১শ’ ৫২ সন্তানের জননী!

১শ’ ৫২ সন্তানের জননী!
পরিবারে মেয়ে যে অভিশাপ নয় আশীর্বাদ এখন তা প্রমাণিত হচ্ছে ঘরে ঘরে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় কাজী শেলীর মধ্যে দরিদ্র অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তার স্বপ্ন ও ইচ্ছে সত্যি হয়েছে। কাজী শেলী ১৯৯২ ঢাকার কুর্মিটোলা স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৯৪ সালে তেজগাঁও কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। টঙ্গী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থকে স্নাতকোত্তর করেন সালে। কাজী শেলী খেলাধুলায়ও ছিলেন পারদর্শী।

‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে, মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে’। ‘কত স্বপ্ন ছিল বুকের ভিতর তোমায় নিয়ে মাগো, সেই স্বপ্নগুলো থমকে আছে তুমি এসে দেখো/ তোমার  ছেলের কাটছে সময় কেমন অসহায় আমি খুঁজেছি তোমায় মা গো’। মাকে নিয়ে যুগে যুগে রচিত হয়ছে শত শত গান ও কবিতা। মায়ের মতো আপন এই পৃথিবীতে কেউ নাই। নিজ গর্ভে জন্ম না দিয়েও পরিচয়হীন ১শ ৫০ সন্তানের মমতাময়ী মা হয়েছেন কাজী শেলী। পুরোনাম শিরিন আক্তার হলেও কাজী শেলী নামেই সবাই চেনে। 

গল্পটা একটু পেছনের। ২০০৬ সালে গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে পরিচালিত ব্রিটিশ হোম ফ্যামিলি ফর চিলড্রেন শিশুপল্লিতে প্যাট্্িরয়াসিয়া কারের অধীনে সমাজকর্মী হিসেবে পুনর্বাসনের দায়িত্ব পালন করেন ২০০৮ সাল পযর্ন্ত। ২০০৯ সালে ফ্যমিলিজ ফর চিলড্রেন-কানাডার একটি হোম, যার দায়িত্বে ছিলেন সান্ড্রা সিম্পুন। সেখানে তিনি সমাজকর্মী হিসেবে এভান্ডেন্ট চাইল্ডদের পুনর্বাসন প্রোগ্রামে কাজ শুরু করেন। 


২০০৯ সালে যখন বাংলাদেশ সরকার জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত আইন জারি করলে ঝামেলাটা তখনই শুরু হয়। তখন পরিচয়হীন হয়ে পড়ে কানাডার হোম ঢাকার উত্তরায় থাকা ১শ ৫০জন এতিম ছেলেমেয়ে। এ-ঘটনায় চিন্তিত হয়ে পড়েন কাজী শেলী। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেন আইনি প্রক্রিয়ায় পরিচয়হীন ১শ ৫০ জন ছেলেমেয়ের মা হবেন তিনি এবং বাবার স্থলে নিজের স্বামীর নাম থাকবে। যোগাযোগ করেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে। আইনি প্রক্রিয়ায় ১শ ৫০ ছেলেমেয়ের অভিভাবক হয়ে জন্মনিবন্ধন করান ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কার্যালয় থেকে। ছেলেমেয়েদের জন্মসনদে পিতা ও মাতার নামের জায়গায় লেখা হয় সাজ্জাদ আলম ও কাজী শেলীর নাম। এসব ছেলেমেয়ের মধ্যে অনেকের বয়স তখন ১২ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে ছিল। সেই  থেকে তিনি ও তার স্বামী এতিম ১শ ৫০ ছেলেমেয়ের আইনিভাবে পিতা-মাতা।
বর্তমানে সেই সব ছেলেমেয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়েদের মধ্যে আজহারুল ইসলাম অকোপেশন থেরাপিস্ট হিসেবে ঢাকার মিরপুরে চাকরি করছেন। মাসুম বিল্লাহ বেসরকারি চাকরি করেন। নার্গিসসহ কয়েজন নার্স আছেন ঢাকায় বেসরকারি হাসপাতালে। রিমি, রিনা নামে দুজন অকোপেশন থেরাপিস্ট সাভার সিআরপিতে কর্মরত আছেন। কেউ কেউ ব্যাংকে চাকরি করেছেন। তার মধ্যে দুজন বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ে গাজীপুর কেয়া কসমেটিক্সে লিমিটিডে ৮শ জন বাকপ্রতিবন্ধীর মধ্যে কাজ করে। এর মধ্যে রাবেয়াসহ পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। রাবেয়া ও তার স্বামী দু’জনেই বাকপ্রতিবন্ধী। একসঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে দুজন। বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় ডেন্টাল অ্যাস্টিটেন্ট হিসেবে চাকরি করছেন নারগিস নামে কাজী শেলীর আরেক সন্তান। নারগিস জানালেন, তিনি আমার এবং আমাদের অনেকের অভিভাবক। আমার পড়াশোনা, বড়ো হওয়া, চাকরি সবক্ষেত্রেই তিনি অনেক অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। মানুষ হিসেবে তিনি অসাধারণ একজন মমতাময়ী মা।  
কাজী শেলী সত্যিকার সমাজকর্মী। ১শ ৫০জন এতিম শিশুর মা হয়েছেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। শুধু জন্মসনদেই থেমে থাকেনি এই পরিচয়। ৬০জন ছেলেমেয়ের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে এ্যাকাউন্টও করে দেন কাজী শেলী। সেখানেও পিতা-মাতা হিসেবে যথারীতি তারাই। ব্যাংক একাউন্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিবাহসনদেও একই পরিচয় রয়েছে। ইতোমধ্যে কন্যারা বড়ো হয়েছে তাদের বিয়ে হয়েছে এবং তারা সুখে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগীত বিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেছে কয়েকজন।


কর্মজীবনে কাজী শেলী প্রথমে ১৯৯৭ সালে রাজধানীর মহাখালী কড়াইল বস্তিতে আরবান প্রজেক্ট স্যানিটেশন প্রোগ্রামে কাজ শুরু করেন। ২০০০ সাল থেকে ২০০৩ পর্যন্ত প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে সমাজকর্মী হিসেবে ময়মনসিংহ জেলার ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন নারী ও শিশুদের ওপর উন্নয়নমূলক কাজ করেন। সেই সময় প্রশিকার কাজী ফারুক, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির স্বাক্ষর অভিযানে স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মীর কাজও করেছেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম পদক্ষেপ কনসোর্ডিয়ামের সঙ্গে এইডস প্রোগ্রামের কর্মকর্তা হিসেবে উত্তরবঙ্গের ৭টি জেলায় সচেতনতামূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন।


মমতাময়ী কাজী শেলী ১৯৭৬ সালে ঢাকার খিলক্ষেতে কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কাজী  মো. সিরাজুল ইসলাম ও মা জান্নাতুল মাওয়া। দাদা কাজী আলী আহমেদ তার জন্মের পর মন খারাপ করেছিলেন। কিন্তু সেই মেয়েই তাদের পরিবারে উচ্চশিক্ষিত হয়ে পরিবারের মুখোজ্জ্বল করেছে। তার আক্ষেপ দাদা তার কাজ দেখে যেতে পারেননি। পরিবারে মেয়ে যে অভিশাপ নয় আশীর্বাদ এখন তা প্রমাণিত হচ্ছে ঘরে ঘরে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় কাজী শেলীর মধ্যে দরিদ্র অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তার স্বপ্ন ও ইচ্ছে সত্যি হয়েছে। কাজী শেলী ১৯৯২ ঢাকার কুর্মিটোলা স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৯৪ সালে তেজগাঁও কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। টঙ্গী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থকে স্নাতকোত্তর করেন সালে। কাজী শেলী খেলাধুলায়ও ছিলেন পারদর্শী। ১৯৮৯ সালে স্কুল জীবনে আন্তঃথানা ভলিবলে চ্যাম্পিয়ন হয় রাজধানীর শহিদ রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সঙ্গে। পরবর্তীসময় লাইব্রেরি সায়েন্সে  একাতকোত্তরও করেছেন তিনি।


গত ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যায় সাক্ষাতে কাজী শেলী জানালেন, সংসারে মেয়েছেলে কোনো বিভেদ থাকা উচিত না। প্রয়োজন শুধু তার মেধা, প্রজ্ঞা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও মানবতা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করা। কর্মজীবনের এক পর্যায়ে ২০১৫ সালে কাজী শেলী ঢাকা থেকে স্বামীর কর্মস্থল চট্টগ্রামে চলে যান। বর্তমানে কাজী শেলী চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার এম এ কাসেম রাজা উচ্চবিদ্যালয় স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। মমতাময়ী মা হিসেবে এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিললের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমদের হাত থেকে সম্মাননা। এছাড়াও সম্মাননা দিয়েছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর উপজেলার ইতিহাস ঐতিহ্য পরিষদ। সংসার জীবনে ১শ ৫০ সন্তান ছাড়াও নিজের গর্ভে জন্ম নিয়েছেন দুই সন্তান ধ্রুব ও তারা। সবমিলিয়ে ইতিহাসের পাতায় ১শ ৫২ সন্তানের মমতাময়ী মা তিনি।