কানাডা'র ইতিহাসে প্রথম নারী অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ

কানাডা'র ইতিহাসে প্রথম নারী অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ
ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড
দেশের গণমাধ্যমে জুতা, করোনা পরবর্তী বাজেট, কোভিডকালীন বিপুল ঘাটতি এসব আলোচনা চললেও সকল ধরনের আলোচনাকে ছাপিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রধান শিরোনাম হিসেবে উঠে এসেছে কানাডায় প্রথমবারের মতো কোন নারী অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ এর ঘটনা। 

কানাডার জাতীয় বাজেটকে ঘিরে সর্বদা বিরাজ করে এক উৎকণ্ঠা।  সে উৎকণ্ঠা যতটা না বাজেটে কি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে তার থেকে বেশি উৎকণ্ঠা থাকে অর্থমন্ত্রী কোন জুতা পরে আসলো তা নিয়ে। হয়তোবা ভাবছেন জুতার সাথে বাজেটের কি সম্পর্ক?  সে উত্তর পরে দিচ্ছি। কারণ এবছর কানাডার বাজেট পেশ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক ইতিহাস।  তাই এবার মিডিয়ার নজর জুতার থেকে সরে গিয়েছে অন্য দিকে।  কারণ দেশটিতে প্রথমবারের মতো কোন নারী অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করলেন।  


কানাডার ইতিহাসে নতুন সংযোজিত এই নারীর নাম ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড। এর আগে গতবছর আগস্টে কানাডার ইতিহাসে প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী হিসেবে নাম লেখান তিনি। তাকে দেশের অর্থ মন্ত্রণালয় সামলানোর গুরু দায়িত্ব দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। দেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে সফল হবেন বলে বেশ আশা প্রকাশ করেন ট্রুডো। আগের অর্থমন্ত্রী বিল মোর্নিও পদত্যাগ করায় ফ্রিল্যান্ডকে নিয়োগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো।


৫২ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্ড পূর্বে সাংবাদিকতা পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। এর পর দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। এরপর অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগে সর্বশেষ দেশের উপপ্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি আন্তঃ সরকার বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন তিনি। অর্থমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি আগের মতো উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বহাল আছেন । শুধু আন্তঃ সরকার বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়েছেন।


ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর এটি তার প্রথম বাজেট। এবার অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের পরিবেশে ফেডারেল সরকার তাদের বাজেট পেশ করেছে। সংসদ স্থগিত করে দিয়ে নতুন যাত্রার পর লিবারেল সরকার কোন বাজেট পেশ করেনি। গত দুই বছরে এটিই তাদের প্রথম বাজেট। আবার অন্যদিকে কানাডার ইতিহাসে কোন নারী অর্থমন্ত্রীর দেওয়া প্রথম বাজেটও এটি। 


তাই কানাডার এবারের বাজেটকে ঘিরে ছিল বেশ একটা রমরমা পরিবেশ। বাজেটে অর্থমন্ত্রী ফ্রিল্যান্ড এবার নজর দিয়েছেন কানাডার ‘ওয়ার্কিং উইম্যান’দের দিকে। এর আগেই কোভিড থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধারের কর্মসূচীকে তিনি ‘ফেমিনিস্ট রিকভারি’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাই তো বাজেট অধিবেশনে পায়ে দেওয়ার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন  কানাডার ’ওয়ার্কিং উইম্যান’দের পায়ে দেওয়ার জুতা। 


যদিও এবছর কোভিডকালীন বিপুল ব্যয়, ও ঘাটতির আলোচনায় অর্থমন্ত্রীর জুতার আলোচনাটি আড়ালই হয়ে গিয়েছিল। মিডিয়ার নজর বরাবরের মতো  অর্থমন্ত্রীর জুতার দিকে খুব একটা ছিলোনা। ও হ্যাঁ,  বাজেটের সাথে জুতার সম্পর্ক কি চলুন এবার তা জেনে আসা যাক।  


হাউজ অব কমন্সে জাতীয় বাজেট পেশ করার আগে কানাডার অর্থমন্ত্রী নতুন জুতা কেনেন। সেই জুতা পায়ে দিয়ে তিনি সংসদে যান এবং বাজেট পেশ করেন। এটিই হচ্ছে কানাডার বহুবছরের প্রচলিত ঐতিহ্য। বরাবরই বাজেট পেশের দিন অর্থমন্ত্রী কোন ধরনের জুতা কিনছেন, মিডিয়ার তীক্ষ্ণ নজর থাকে সেদিকে। বাজেটের আগে অর্থমন্ত্রীর কেনা জুতা দেখে বাজেটে কি গুরুত্ব পাচ্ছে, সে ব্যাপারে সবাই একটা ধারণা নেয়। অনেকে জুতার মডেল দেখে আগামী বাজেটের নীতিমালা সম্পর্কে আঁচ করারও চেষ্টা করেন।

 

করোনার কারণেই হোক আর নারী অর্থমন্ত্রী বাজেট দিচ্ছেন বলেই হোক – মিডিয়া এবার অর্থমন্ত্রীর জুতার দিকে তেমন একটা নজর দেয়নি। । তবুও ঐতিহ্য রক্ষার কথা ভুলেননি তিনি। ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড অর্থমন্ত্রীদের চিরায়ত ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করেছেন। বাজেট পেশের আগের দিনই তিনি বাজেট অধিবেশনে পায়ে দেওয়ার জন্য জুতা কিনে ফেলেন।


টরন্টোর ডাউন ডাউনে তার নিজের নির্বাচনী এলাকার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বাজেট অধিবেশনের জুতা কিনেন তিনি। ’ভাজেল’ নামের এই জুতা কোম্পানিটি টরন্টোয় যাত্রা করেছিল ২০১৫ সালে। অপেক্ষাকৃত নতুন ও ক্ষুদ্র একটি কোম্পানি থেকে বাজেট অধিবেশনের জুতা কিনে নিয়ে আসেন কানাডার অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড। 


জুতা কিনে এনেই তিনি ফোন করেন কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর  এল আইয়ুবজাদেহকে। ইরানি বংশোদ্ভূত তরুণী ’এল’-কে অর্থমন্ত্রী জানান, তার ডিজাইন করা, তার প্রতিষ্ঠানের জুতা পরে তিনি এবার বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগছে, বাজেট অধিবেশনে পায়ে দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডের বাছাই করা জুতার তাৎপর্য কি? বাজেট-পূর্ব সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করতে চান। আর এ কারণেই বাজেট অধিবেশনে পরার জন্য বেছে নিয়েছেন ক্ষুদ্র একটি  কোম্পানিকে। 


তবে দেশের গণমাধ্যমে জুতা, করোনা পরবর্তী বাজেট, কোভিডকালীন বিপুল ঘাটতি এসব আলোচনা চললেও সকল ধরনের আলোচনাকে ছাপিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রধান শিরোনাম হিসেবে উঠে এসেছে কানাডায় প্রথমবারের মতো কোন নারী অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ এর ঘটনা। 


উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালের ২ আগস্ট  কানাডার আলবার্টা শহরে জন্মগ্রহণ করেন ফ্রিল্যান্ড। তার পুরো নাম ক্রিস্টিয়া আলেকজান্ডার ফ্রিল্যান্ড। বাবা ডোনাল্ড ফ্রিল্যান্ড পেশায় আইনজীবী। মা হ্যালেনা ফ্রিল্যান্ড চমিয়াক গৃহিণী। ফ্রিল্যান্ড বিয়ে করেন ব্রিটিশ লেখক এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক গ্রাহাম বোলেকে। 

 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাশিয়ান ইতিহাস এবং সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি করেন। ১৯৯৩ সালে রোডস স্কলার হিসাবে অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্টনি কলেজ থেকে  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বেশ কয়েকটি ভাষায় কথা বলার দক্ষতা রয়েছে তার। ইংরেজি, রাশিয়ান, ইতালিয়ান,ইউক্রেন এবং ফরাসি ভাষায় বেশ দক্ষতার সঙ্গেই কথা বলতে পারেন।


ইউক্রেনে কাজ করার সময় ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং দ্য ইকোনমিস্ট’র হয়ে ফ্রিল্যান্ড সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার শুরু করেন। লন্ডনে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের ডেপুটি এডিটর এবং পরে উইকঅ্যান্ড সংস্করণ, এফটি ডটকম এবং ইউকে নিউজের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মস্কো ব্যুরোর প্রধান এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের পূর্ব ইউরোপের সংবাদদাতাও ছিলেন।


বিদেশ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য ফিরে এসে ২০১৩ সাল থেকে বসবাস শুরু করেন কানাডার টরন্টো শহরে। এরপর দীর্ঘদিনের  সাংবাদিকতা পেশাকে  ইস্তফা দিয়ে যোগ দেন রাজনীতিতে । ২০১৩ সালেই লিবারেল দলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেন। এরপর জীবনের প্রথম নির্বাচনেই শতকরা ৪৯ ভাগ ভোটে বিজয়ী হন। এরপরে আর কখনো রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কোন ধরনের  টানাপোড়েনে পরতে হয়নি তাকে। এসেছে একের পর এক সাফল্য এবং নিজেকে যুক্ত করেছেন কানাডার  ইতিহাস রচনার সাথে। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ইতিহাস রচনা করেন প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী হয়ে বাজেট পেশ করে।