর্ণিল শিক্ষাজীবনে মা সৈয়দা হামিদা বেগমের সহজাত মমতা এবং সাহচর্যে তিনি মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোন ১৯৪২ সালে। রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ তিনি চলে আসেন কলকাতায়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ এ কলকাতার লডি ব্রেবোর্ণ কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি বৈবাহিক সূত্রে ঢাকায় চলে আসেন এবং কর্মজগতে প্রবেশ করেন। চলার পথের অনুপ্রেরণা হয়ে পাশে থাকেন তাঁর স্বামী শরিফুল আলম ইমাম। পেশায় প্রকৌশলী এ মানুষটির সহযোগিতা এবং ভালোবাসায় তিনি শিশু সন্তান রুমীকে সামলে ১৯৬৪ সালে ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি জমান আমেরিকায়, অর্জন করেন 'সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন' ডিগ্রি। এরপর ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে স্বপ্লকালীন প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র যান। 

 

 

কর্মজীবনের শুরুটা ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯৫১ সালে প্রথম সন্তান শফি ইমাম রুমীর জন্ম হয়। ১৯৫২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। দ্বিতীয় সন্তান সাইফ ইমাম জামী'র জন্মের পর তিনি ১৯৬০ সালে শিক্ষকতার পেশার কিছুকাল বিরতি নেন। এরপর ১৯৬৪ সালে আমেরিকা থেকে ফিরে তিনি ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে অধ্যাপিকা হিসেবে যোগদান করেন এবং তখন থেকেই টুকটাক লেখালিখি শুরু করেন। সংসার জীবনের পাশাপাশি তিনি  সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠনেও জড়িয়ে পড়েন। 

 

 

সেসময়ে উত্তাল ছিল বাংলা স্বাধীকার আন্দোলনে, বায়োন্নোর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনের টান টান উত্তেজনার পরই শুরু হয়ে যায় বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই। এ লড়াইয়ে আপামর বাঙালি ঝাঁপিয়ে খানসেনাদের ওপর যার যার অবস্থান থেকে। আর এখানেই আমাদের পরিচয় হয় নতুন একজন নির্ভীক যোদ্ধার সঙ্গে। যিনি শুধু একজন বীরমাতা- ই নন, হয়ে উঠেন গেরিলাদের সহযোদ্ধা।

 

 

তাঁর বাড়ি 'কণিকা' ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রিয় নাম। প্রায়ই গেরিলা যোদ্ধারা সেখানে আসতেন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় রসদ তারা সেখান থেকে সংগ্রহ করতেন। এমনকি যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি হাজার প্রতিকূলতা, শোক সামলেও সেই রসদ আগলে রেখেছেন। একমুঠো চাল সেখান থেকে নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার করেননি তিনি। শুধু অন্তরালে থেকে সাহায্যই নয় বীরপুত্রের সঙ্গে নিজে গাড়ি চালিয়ে অস্ত্র জোগাড় থেকে শুরু করে অস্ত্র সংরক্ষণ করেছেন নির্ভীক চিত্তে। 

 

 

সেই নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবর্ণনীয় আতঙ্ক, খানসেনাদের নির্মমতার ইতিহাস তিনি তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি  'একাত্তরের দিনগুলি'তে। পহেলা মার্চ থেকে শুরু একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধকালীন জীবন- যাপনের যে ছবি তিনি এঁকেছেন সে দিনলিপির পাতায় পাতায় মিশে থাকা আর্তনাদ আপনাকে বাকরুদ্ধ করে তুলবে, করে তুলবে অশ্রু আপ্লুত। 

 

 

তিনি লিখেছেন, রুমীর প্রথম যুদ্ধে যাবার সম্মতি অর্জনের সংকল্পের গল্প, লিখেছেন গেরিলা যুদ্ধের টান টান উত্তেজনার গল্প এবং ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর কথাও। যে রাতে তাঁর প্রাণপ্রিয় সন্তান রুমীকে হানাদার বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যায়, যার পরে আর কোনদিন লেখিকার তাঁর সন্তানের সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি তাঁর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের সবচেয়ে করুণতম মুহূর্তের  মর্মস্পর্শী বেদনা, একজন পুত্রহারা জননীর হাহাকার।

 

 

নান্দনিক কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ 'বিচিত্রা'য় লিখেছিলেন, " ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তিনি দেখছেন। কিন্তু দেখছেন দূর থেকে। যদিও এই গল্প তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত গল্প। জননীর তীব্র শোকও বেদনার গল্প। নিজের গল্প দূর থেকে দেখতে পারেন তাঁরাই, যারা বড় শিল্পী। গভীর আবেগকে সংযত করবার জন্য প্রয়োজন হয় একটি পাষাণ হৃদয়ের। সত্যিকার শিল্পীদের হৃদয় হয় পাথরের, নয়তো এত দুঃখকে তাঁরা কোথায় ধারণ করবেন? জাহানারা ইমাম হৃদয় কে পাথর করে লিখলেন তাঁর ডায়েরী। কি অসম্ভব আন্তরিকতার সঙ্গেই না তাঁর গল্প বলে গেছেন। সেই গল্প তাঁর একার থাকেনি। কোন এক অলৌকিক উপায়ে হয়ে গেছে আমাদের সবার গল্প।"

 

 

১৯৮৬ সালে লেখিকার এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। দেশ বিদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয় মুক্তিযুদ্ধের এ অমূল্য দলিল। দেশের মুক্তির লড়াইয়ে তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানকে কোরবানি দিয়ে, জীবন সঙ্গীকে হারিয়েও শোকে মুহ্যমান হয়ে ভেঙ্গে পড়েননি। শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি আবারো যুদ্ধে নামেন তিনি, দেশকে কলঙ্ক মুক্তিকরণ অভিযানে।  

 

 

এ যুদ্ধের শুরুটা ১৯৯১ এর ২৯ ডিসেম্বর। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জামায়াতের আমীর ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদে ১৯ জানুয়ারি ১৯৯২ সালে ১০১ সদস্যের ঘাতক নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪ টি ছাত্র সংগঠন, রাজনৈতিক, নারী, শ্রমিক, কৃষক ও সাংস্কৃতিক জোট সহ মোট ৭০ টি সংগঠনের সমন্বয়ে ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের নরঘাতক নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটিতে তিনি সর্বসম্মতিতে আহ্বায়ক হন।     

 

এ সময়ে প্রভাবশালী মহলের প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হন তিনি এমনকি পুলিশের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালেও অবস্থান করেন কিন্তু নির্ভীক এ যোদ্ধা  তাতেও তিনি পিছিয়ে আসেননি। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণ আদালতের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচারে ১৩ টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ড যোগ্য বলে রায় প্রদান করেন। এ গণআদালতের সদস্য ছিলেন এডভোকেট গাজিউল হক, ড. আহমদ শরীফ, কবি সুফিয়া কামাল, শওকত ওসমান সহ বারো জন। যুদ্ধাপরাধী নির্মূল যুদ্ধে তিনি আমৃত্যু লড়ে গেছেন, পরোয়া করেননি কর্কট রোগের ভয়াবহতাকেও। ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস করেও তিনি দেখেছেন একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে যুদ্ধাপরাধী নামক কোন কলুষতা নেই।

 

 

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ স্বপ্ন লালন করেছেন, তাঁর এ স্বপ্নের উত্তরাধিকার করে গেছেন সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে। ক্যান্সারের ভয়াবহতায় কণ্ঠরোধ হলেও তাঁর চেতনায় তখনো স্বদেশ প্রেম। তিনি লিখে গেছেন, " একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ও ৭১ এর ঘাতক নির্মূল আন্দোলনের দায়িত্বভার আমি আপনাদের, বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পণ করলাম। জয় আমাদের হবেই।"

 

 

এই নির্ভীক সাহসী মহীয়সী নারী তাঁর অসাধারণ বর্ণিল জীবনে পেয়েছেন অনেক সম্মাননা। বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার, কমর মুশতরী সাহিত্য পুরস্কার, নারী গ্রন্থ প্রবর্তনা, স্বাধীনতা পদক, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, রোকেয়া পদক ইত্যাদি।

 

 

১৯৯৪ সালের জুনের ছাব্বিশ তারিখে এই অনন্যা অনন্তযাত্রা করেন। মুক্তিযুদ্ধের আটজন সেক্টর কমান্ডার এ বীর জননীকে 'গার্ড অব অনার' প্রদান করেন। কিন্তু নক্ষত্রের মৃত্যু নেই এ মহীয়সী নারী বেঁচে থাকবেন আজীবন তাঁর কর্মে, তিনি প্রমাণ করেছিলেন বাঙালী মায়েরা কেবল মমতাময়ীই নন প্রয়োজনে তাঁরা হয়ে উঠেন সাহসী, শক্তিমান, ত্যাগের উপমা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একজন জাহানারা ইমাম তাঁর ত্যাগ ও অবদানে আজীবন বাংলার মাটি ও মানুষের অস্তিত্বে অমর হয়ে থাকবেন।