রাজনীতিতে গ্রামীণ নারী

রাজনীতিতে গ্রামীণ নারী
রাজনীতিতে গ্রামীণ নারী
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলভুক্ত ৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা ছিল ১৯৭৪ সালের পর দ্রুততম। ব্যাংকটির পূর্বাভাস হচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশ। খুব ভালো কথা। কিন্তু কারা এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক? গ্রামীণ সেই নারী-পুরুষ যারা গার্মেন্টস-এ কাজ করছেন, গ্রামীণ সেই নারী-পুরুষ যারা বিদেশের মাটিতে কষ্ট করে কাজ করে দেশে রেমিটেন্স পাঠান, গ্রামীণ সেই নারী-পুরুষ যারা ধান-পাট শষ্য উৎপাদন করে সোজা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন বাংলাদেশকে।

১৯৭১ সালের পর থেকে দীর্ঘ ৪৮ বছরের পথ পরিক্রমায় নারীর সচেষ্ট বা পারিবারিক প্রচেষ্টায় একাংশ বৃহদাকারে সাফল্যম-িত হয়েছে বলে আমরা আনন্দ পাই। বিগত চারদশকে  নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, উন্নতশিক্ষা, উন্নততর কর্মপ্রত্যাশা এবং নারীর অধিকার রক্ষার্থে  নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে- আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং কিছুটা সময় সামরিক শাসক শাসন করেছে দেশকে। বর্তমানে রাজনীতিতে টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ। গত চারদশকের  শাসন আমলে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীপদে আসীন হয়েছেন নারী। প্রায় তিনদশক হতে চলছে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী। সম্প্রতি জেনেভাভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক  ফোরাম (ডাব্লিউইএফ) শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক সুযোগ- মূলত উল্লিখিত চারটি বিষয় নিয়ে ১৪৯টি দেশের ওপর গবেষণা করে।  রিপোর্টে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবকটি দেশ তো বটেই, পেছনে ফেলেছে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশের অনেক দেশকে। নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নে ৪৮তম অবস্থানে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এ অবস্থানের কারণ, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। কিন্তু অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধার  আওতার সুযোগে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। 


আমরা সকলেই জানি, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কারা আসছেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি   এই তিনটি দলকেই দেখে আসছি। ’৭৫-পরবর্তী মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ক্রমেই ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি- নেতিবাচক মূল্যবোধ লালন-পালন ও চর্চা করে আসছে। ধারাবাহিকভাবে পারিবারিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে নারী প্রধান ভূমিকায় ক্ষমতায়িত হতে দেখছি রাজনৈতিক দলগুলোতে। কিন্তু সাধারণ গ্রামীণনারীরা রাজনীতিবিমুখ অথবা যথার্থ মূল্যায়নের অভাবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অবশেষে শহুরে, চেতনাহীন, অন্তঃসারশূন্য এবং একটা বৃত্তের মাঝে আবর্তিত সামন্ত ভাবধারায় আবদ্ধ হয়েই চলছে বাংলাদেশের রাজনীতি। 
এতটুকু বলতেই পারি, বাংলাদেশের নারী অধস্তনতা পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সকল স্তরে অত্যন্ত  ব্যাপক। শতকরা ৯৯ ভাগ নারী অধস্তন অবস্থায় আছেন বললে ভুল হবে না। এর প্রধান কারণ পিতৃতান্ত্রিকতা, পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বর্তমান মূল্যবোধ। এর প্রধান শিকার বিশেষ করে গ্রামীণনারী। শহর অঞ্চলে চাকুরী বা স্বামী বা বাবার কল্যাণে নারীর মাঝে অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ্য করবার মতো হলেও অবস্থানগত অবস্থা বরাবরের মতো অধস্তন। কর্মক্ষেত্রে নারীর মেধা-শ্রম-যোগ্যতা নারীর অবস্থানকে টিকিয়ে রাখলেও পরিবার প্রায় সকল সময়ের জন্য অধস্তন করেই রাখে, যদিওবা কিছু ইতিবাচক উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে। 
রাজনৈতিক চেতনা এক বিশেষ মোহে আচ্ছন্ন, যার প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ নারীর ওপর। ডিজিটাল বাংলদেশে গ্রামীণ নারী এখনোও দাস সমাজে রয়েছে। যদিও কালের দাবিতে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, অবস্থানের নয়।  রাজনীতিতে ও সরকারি চাকরির বিশেষ বিশেষ কিছু পদে নারীকে দেখা যায়। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রী নারী হলেই কি সব নারীবান্ধব হয়ে যায়? যায় না। আমাদের পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটাই পুরুষতান্ত্রিক এবং ধর্ম রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাথে আষ্টেপিষ্ঠে জড়িয়ে আছে এবং ক্ষমতায় আসা ও পুঁজির বিকাশই যেহেতু ডানপন্থি দলগুলোর একমাত্র লক্ষ্য, সেহেতু রাজনৈতিকদল সেটাই করতে চান, যেটাতে মানুষ ভোট দেবে। ন্যায়-অন্যায় বা  সভ্যতার দিকে নয় বরং আমরা ভূতের মতো পেছনে হাঁটছি, যা একজন গ্রামীণ নারীকে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়Ñ শিক্ষার বাজেট ও শিক্ষার হালচাল দেখলেই বোঝা যায়।  


এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলভুক্ত ৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে  বাংলাদেশ ৭.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা ছিল ১৯৭৪ সালের পর দ্রুততম। ব্যাংকটির  পূর্বাভাস হচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশ। খুব ভালো কথা। কিন্তু কারা এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক?  গ্রামীণ সেই নারী-পুরুষ যারা গার্মেন্টস-এ কাজ করছেন, গ্রামীণ সেই নারী-পুরুষ যারা বিদেশের মাটিতে কষ্ট করে কাজ করে দেশে রেমিটেন্স পাঠান, গ্রামীণ সেই নারী-পুরুষ যারা ধান-পাট শষ্য উৎপাদন করে সোজা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন বাংলাদেশকে। আপনি যদি গভীরভাবে ভেবে দেখেন, বাংলাদেশকে টিকিয়ে রেখেছে গ্রামীণ নারী। যে-নারী ছাড়া সংসার অচল, রাষ্ট্র অচল তাদের জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিকল্পনা কি? আসল কথা হলো, সংসদে যারা বসেন বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ অনুভবই করতে পারেন না গ্রামের মানুষের চাহিদাটা কি বা তারা কেমন আছেন। একজন প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব সংসদে বা দায়িত্বশীল স্থানে থাকলে গ্রামীণ নারী নিজেদের কথা বলতে পারতেন।  একজন  গ্রামীণ নারীর স্বাস্থ্যের জন্য কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? যে মায়ের জন্য আমরা পৃথিবীতে, সে মায়ের সুস্থ পরিবেশে সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা কি আছে? কমিউনিটি ক্লিনিক আছে মানলাম, আদৌ কি তা কার্যকর?  শিক্ষার জন্য, নিরাপদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়তের জন্য, বা সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে? রাজনীতি একটি ভূখ-ের সকল মানুষের কল্যাণে কাজ করবে; কিন্তু গ্রামীণ নারী সকলের মঙ্গলে সকল সময় নিবেদিত থাকলেও অনুমোদিত বা স€§ানজনক কোনো কাজ বা রাজনীতিতে দেখতে পাই না। 
শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধির পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষে মানুষে বৈষ্যমের ফারাককে দিনকে দিন বৃদ্ধি করছি- নজর দিচ্ছি না ৯৯ শতাংশ মানুষের দিকে। সামগ্রীক নারী জনগোষ্ঠীর সক্ষমতার উন্নয়ন ও অর্জনের উপরেই নির্ভর করে নারীর ক্ষমতায়ন অথচ আমরা তা দেখতে পাচ্ছি না
তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি কি ক্রমেই একশ্রেণির জন্যÑ একটি শ্রেণির উন্নতির জন্য?